১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
জয়শঙ্করের বাংলাদেশ সফর

কাশ্মির ইস্যুতে কার স্বার্থ রক্ষিত হলো?

-

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর এমন এক সময় বাংলাদেশ সফর করে গেলেন; কাশ্মির ইস্যুতে যখন দেশটির সরকার চাপের মুখে রয়েছে। তার সফরের একদিন পরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিবৃতিতে বলা হয়, ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করা দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়। ৩৭০ ধারাটি কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা-সংক্রান্ত। এদিকে কাশ্মির নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলা উত্তেজনায় মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ এ ব্যাপারে কথা বলতে চান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে। এ প্রসঙ্গে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদেও আলোচনা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিদারুণ উদ্বেগের বিষয়টি এর মাধ্যমে বোঝা যায়। কাশ্মির নিয়ে উদ্ভূত সঙ্কটকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বিবৃতি দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের কী অর্জন হলো, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সফরে এবার জয়শঙ্কর ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ককে বিশ্বে রোল মডেল বলে আখ্যা দিলেন। তিনি বলেন, অংশীদার হিসেবে একসাথে কাজ করলে প্রতিবেশীরা কী করতে পারে, তার উদাহরণ হয়ে আছে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক। উভয় দেশের স্বার্থ রয়েছে, এমন প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় দুই দেশের জনগণ লাভবান হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জয়শঙ্কর ঢাকায় নেমে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক উচ্চতর পর্যায়ে নিতে অমীমাংসিত সব বিষয়ে তিনি আলোচনা করবেন। বাস্তবে দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নিয়ে কোনো অগ্রগতি হতে দেখা গেল না এ সফরে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আলোচনার পর সংবাদ সম্মেলন থেকে যা জানা গেল, তা গতানুগতিক ও পুনরাবৃত্তি মাত্র। তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে আবারো জয়শঙ্কর কেন্দ্রীয় সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে কখন এ চুক্তি হবে, এ ব্যাপারে কোনো কিছু তিনি জানাতে পারেননি। ৫৪টি নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে তিনি নতুন কথা শোনালেন। সেটা হচ্ছে, অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টনে উভয়ে লাভবান হতে পারে, এমন একটি উপায় খুঁজতে হবে। তিনি এমন এক সময় নতুন ফর্মুলার কথা বলছেন, যখন বেশির ভাগ অভিন্ন নদীর উজানে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অনেকগুলোর উজানে বাঁধ তৈরির কাজ দেশটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নতুন ফর্মুলার একটি বাস্তব রূপরেখাও উপস্থাপন করা হলো না। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয় হচ্ছে, আসামে ৪০ লাখ নাগরিকের ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যাওয়া। এ ইস্যুটিতে জয়শঙ্করের বক্তব্য হচ্ছে, এটাও ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ব্যাপার। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এ ব্যাপারে আগেই মন্তব্য করেছেন। তিনি ওই নাগরিকদের ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ বলে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি সফরকালে এ ব্যাপারে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশের জন্য বাংলাদেশের ওপর চাপ ছিল। আসামের ৪০ লাখ নাগরিক যারা অবৈধ হয়ে গেল, তাদের ব্যাপারে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করতে হবে। সেটা না করে তাদের অনেকটাই বাংলাদেশের জন্য একটা হুমকি হিসেবে রাখা হলো। বর্ধিত হারে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কাশ্মির নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি। এক দিন পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে জানাল, সেটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। এ বিবৃতি মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মিরের পক্ষে গেছে, এমনটি বলার কোনো সুযোগ নেই। অথচ পুরো কাশ্মির ভারতের এমন অভাবনীয় অন্যায় সিদ্ধান্তের ফলে অগ্নিগর্ভ হয়ে রয়েছে।
বরাবরের মতো উভয় দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশ ও ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে অতিশয় সন্তোষমূলক কথা বলছে। কিন্তু উভয় দেশের মধ্যে প্রধান যেসব সঙ্কট রয়েছে, সেগুলোর সমাধানের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার প্রাধান্য লক্ষ করা যাচ্ছে। এভাবে দুটো দেশের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ক রোল মডেল হতে পারে না। এ অঞ্চলের জনগণ প্রত্যাশা করে, উভয় দেশের মধ্যে একটি সত্যিকার বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক বজায় থাকবে, যেখানে উভয় দেশের স্বার্থ প্রাধান্য পাবে।

 


আরো সংবাদ