২১ নভেম্বর ২০১৯

ব্যাংকের বেসরকারি ঋণপ্রবাহ তলানিতে

সাধারণের আমানতের অর্থ দিয়ে ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু ঋণের বড় একটি অংশই আদায় হচ্ছে না। কিন্তু মেয়াদ শেষে সাধারণ আমানতকারীদের সুদে আসলে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে নগদ টাকার প্রবাহের ওপর চাপ বেড়ে গেছে। এরপরও ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রাহণ বেড়ে গেছে। সবমিলেই ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ তলানিতে চলে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার অর্থই হলো- বর্ধিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধাগ্রস্ত হওয়া। অপর দিকে ব্যাংকের আয় কমে যাচ্ছে, বিপরীতে ব্যয় কমছে না বরং বেড়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো আর্থিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস ২৪ দিনে (জুলাই-২৪ সেপ্টেম্বর) সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিয়েছে ২৯ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকেই ঋণ নিয়েছে ২৫ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। এ সুবাদে ২৪ সেপ্টম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, কাক্সিক্ষত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়া। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আগস্টে রাজস্ব আদায় ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। গত বছরের আগস্টে যেখানে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১৪ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা, চলতি বছরের আগস্টে তা কমে নেমেছে ১৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। যেখানে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা সেখানে গত আগস্টে না বেড়ে বরং রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এ দিকে গত অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের বড় অবদান রেখেছিল সঞ্চয়পত্র। কিন্তু চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে।

যেমন : চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার নিট ঋণ পেয়েছে ৩ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২ মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ কমে গেছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। বিনিয়োগকারীদের উপর নানারূপ করারোপ ও কড়াকড়ি করায় সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। এ কারণেই ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ বেড়ে গেছে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ বেড়ে গেছে।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংকের বেশির ভাগ ঋণ আদায় হচ্ছে না। বিশেষ করে কিছু বড় বড় শিল্প গ্রুপ ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু তারা নানা উপায়ে তা পরিশোধ না করে নিয়মিত দেখাচ্ছেন। আবার অনেক বড় ঋণগ্রহীতা ঋণ নিয়মিতও করছেন না। আবার কেউ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করে ঋণখেলাপির উপর উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিচ্ছেন। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। আইএমএফের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খেলাপি, ঋণ নবায়ন ও উচ্চ আদালতে রিটসহ প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকায় উঠেছে। খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের নগদ টাকার প্রবাহ কমে গেছে।

এ দিকে আমানতকারীদের মেয়াদ শেষে সুদে আসলে অর্থ ফেরত দিতে হচ্ছে। সবমিলেই ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকার প্রবাহের ওপর চাপ বেড়ে গেছে। নগদ টাকার চাপ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো কাক্সিক্ষত হারে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে পারছে না। অনেক ব্যাংকই ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সর্বনিম্ন অবস্থায় চলে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমে গেছে, যা এ যাবতকালে সর্বনি¤œ বলে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাওয়ায় আয় কমে যাচ্ছে। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভাবন ভাড়া, ইউটিলিটি বিলসহ সামগ্রিক ব্যয় কমছে না বরং বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি উন্নতি না হলে সামনে ব্যাংকগুলোর বড় অংকের লোকসান গুণতে হবে। অনেক ব্যাংকেরই লোকসানের ধকল কাটানো সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তারা।


আরো সংবাদ