২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯
আবারো হাইকোর্টের নির্দেশ

সাক্ষী সুরক্ষা আইন এখনই জরুরি

-

‘বিচার বিলম্বিত করার মানে হলো বিচার অস্বীকার করা’। আইন-আদালত ও বিচার সম্পর্কিত যেকোনো আলোচনায় আমাদের অতিপ্রিয় একটি উদ্ধৃতি এটি। আইনজীবী, বিচারক, রাজনীতিক, অধিকারকর্মী সবাই সুযোগ পেলেই এটি উচ্চারণ করেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এর সমাধান কী, কোন পথে বিচার ত্বরান্বিত করা যায় সে বিষয়ে খুব কমই মাথা ঘামানো হয়।
এর ফলে শুধু যে বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়, তা-ই নয়। বিচার না হওয়ার নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়াও সমাজকে রাহুগ্রস্ত করে। এক অপরাধীর বিচার না হলে অন্যরাও উৎসাহিত হয় এবং সমাজে অপরাধ বেড়ে যায়। ঠিক এই পর্যবেক্ষণই তুলে ধরেছেন হাইকোর্টের দু’জন বিচারপতি তাদের একটি রায়ে। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো: মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি ধর্ষণ মামলার রায়ে বলেছেন, সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে অপরাধীদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। তারা বলেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টাস্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারার দায় মূলত রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। এ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়।
মাননীয় বিচারপতি দু’জন যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন তা এতটাই স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন যে, এ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাওয়ার দরকার নেই। আলোচ্য রায়ে ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ছয় দফা নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। এগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং মামলাসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য প্রযোজ্য। তবে সেখানে একটি বিশেষ নির্দেশনা আমাদের বিবেচনায় সব মামলার ক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং সে অর্থে সর্বজনীন। সেটি হলো, ‘সাক্ষী সুরক্ষা’ আইন প্রণয়নের তাগিদ।
আদালত বলেন, ধর্ষণসংক্রান্ত মামলার আসামিরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বেপরোয়া ও ধূর্ত প্রকৃতির। এরা ভিকটিম ও তার পরিবারের ওপর চাপ-প্রভাব বিস্তার করে আদালতে সাক্ষ্য প্রদানে ভয়ভীতি, প্রলোভনসহ বিভিন্ন ধরনের কূটকৌশল অবলম্বন করে। ক্ষেত্রবিশেষে সালিসের নামে সামাজিক বিচার করে ভিকটিম ও তার পরিবারকে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য এবং আদালতে সাক্ষ্য প্রদানে বিরত থাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করে থাকে। এ অবস্থায় সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের বিকল্প নেই। আমরা প্রত্যাশা করছি, সরকার যত শিগগিরই সম্ভব এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করবে।
আমাদের সমাজে সাক্ষীকে হুমকি-ধমকি কিংবা টাকা-পয়সা দিয়ে সাক্ষ্য দিতে বিরত করা খুবই প্রচলিত কৌশল। এমনকি আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সাক্ষীকে তুলে নিয়ে গুম করে ফেলা, খুন করে ফেলার মতো ঘটনাও বিরল নয়। সাক্ষীদের অনুপস্থিতিতে অনেক ফৌজদারি মামলায় অপরাধ প্রমাণ করা যায় না, বিচার বিলম্বিত হয়। এমনকি মামলার আসামিরা খালাসও পেয়ে যায়। এ অবস্থায় আদালতের দেয়া উল্লিখিত নির্দেশনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই নির্দেশনা কতটা পরিপালন করা হবে কিংবা আদৌ করা হবে কি না, সংশয় আছে। এর যৌক্তিক কারণটা উল্লেখ করা জরুরি।
আমরা জানি, আইন কমিশন ২০১১ সালে ‘সাক্ষী সুরক্ষা’ আইন প্রণয়নের জন্য প্রতিবেদন আকারে সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছিল। সেই সুপারিশ অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় উদ্যোগও নেয়। কিন্তু নতুন আইনে কী কী বিষয় থাকবে, তা নিয়ে প্রতিবেদন বিনিময়ের মধ্যেই দায় এড়িয়ে যায় দুই মন্ত্রণালয়।
পরে ২০১৫ সালে খোদ হাইকোর্ট এই আইন করার জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেন। সেই আদেশদাতা দুই বিচারপতির একজন ছিলেন বর্তমান নির্দেশদাতা বেঞ্চের অন্যতম বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। একটি হত্যা মামলায় ছয় বছরে একজনও সাক্ষ্য না দেয়ায় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের বেঞ্চ ২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বর এ আদেশ দিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইন সচিবকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়।
আইন কমিশনের সুপারিশ এবং হাইকোর্টের নির্দেশের পরও সে আইনটি এখন পর্যন্ত প্রণয়ন ও কার্যকর করা হয়নি। আইন-আদালতের প্রতি এ ধরনের উপেক্ষা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কি না, সেটি হাইকোর্ট দেখবেন। তবে আমরা বলতে পারি, এটি নিঃসন্দেহে একটি রাষ্ট্র ও সমাজের অসভ্যতার উদাহরণ। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমরা যে আদৌ সভ্য হতে পারিনি, সে কথাটি আমাদের মনে করিয়ে দিতেই কি সরকার এমন নিষ্পৃহ হয়ে আছে?
আশা করব, হাইকোর্টের এবারের নির্দেশগুলো যথাশিগগির কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হবে।


আরো সংবাদ