১০ ডিসেম্বর ২০১৯

পেঁয়াজের ডাবল সেঞ্চুরি প্লাস

-

গৃহিণী সালমা ইসলাম গতকাল দুপুরের দিকে খিলগাঁও আনসার কোয়ারর্টার-সংলগ্ন এলাকায় পেঁয়াজ কিনছিলেন একটি ভ্যানগাড়ি থেকে। বিক্রেতা নজরুলের কাছ থেকে ৫০ টাকায় ২৫০ গ্রাম পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে তার চোখের পানি টলমল করছিল। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে তিনি এ প্রতিবেদককে বললেন, আগে এক কেজি কিনতাম ৫০ টাকায়। এখন একই দামে কিনলাম ২৫০ গ্রাম। এর মাধ্যমে আমি আমার সন্তানদের ঠকাচ্ছি। তারা ঘন ঝোলের তরকারি খেতে পছন্দ করে। আগে ঝোল ঘন করতাম পেঁয়াজ দিয়ে। এখন করি পেঁপে দিয়ে। পেপেকে ম্যাশ করে ফ্রিজে রেখে দিয়েছি। তরকারির সাথে দু’চামচ করে দিচ্ছি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এভাবে আর কত দিন?

সালমা ইসলামের কথাগুলো শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পেঁয়াজ বিক্রেতা নজরুলও। জবাবে বললেন, আমার কাছে গতকাল দুই মণের মতো পেঁয়াজ ছিল। ১৬০ টাকা করে বিক্রি করেছি। আজ সকালে পাইকারি বাজারে গিয়ে দেখি সেখানেই দাম ১৮০ টাকা। প্রতি কেজিতে খরচ আছে আরো ছয় টাকা। ১৮৬ টাকা কেজি দরে কিনে ২০০ টাকায় বিক্রি করছি। আমারই-বা কী করার আছে? একটাই পারি, ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারি। তখন খাবো কী? নজরুল বলেন, আমরা দিনে কিনে দিনেই বিক্রি করি। যে দামে কিনি, তার সাথে সামান্য যোগ করে বিক্রি করি। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে আমরাও বাড়াই। পাইকারিতে কমলে আমরাও কমাই।

বিভিন্নপর্যায়ের ক্রেতা-বিক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, বাড়তে বাড়তে ডাবল সেঞ্চুরি করেছে পেঁয়াজ। ঢাকার বাজারে গতকাল প্রতি কেজি বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজি। বিক্রেতাদের আশঙ্কা, আগামী দিনে দাম আরো বাড়তে পারে। কারণ হিসেবে তারা জানান, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অব্যাহত অভিযানে আড়তদাররা অতিষ্ঠ। তাদের অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে আমদানিকারকরাও নতুন করে এলসি খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামে আমদানিপণ্য বিক্রির প্রধান কেন্দ্র খাতুনগঞ্জ এবং ঢাকার শ্যামবাজারে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা প্রায় প্রতিদিনই মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানকালে তারা ব্যবসায়ীদের কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য করছেন। ক্ষেত্রবিশেষে জরিমানা করছেন মোটা অঙ্কের। সরকারি চাপের মুখে ব্যবসায়ী সমিতি পাইকারিতে ৬৫ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু বাস্তবে এ দামে কোথাও পেঁয়াজ মিলছে না। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী সাময়িকভাবে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। আর যারা ঝুঁকি নিয়ে মাঠে রয়েছেন তারা দাম হাঁকাচ্ছেন ইচ্ছেমতো।

রাজধানীর শ্যামবাজারের পাইকারি বাজারে গতকাল প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজ আকারভেদে ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা, মিয়ানমারের পেঁয়াজ মানভেদে ৮০ থেকে ১৬০ টাকা, মিসরের পেঁয়াজ ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। কাওরান বাজারের পাইকারি বাজারে দেশী পেঁয়াজ আকারভেদে ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা ও মিসরের পেঁয়াজ ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। খুচরা বাজারে এ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ২১০ টাকা। দেশের সবচেয়ে বড় চেইন শপ স্বপ্নতে গতকাল প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজের দাম নির্ধরিত ছিল ২০৯ টাকা।
পেঁয়াজের এমন লাগামহীন দামে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। পেঁয়াজের বাজার কারা নিয়ন্ত্রণ করছেন সে প্রশ্ন সাধারণ মানুষের। মিয়ানমার থেকে ৪২ টাকা দরে পেঁয়াজ কেনার পরেও দেশে কোন অজুহাতে এত দাম? সে প্রশ্নও ক্রেতাদের। খিলগাঁও বাজারের ক্রেতা সলিম উল্লাহ বলেন, পেঁয়াজ খেতে হয়, তাই খাই। আগে সপ্তাহে অন্তত দুই কেজি কিনতাম, এখন কমিয়ে আধা কেজিতে নিয়ে এসেছি।

