২৩ অক্টোবর ২০১৯

আদালতেই আটকা ব্যাংকের পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা

আদালতে আটকে আছে ব্যাংকের প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। বছরের পর বছর মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের আদায়ও থেমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যেসব খেলাপি ঋণ মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে, ওই সব ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলো আদালতে মামলা দায়ের করে থাকে। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখন পুঞ্জীভূত মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৫৫ হাজারটি। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ের জন্য সাধারণত চার ধরনের আদালতে গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। আদালতগুলো হলো অর্থঋণ আদালত, দেউলিয়া আদালত, সার্টিফিকেট আদালত ও দেওয়ানি আদালতে। এর মধ্যে অর্থঋণ আদালতেই বেশির ভাগ মামলা দায়ের করা হয় এবং এ আদালতেই ব্যাংকের বেশির ভাগ অর্থ আটকে আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত প্রতি ছয় মাস পর হালনাগাদ তথ্য দিয়ে মামলার বিবরণী তৈরি করে। সর্বশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে গত ৩০ জুনভিত্তিক তথ্য দিয়ে। মামলার সংখ্যা ও আদায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) তুলনায় আগের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে এবং এর বিপরীতে বেশি খেলাপি ঋণ আদায় হয়েছে। যেমনÑ গত ছয় মাসে আদায় হয়েছে মোট বিচারাধীন মামলার বিপরীতে আটক খেলাপি ঋণের ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা আগের ছয় মাসে ছিল ৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

আদালতভিত্তিক মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ আটকে আছে অর্থঋণ আদালতে। যেমন- গত জুনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এখন ৬২ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোর দাবিকৃত টাকার পরিমাণ এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। সার্টিফিকেট আদালতে মামলার সংখ্যা এক লাখ ৫৭ হাজার। এর বিপরীতে দাবিকৃত টাকার পরিমাণ ৫৩৩ কোটি টাকা। দেউলিয়া আদালতে মামলার সংখ্যা ১৬৫টি। এর বিপরীতে দাবির পরিমাণ ৫২১ কোটি টাকা। আর দেওয়ানি আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৫ হাজার ৫১৪টি। এর বিপরীতে দাবিকৃত টাকার পরিমাণ ৪২ হাজার ৫৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকের অর্থঋণ আদালতে ১৮ হাজার মামলার বিপরীতে আটকে আছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি প্রায় ৪৭ ব্যাংকের রয়েছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর চেয়ে সরকারি ব্যাংকগুলোর বেশি অর্থ আদালতে আটকে যাওয়ার কারণ হিসেবে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগই ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই-বাছাই করে ঋণ প্রদান করায় বেশি হারে ঋণ আদায় হয় এসব ব্যাংকে। কিন্তু সরকারি ব্যাংকগুলোর এ সুযোগ খুব কম। কারণ সরকারি ব্যাংকগুলো পরিচালিত হয় অনেকটা রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন থাকায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপও অনেক সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর চেয়ে বেশি।

আবার অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেয়া হয় সরকারি ব্যাংকগুলোতে। আর ওই সব ঋণই একসময় আদায় না হওয়ায় কুঋণে পরিণত হয়। আর কুঋণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক পর্যায়ে আদায় হয় না। এসব ঋণ আদায়ের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আদালতে গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো তাই অর্থঋণ আদালতসহ অন্যান্য আদালতে মামলা দায়ের করে থাকে। কিন্তু আদালত পর্যাপ্ত না থাকায় মামলার নিষ্পত্তি হয় ধীরে ধীরে। এভাবেই খেলাপি ঋণের পাহাড় জমতে থাকে।

তবে সরকারি ব্যাংকগুলোর মতো এখন কিছু কিছু বেসরকারি ব্যাংকেও মামলার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বারবার ঋণখেলাপিদের সুযোগ দেয়ায় যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তারাও এখন নিরুৎসাহিত হয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও কুঋণ বেড়ে যাচ্ছে। আর ঋণ আদায়ের জন্য শেষ পর্যন্ত আদালতে মামলা করতে হচ্ছে। এতে এক দিকে ব্যাংকের মামলা পরিচালনার জন্য যেমন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি সময়মতো মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ব্যাংকের টাকা আটকে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকের ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।


আরো সংবাদ