১৮ অক্টোবর ২০১৯
পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি

আমরা মুখে কুলুপ এঁটে আছি

-

ভারতে আসামের পর এখন পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করা নিয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে ভারতের উগ্রপন্থী শাসকদল বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আসামের ‘জাতীয় নাগরিক নির্মূল’ বা এনআরসির কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং তার রাজ্যে কোনোভাবেই এনআরসি করতে দেবেন না বলে ঘোষণা করেছেন। ব্যাপারটা মমতার তৃণমূল কংগ্রেস এবং রাজ্য বিজেপি উভয়ের জন্যই স্থানীয় রাজনীতির সুবিধা আদায়ের সাথে জড়িত। তৃণমূল চায় বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান যারা পশ্চিমবঙ্গে যেকোনোভাবে বসবাস করছে, তাদের সার্বিক সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে। আর বিজেপি চায় ‘অবৈধ’দের বের করে দিয়ে ভোটের রাজনীতিতে সুবিধা অর্জনের মাধ্যমে এবার এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে।
আসামের নাগরিকত্ব তালিকার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘রাজনীতিবিদদের কূটচালের কারণে নিজ দেশে গৃহহীন হয়ে পড়েছে ১৯ লাখ মানুষ। ওই তালিকা বা এনআরসির মাধ্যমে যারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটছে, তাদেরকে জাতির কাছে জবাবদিহি করতে হবে।’
এ ক্ষেত্রে সম্ভবত বিজেপি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কারণ, দিল্লিতে ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকার বিজেপির। আর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যদি আইন করে এনআরসি বাধ্যতামূলক করে দেয়, তাহলে সেটি রোধ করার সাধ্য তৃণমূলের থাকবে না। আর এই সীমাবদ্ধতাকেই পুঁজি করেছে বিজেপি। তারা মমতার অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে গিয়ে তাকে ‘বিদেশী শক্তির সমর্থনপুষ্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস পাচ্ছে।
উত্তর প্রদেশ রাজ্যের একজন বিজেপি বিধায়ক বলেছেন, ‘এনআরসির বিরুদ্ধে মমতা যে বিবৃতি দিচ্ছেন, তা প্রমাণ করে যে তাকে বিদেশী বাহিনী সমর্থন করছে। তিনি বলেন, তৃণমূল নেত্রী যদি বাংলাদেশীদের ধরে রাখতে চান, যদি বাংলাদেশের জনগণের সমর্থন নিয়ে রাজনীতি করতে চান, তবে তার সে দেশেই চলে যাওয়া উচিত।’
পশ্চিমবঙ্গের বাস্তবতা হলো, উপমহাদেশের স্বাধীনতার পর প্রায় ৭০ বছর ধরেই বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা নির্যাতনের কথা বলে দলে দলে সেখানে গেছেন। সেখানে তারা বংশানুক্রমে সমাজের সাথে মিশে গেছেন। অনেকে রাজনীতিসহ সমাজের নানা অঙ্গনে শীর্ষপর্যায়ে ভালো অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখার্জি বলেন, ‘কবে সীমানা পেরিয়েছি, সেটি তো আমার স্মৃতিতে আছে। কোন স্কুলে কত বছর পড়েছি, সেটিও আমার মনে আছে। কিন্তু এসবের যদি কাগজপত্র দিতে বলে, তা তো দিতে পারব না!’ আরো উল্লেখ্য, বিশিষ্ট সাহিত্যিক মিহির সেনগুপ্তের জন্ম দেশভাগের দিন পনেরো পরেÑ বরিশালে। সেখানে ব্রজমোহন কলেজে পড়াশোনাও করেছেন। তারপর ১৯৬৩ সালে ভারতে চলে আসেন। এত দিন পর সেসব নথি দেয়া একরকম অসম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এই বাস্তবতা পুরো পশ্চিমবঙ্গের অনেকের।
বিজেপির বিধায়ক সুরেন্দ্র সিং বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে এনআরসিতে যারা ভারতের নাগরিক হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করবেন না, তাদের সম্মানজনকভাবে নিজেদের দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হবে।’ এত দিন বিজেপির পক্ষ থেকে অবৈধদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে, এ কথা উচ্চারণ করা হয়নি। এখন করা হচ্ছে যখন বাংলাদেশের সরকার সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে, অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করার বিষয়টি ভারতের পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ বিষয়। আসামের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, ‘ভারত বাংলাদেশকে বোঝাবে যে, এখানে অবৈধভাবে বসবাসরত, তাদের নাগরিকদের ফেরত নিতে হবে।’
বাংলাদেশ সরকার যখন এ বিষয়ে ‘মুখে তালা মেরে থাকা’র নীতি গ্রহণ করেছে, তখন ভারতের জন্য অধিকতর আগ্রাসী হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। যে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বলতে পারেন, করিডোর দিয়ে ভারতীয় গাড়ি পারাপার করার জন্য শুল্ক আদায় করতে যাওয়া অসৌজন্য, তাদের পক্ষ থেকে জোরালো প্রতিরোধ কেউ আশা করে না; বিজেপির মতো আগ্রাসী দল তো নয়ই।আমরা মুখে কুলুপ এঁটে আছি


আরো সংবাদ