১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভিসি ও ডিনের পদত্যাগ দাবি প্রসঙ্গ

-

দেশজুড়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলছে। দুর্নীতি, লুটপাট, অনিয়ম, অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অব্যবস্থাপনা পুরো সমাজকে গ্রাস করেছে বলে মনে হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে বালিশ কেনা, ফরিদপুরে হাসপাতালের পর্দা কেনা, স্বাস্থ্য অধিদফতরের বই কেনা প্রভৃতি ঘটনা দুর্নীতির নমুনা বলে মনে করতে হয়। মাদকের বিস্তার, বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার, ব্যাংক খাতের অনিয়ম, টেন্ডার ছাড়া কোটি কোটি টাকার সরকারি ক্রয়, সরকারের প্রকল্পে জবাবদিহিতাবিহীন কর্মকাণ্ডের সয়লাবÑ সব দেখে মনে হয়, দেশে এগুলোই যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। আইন-কানুন, নিয়মবিধি অনুসরণ এবং ন্যূনতম নৈতিকতা মেনে চলার তাগিদ কোথাও কারো মধ্যে অবশিষ্ট থাকার ঘটনা চোখে পড়ছে না।
এই পরিস্থিতিরই সর্বশেষ নমুনা সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই ছাত্র ভর্তির ঘটনা। খবরে বলা হয়েছে, পরীক্ষা ছাড়া ৩৪ জনকে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খোদ ভিসি এবং একটি অনুষদের ডিন। এটি নিয়মের লঙ্ঘন শুধু নয়, চরম অনৈতিক একটি কাজ।
পরীক্ষা ছাড়া ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা সবাই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতা। এদের মধ্যে আটজন এবার ডাকসুর নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। ভিসি এবং ডিন চিরকুট দিয়ে সব নিয়ম লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ছাত্র ভর্তি করাচ্ছেনÑ এটা ভাবলেও বিস্মিত হতে হয়। কিন্তু তারা এটা করেছেন এবং জেনেশুনেই করেছেন। তাদের দায়িত্বে থাকার আর কোনো নৈতিক অবস্থান কি আছে?
ভর্তিপরীক্ষা ছাড়া সান্ধ্যকালীন কোর্সে ভর্তি হয়ে ডাকসুতে নির্বাচিত ব্যক্তিদের পদ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গত রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করে তারা এই দাবি জানান। ছাত্রছাত্রীরা অবৈধভাবে ভর্তি হওয়া তরুণদের ছাত্রত্ব ও ডাকসুর পদ বাতিল করে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার, খালি পদগুলোতে দ্রুত উপনির্বাচন দেয়া এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদের আট নেতার ছাত্রত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স শেষ হওয়ায় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে তারা ব্যবসায়শিক্ষা অনুষদের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের মাস্টার্স অব ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে ভর্তি হন। পরীক্ষা ছাড়া তাদের ভর্তির বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক মো: আখতারুজ্জামান সংশ্লিষ্ট দৈনিককে বলেন, সান্ধ্যকালীন ওই প্রোগ্রামে ভর্তির প্রক্রিয়া তার জানা নেই। ভিসির অনুমতি নিয়ে এসব শিক্ষার্থীর ভর্তি হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে অনুষদের ডিনের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। এর অর্থ হলো, তিনি প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাতে করে কি তিনি নিজের দায় এড়াতে পারেন?
এদিকে সংশ্লিষ্ট ডিন প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘আপনি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে খোঁজখবর করছেন। আপনি আমাদের ম্যালাইন করার জন্য কিছু একটা লিখতে চাচ্ছেন। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপনার সাথে এ বিষয়ে কথা বলব না।’ ডিনের এই বক্তব্য কেবল দায় এড়ানোর চেষ্টা নয় বরং তা রীতিমতো আক্রমণাত্মক ও আপত্তিকর। নিজেরা অপকর্ম করবেন আর সেটা লিখতে গেলে কুৎসা রটানো হবে, কোন যুক্তিতে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দৈনিকটিকে বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যায়ভাবে কেউ ভর্তি হয়ে থাকলে এর সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।’ কিন্তু এই ব্যবস্থা কে নেবেন? শিক্ষামন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী কি এ বিষয়ে নজর দেবেন?
আমরা আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তা না হলে বোঝা যাবে মন্ত্রণালয় অনিয়ম ও অনৈতিকতার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করছে।
আমরা নৈতিক স্খলনের দায়ে ভিসি ও ডিনের পদত্যাগ দাবি করছি।


আরো সংবাদ