২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
প্রতি সপ্তাহে দু’বার ট্রেনের লাইনচ্যুতি

রেলের এই বিপর্যয় চলতে দেয়া যায় না

-

এবার ঈদুল আজহার প্রাক্কালে বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে রেলের নজিরবিহীন শিডিউল বিপর্যয়ের পর লণ্ডভণ্ড অবস্থা এখনো অব্যাহত রয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ঈদযাত্রার সূচনাকাল থেকে রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগে সব ট্রেন ২৩ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বে চলছে। যেমন গত সোমবার ‘রংপুর এক্সপ্রেস’ ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের একটি জেলা শহর, লালমনিরহাটে গিয়ে পৌঁছেছে ‘মাত্র’ ২২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট দেরিতে। এবার ঈদের আগের দিন শিডিউল বিপর্যয়ের চরম পর্যায়েও, এর ঘোষিত বিলম্ব ১৪ ঘণ্টার বেশি ছিল না। মোট কথা, বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনগুলোর বিরাট অংশের আর নির্ধারিত সময়সূচি বলতে কিছু থাকতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে জনসাধারণের দুর্ভোগ কত অসহনীয় তা বলা নি®প্রয়োজন। টিকিট কেটেও যাত্রীরা যখন ১৫-২০ ঘণ্টায় সংশ্লিষ্ট ট্রেনের হদিস পান না, তখন তাদের হতাশা ও ক্ষোভের মাত্রা সহজেই অনুমেয়।
রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘ঈদের আগে ঢাকা-গাজীপুর-যমুনা সেতু রুটে টাঙ্গাইলে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার পর থেকেই এবার শিডিউল সঙ্কট চলছে। তদুপরি ঈদের পরে, ১৮ আগস্ট ঝিনাইদহে এক্সপ্রেস ট্রেনের লাইনচ্যুতির দরুন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি চলে গেছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’ কিন্তু সারা বছর দেশের বিভিন্ন অংশে ট্রেনের ঘন ঘন লাইনচ্যুত হওয়াসহ নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানা যায় না। এ দিকে, সরকারি হিসাবেই বলা হচ্ছে, চলতি মাসে গত ১৯ তারিখ পর্যন্ত রেলের পূর্বাঞ্চলে সাতবার ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে। আর পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে আটবার। তন্মধ্যে দুইবার রেললাইনচ্যুতি ঘটেছে মেইন লাইনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ট্র্যাকে। ৯ আগস্ট টাঙ্গাইলে ‘সুন্দরবন এক্সপ্রেস’ লাইনচ্যুত হয় এবং এর ফলে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে ৪ ঘণ্টা। এই রেললাইনই দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের সংযোগ রক্ষা করছে। রাজধানীর সাথে রেলের গোটা পশ্চিমাঞ্চল এবং প্রতিবেশী দেশের ট্রেন যোগাযোগ এর ওপরই নির্ভরশীল। গত ১৮ তারিখে ঝিনাইদহে কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হওয়ার ফলে একাধারে সাড়ে ৮ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এ কারণে রাজশাহী-খুলনা ও ঢাকা-খুলনা রুটের সব ট্রেন বিলম্বে চলতে বাধ্য হয়েছে।
এ দিকে, রেলওয়ের পরিসংখ্যান মোতাবেক, ২০১৪ সাল থেকে গত জুন মাস পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে ৮৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে ৬৩৯ বার। এটা মোট দুর্ঘটনার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। গুরুত্বপূর্ণ রুটে লাইন থেকে ট্রেন বিচ্যুত হয়েছে ৩৯৯ বার। সপ্তাহে গড়ে দুইবার করে দুর্ঘটনা ঘটেছে রেলপথে। এর অর্ধেকই প্রধান রুটগুলোতে হয়েছে। সেখানে একবার ট্রেন লাইনচ্যুত হলে কয়েক ঘণ্টা ধরে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়, যার জের চলে সপ্তাহখানেক। একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হলে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করা বা রাখার পুরো প্রক্রিয়াই ভণ্ডুল হয়ে যায়।
ট্রেনে যাতায়াত করা আজো অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং কম ঝামেলার ভ্রমণমাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। তদুপরি বাংলাদেশে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে এবং সড়কপথে দুর্ঘটনার তাণ্ডব ক্রমবর্ধমান। এই প্রেক্ষাপটে রেল যোগাযোগের প্রয়োজন ও গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
অবিলম্বে রেলের যাবতীয় সমস্যা দূর করে ট্রেন যাতায়াত সহজ-স্বাভাবিক করার জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে দেশবাসীর প্রত্যাশা।

 


আরো সংবাদ