১৫ অক্টোবর ২০১৯
ছাত্ররাজনীতির বীভৎস চেহারা

নীতিমালা গ্রহণ করা জরুরি

-

বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির এক বীভৎস রূপ প্রকাশ পেয়েছে। নিছক ভিন্নমত প্রকাশের কারণে দেশের গর্বতুল্য, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবরারকে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় পিটিয়ে খুন করার ঘটনা এর সর্বশেষ উদাহরণ। এই নারকীয় রূপটি প্রকটিত হলো ক্ষমতাসীন দলের বেপরোয়া ছাত্রসংগঠনের কর্মকাণ্ডে। একের পর এক টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, খুন, নিপীড়ন, শিক্ষকের ওপর পর্যন্ত পৈশাচিক হামলা, গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ সব কিছুতেই হামলা করে একটি পেটোয়া বাহিনী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে ছাত্রলীগ নামের সংগঠনটি।
ক্যাম্পাসে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব হলে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে টর্চার সেল। সেখানে ভিন্ন সংগঠন ও ভিন্নমতের ছাত্রদের ধরে এনে দিনের পর দিন নির্যাতন চালানো হয়েছে। টেন্ডারবাজি, ছিনতাই, নারী কেলেঙ্কারি, ধর্ষণের সেঞ্চুরি, চাঁদাবাজি, ভর্তিবাণিজ্য ইত্যাদি অপরাধমূলক অবৈধ কর্মকাণ্ডে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এটিকে আর ছাত্রসংগঠন বলার উপায় অবশিষ্ট নেই। সম্প্রতি এই সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বহিষ্কারের ঘটনা প্রমাণ করে, এটি ইতোমধ্যে একটি সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের রূপ নিয়েছে। সন্ত্রাস ও সহিংসতা তাদের যেন প্রধান হাতিয়ার; অর্থবিত্ত হাসিল করাই যার লক্ষ্য।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে তাদের একই দলের সাতজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনা মানুষ ভুলে যায়নি। আরো আগে ১৯৬৯ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আবদুল মালেক নামে একজন মেধাবী ছাত্রকে পিটিয়ে খুন করে প্রধানত এই সংগঠনের কর্মীরাই। শুধু গত পাঁচ বছরে তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে খুন হয়েছে ৪৫ জন। কতজন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। এসবই সহিংসতার জাজ্বল্যমান ইতিহাস।
পুরান ঢাকার এক দরজি দোকানের নিরীহ কর্মী বিশ্বজিৎ দাসকে প্রকাশ্যে রাজপথে একদল ছাত্রলীগ কর্মী রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে, বছর কয়েক আগের এই দৃশ্য মানুষ এখনো শিউরে উঠে স্মরণ করে। ওই হত্যা মামলার রায়ে হাইকোর্ট দেশের ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করেছিলেন। ছাত্ররাজনীতির বর্তমান বীভৎস চেহারা উন্মোচনের প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের সে পর্যবেক্ষণ নতুন করে সামনে এসেছে। তাই একাধিক জাতীয় দৈনিক জাতিকে মনে করিয়ে দিয়েছে উচ্চ আদালতের ওই অভিমত। আদালতের সে রায়ে বলা হয়, ‘দেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্ররাজনীতির দীর্ঘ সংগ্রামের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস কিছু তরুণের জন্য কলঙ্কিত হচ্ছে। এরা ছাত্ররাজনীতির নামে প্রকৃতপক্ষে সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধে সম্পৃক্ত। এ পরিস্থিতি উদ্বেগ ও হতাশার। জাতি এ থেকে পরিত্রাণ চায়। এটি আশা করা যায় যে, সরকার ও বিরোধী পক্ষের দায়িত্বশীল জাতীয় নেতারা এই সমস্যার সমাধানে ছাত্ররাজনীতি ও আন্দোলনের বিষয়ে নীতি গ্রহণ করবেন।’
এই পর্যবেক্ষণের সাথে দ্বিমত প্রকাশের কোনো অবকাশ নেই, বরং বাস্তব অবস্থা এমন যে, ছাত্ররাজনীতির নামে সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধপ্রবণতা ‘কিছু তরুণ’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। ছাত্ররাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যই যেন এখন অপরাধমুখীÑ নানা ধরনের জবরদস্তিমূলক পন্থায় অর্থ উপার্জনসহ খুনোখুনি পর্যন্ত।
পত্রিকায় বলা হয়েছে, ছাত্ররাজনীতির অবক্ষয় কী করে ঘটল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের জাতীয় রাজনীতির দিকে অবশ্যই তাকাতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের নেতারা ছাত্রসংগঠনগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আসছেন বলেই ছাত্ররাজনীতি স্বকীয় বৈশিষ্ট্য হারিয়ে দলগুলোর লেজুড়ে পরিণত হয়েছে। অন্য দিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনও ছাত্রসংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে দলীয় বা উপদলীয় স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে। দৈনিকটি বলছে, সব সরকারের আমলে ছাত্রাবাসগুলোর প্রশাসন থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশে ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী ছাত্রসংগঠনের নেতাদের জবরদস্তিমূলক উপস্থিতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যাপীঠের বৈশিষ্ট্য ভীষণভাবে ক্ষুণœ করেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে অনেকটাই জিম্মি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে জোর খাটানোর কথাও সে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন তিক্ত বাস্তবতায়, বিশেষ করে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ ছাত্ররাজনীতি বন্ধ বা অন্তত স্থগিত করার দাবি তুলেছেন। আমাদের মনে হয়, আপাতত ছাত্ররাজনীতি স্থগিত করে হাইকোর্টের অভিমতের আলোকে এ বিষয়ে সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে যথাযথ নীতিমালা গ্রহণ করাও সময়ের দাবি।

 


আরো সংবাদ