১৫ জুলাই ২০১৯
খুব কম লোক কালো টাকা সাদা করেছেন

কয়লার ময়লা ধুলেও যায় না

-

‘অপ্রদর্শিত আয়’ হিসেবে গণ্য, কালো টাকার অত্যন্ত স্বল্পসংখ্যক মালিক স্বেচ্ছায় তাদের টাকা ‘সাদা’ করেছেন। সাধারণত এমন অর্থের অধিকারীরা নিয়মিত কর ও জরিমানা দিয়ে তা বৈধ করায় আগ্রহী নন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানানো হয়, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে গত তিন বছরে সারা দেশের মাত্র ২২৩ জন করদাতা তাদের সর্বমোট ১৯৭ কোটি টাকার অপ্রদর্শিত অর্থের কথা প্রকাশ করেছেন। এ বাবদ সরকারের কোষাগারে আয় হয়েছে মাত্র ৩৭ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হুসাইন বলেছেন, ‘এই পরিমাণ অর্থ অত্যন্ত অনুল্লেখ্য। হতে পারে, কালো টাকার মালিকেরা বিষয়টাকে হালকাভাবে নিয়েছেন। কারণ, একের পর এক বিভিন্ন সরকার তাদের মার্জনা করে দিয়েছে।’
জানা গেছে, নির্বাচিত-অনির্বাচিত নির্বিশেষে বিভিন্ন সরকারের সময় কালো টাকা খুব কম সাদা করা হলেও সর্বশেষ কেয়ারটেকার সরকারের আমলে এই টাকা সর্বাধিক পরিমাণে বৈধ করা হয়েছিল। দুর্নীতি দমন সংস্থার হাতে ধরা পড়ার ভয়েই এটা করা হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই কেয়ারটেকার আমলে ৯ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা ‘সাদা’ করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৪১ বছরে, অর্থাৎ মুজিব-জিয়া-এরশাদ-খালেদা-হাসিনাÑ সবার আমলে, এ দেশে মোট যত কালো টাকা সাদা করা হয়েছে, এর ৭০ শতাংশেরও বেশি বৈধ করা হয়েছে সে কেয়ারটেকারের সময়ে।
তখন এ বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছিল ৯১১ কোটি টাকা। বর্তমানে ক্ষমতাসীন, আওয়ামী লীগ সরকারের গত তিন বছরে টাকা সাদা করা বাবদ অর্জিত আয়ের প্রায় ২৫ গুণের সমান এটা।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপ্রদর্শিত অর্থের তথ্য প্রকাশ করার সুযোগ শুধু সাময়িকভাবেই দেয়া উচিত। অন্যথায়, সব সময়েই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা অর্জনের প্রবণতা থেকে যাবে। তাদের মতে, এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যে, টাকা সাদা করার সুযোগ না নিলে ধরা পড়তে হবে। আবার, অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ যাতে কালো টাকার মালিকদের হয়রানি না করে, সে ব্যবস্থাও থাকা দরকার। অপ্রদর্শিত অর্থের তথ্য প্রকাশ করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্বুদ্ধ করা আবশ্যক। এদিকে, ওয়াকিবহাল মহল হতাশার সুরে বলেছেন, কালো টাকা সাদা করার জন্য প্রত্যেক সরকার কর রেয়াতের সুযোগ দিলেও তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, দুর্নীতিসহ নানা অবৈধ পন্থায় অর্জিত বিপুল অর্থ বিদেশে যাতে পাচার হয়ে না যায়, এ জন্য প্রতি বছর বাজেটে সুযোগ দেয়া হয় ‘অপ্রদর্শিত’ অর্থের মালিকদের। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকার ২০১২-১৩ সালে স্বেচ্ছায় আয়ের অর্থের উৎসের ব্যাপারে জানানোর সুযোগ প্রথম দিয়েছিল। সে বছরে ২৭৩ জন এ সুযোগ গ্রহণ করেন। পরের বছর সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, আবাসিক ভবন ও ফ্ল্যাট যদি নির্ধারিত কর দিয়ে কেনা হয়, তাহলে কালো টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করা হবে না। তখন থেকে অবৈধ অর্থের মালিকদের এ সুযোগ দেয়া হচ্ছে। বরং এ বছর কর কমানো হয়েছে কালো টাকায় নির্মাণকাজ এবং ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে। তবে সরকারের এই উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হয়, তা অনিশ্চিত।
কালো টাকা ‘ভালো’ বা ‘সাদা’ করার জন্য সরকার যত সদিচ্ছা ব্যক্ত করুক না কেন, কিংবা এর ঘোষিত উদ্দেশ্য দৃশ্যত যত ‘মহৎ’ হোক, অপ্রিয় বাস্তবতা হলোÑ অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকায় যারা ধনাঢ্য হয়েছেন, তারা টাকার রঙ ‘কালো’ থেকে ‘সাদা’ করতে তেমন আগ্রহী নন। ফলে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কালো টাকা বেআইনিভাবে বিদেশে পাচারের আশঙ্কা দূর হচ্ছে না। এ অবস্থায় সরকার আর কত দিন, এ ক্ষেত্রে কঠোরতার বদলে উদারতা প্রদর্শন করে যাবে, সেটা জনমনে এক বিরাট প্রশ্ন। কালো টাকার মালিকদের আচরণদৃষ্টে সেই প্রবাদের সত্যতাই পুনরায় প্রমাণিত হচ্ছেÑ ‘কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না’।

 

 


আরো সংবাদ