১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯
রাজধানীর বস্তিতে আগুন

গুরুতর অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে কি

-

রাজধানীতে আবারো আগুনে পুড়ে গেল একটি বিশাল বস্তি। মিরপুর ৭ নম্বর-সেকশনের ঝিলপাড় বস্তিটি গত শুক্রবার রাতে আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। বস্তির প্রায় সব ঘরই ছিল বাঁশ-টিনে ছাওয়া কাঁচাঘর। এ রকম পাঁচ থেকে ছয় শ’ ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সেই সাথে সর্বস্ব হারিয়েছে বস্তিবাসী প্রায় তিন হাজার নিম্নআয়ের অতি সাধারণ পরিবার। গতকাল রোববার পর্যন্ত আগুনের কারণ উদঘাটন করা যায়নি। তবে দমকল বাহিনীর সূত্রে ধারণা করা হয়েছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট বা গ্যাসের চুলা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। আগুন লাগার কারণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।
গণমাধ্যমের খবরে বস্তিবাসীদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তারা দাবি করেছেন, কেউ ইচ্ছে করে বস্তিতে আগুন লাগিয়েছে। তারা বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে বস্তিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় তারা কেরোসিনের গন্ধও পেয়েছেন। বস্তিবাসী অভিযোগ করেন, ঈদের আগেও এই বস্তিতে আগুন লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
একটি দৈনিকের এক রিপোর্টে উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘আগুন কেউ লাগাইয়া দিছে। তয় ক্যাডা এই কামডা করল খুঁইজ্যা দেহেন আপনেরা।’ শনিবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুর ঝিলপাড় পোড়া বস্তির ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ষাটোর্ধ্ব জরিনা খাতুন কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় তার পাশে থাকা আরো অনেকে সায় দিয়ে বলেন, ‘বস্তিতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। আমরা ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজছি।’
রাজধানীতে যখন কোনো বস্তি আগুনে পুড়ে যায়, তখনই এ ধরনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে। তবে সেসব অভিযোগ কখনই প্রমাণিত হয় না। অবশ্য এমন অভিযোগের যে একেবারেই ভিত্তি থাকে না, তা নয়। একজনের বস্তি উচ্ছেদ করে সেখানে নতুন কোনো প্রভাবশালীর মালিকানা প্রতিষ্ঠা অথবা নতুন ভাড়াটে বসানোসহ নানা কারণে বস্তির মালিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব অপকর্ম সুপরিকল্পিতভাবেই করে থাকে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা শনিবার বলেছেন, ‘বস্তিতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানোর কোনো অভিযোগ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।’ ষড়যন্ত্রের অভিযোগও নাকচ করে দেন তিনি।
তবে আমরা মনে করি, এ অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং সে জন্যই তা খতিয়ে দেখা জরুরি। দমকল বাহিনীর একজন উপপরিচালককে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগুন লাগার কারণসহ পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগ খতিয়ে দেখবে এবং অবিলম্বে তাদের প্রতিবেদন পেশ করবে, ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর মতো আমরাও এমনটিই আশা করি।
ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীকে আপাতত ছয়টি স্কুলভবনে রাখা হয়েছে। নতুন ঘর না তোলা পর্যন্ত তারা সেখানেই থাকবেন। তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা, খাবার ও ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের ব্যবস্থা করেছে সিটি করপোরেশন। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় তাদের খাবারের ব্যবস্থা করছে। এগিয়ে এসেছে কিছু সামাজিক সংগঠনও। বস্তির ঘরের মালিকদের দ্রুত ঘর তুলে দেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। অপর দিকে, ২০১৭ সালে বাউনিয়া বাঁধে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য যে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে পুনর্বাসনের কাজ চলমান রয়েছে। মিরপুরের ১০ হাজার বস্তিবাসীকে পর্যায়ক্রমে সেখানে সরিয়ে নেয়া হবে বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, কয়েক বিঘা খাসজমিতে গড়ে ওঠা ঝিলপাড় বস্তিটি অবৈধ। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এই বস্তিতে ঘর তুলে ভাড়া আদায় করছে। বস্তির গ্যাস সংযোগও অবৈধ ছিল বলে জানা যায়।
একটি দেশের রাজধানীতে সরকারি খাসজমিতে কিভাবে অবৈধ বস্তি গড়ে তোলা যায়? কিভাবে অবৈধ বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস-সংযোগ পাওয়া যায়? দেশবাসীর কাছে সেটিই এক বিস্ময়। আমাদের জানা মতে, ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের নেতা এবং ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙানো স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এসব বস্তি গড়ে তোলার পেছনে দায়ী। প্রশাসন ও পুলিশ এদের সাহায্য করে বোধগম্য কারণেই। সুতরাং বস্তি স্থাপন ও উচ্ছেদের এই চক্র কখনই বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। আর ‘ওলটপালট করে দে মা লুটেপুটে খাই’ নীতিতে যখন গোটা দেশ চলে, তখন ওই সব প্রভাবশালীকে প্রতিরোধ করবে কে?

 


আরো সংবাদ