জানা যায়, গত চার মাস ধরে পেঁয়াজের দাম বাড়ছেই। এর মধ্যে মোট ২৫ বার দাম বেড়েছে। ৩০ টাকা থেকে শুরু করে কখনো ৫০, ৯০, ১২০, ১৫০, ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে পেঁয়াজ। বর্তমানে পেঁয়াজ ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। বাধ্য হয়ে আগে যারা একসাথে পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনতেন তারা কিনছেন আধা কেজি কিংবা বড়জোর এক কেজি। নি¤œবিত্তের মানুষ তো পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়েই দিয়েছেন।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় দেশে পেঁয়াজ সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বাড়তি। আর পাইকারি বাজারে দাম বেশি হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। শ্যামবাজারের পাইকারি বিক্রেতা ও অভিসার বাণিজ্যলয়ের ম্যানেজার টিটন রায় বলেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় পেঁয়াজের আমদানি কম। প্রতিদিন ভারত থেকে ৩০০ ট্রাক আসত। এখন আসে না। এ জন্য দাম বাড়ছে। সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যাবে।

অন্য দিকে ক্রেতারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে গত চার মাস ধরে পেঁয়াজের দাম বেড়েই চলেছে। সরকারিভাবে বাজার তদারকি হলে দাম নিয়ন্ত্রণে থাকত। দামের এই ঊর্ধ্বাবস্থার কারণে অনেকেই ছুটছেন টিসিবির ট্রাক সেলের খোঁজে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে সেখান থেকে পেঁয়াজ নিয়ে ফিরছেন তারা। সরকারি বন্ধের দিন ছাড়া প্রতিদিন টিসিবির ট্রাক সেলে ৪৫ টাকা কেজি দরে চলছে বিক্রি। সেখানে জনপ্রতি এক কেজি করে কিনতে পারছেন।

ভারতীয় সূত্র জানায়, ভারতের যেসব এলাকায় বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়ে থাকে এ রকম কিছু এলাকায় এবার বন্যা হয়েছে। এতে পেঁয়াজের ক্ষেত নষ্ট হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এ কারণে সরবরাহ কমেছে এবং আমাদের বাজারেই পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। কলকাতার বাজারেই বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৮০ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। আর দিল্লিতে বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ৯৫ টাকায়। আবার ভারতেরই কিছু এলাকায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ আট থেকে ১০ রুপিতে বিক্রির খবর পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার পর খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে টিসিবি। সর্বশেষ প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ৩৫টি ট্রাকে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করছিল সংস্থাটি। একজন ক্রেতা এক কেজি করে পেঁয়াজ কিনতে পারছিলেন। আর ট্রাক সেলের ডিলার পাচ্ছিলেন প্রতি দিন এক টন করে পেঁয়াজ। অর্থাৎ দিনে একটি ট্রাক থেকে প্রায় এক হাজার পরিবারের পেঁয়াজের চাহিদা পূরণ হচ্ছিল। তবে চলতি সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার সপ্তাহিক ছুটির কারণে বিক্রি বন্ধ ছিল। রোববার ছিল সরকারি ছুটি। তাই এ তিন দিন টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ ছিল। তবে সোমবার বিক্রি হয়। সরবরাহ ঘাটতির কারণে মঙ্গলবার পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারেনি টিসিবি। তবে বুধবার এবং গতকাল আবার পেঁয়াজ বিক্রি করা শুরু করেছে টিসিবি।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা করে। বিকল্প হিসেবে মিয়ানমার থেকে এলসি এবং বর্ডার ট্রেডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পেঁয়াজ আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। পাশাপাশি মিসর ও তুরস্ক থেকেও এলসির মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়। সম্প্রতি মিয়ানমারও পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি করে। ফলে বাংলাদেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।


আরো সংবাদ