১৭ নভেম্বর ২০১৯
বাংলাদেশের সীমান্ত হত্যা

জোরালো অবস্থানই কাম্য

-

বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) হাতে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) এক জওয়ানের মৃত্যু নিয়ে তুলকালাম চলছে ভারতীয় গণমাধ্যমে। তারা এমনভাবে ঘটনাটি প্রচার করছে, যেন এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা দু’দেশের সীমান্তে আর ঘটেনি। তারা ঘটনার সম্পূর্ণ দায় আমাদের বিজিবির ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস চালাচ্ছে অসত্য তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে। বলা হচ্ছে, দুই বাহিনীর মধ্যে ‘পতাকা বৈঠক’ চলার সময় বিজিবির এক সদস্য গুলি চালিয়ে বিএসএফ জওয়ানকে হত্যা করেছে। এই ভুয়া অভিযোগে বিজিবির বিরুদ্ধে মামলাও করেছে বিএসএফ।
‘পতাকা বৈঠক’ চলার সময় বিজিবি সদস্য গুলি করেছে, এই তথ্যটি সর্বৈব মিথ্যা। সেখানে কোনো পতাকা বৈঠক আদৌ চলছিল না। রাজশাহীতে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বেশ ভেতরে এসে মাছ ধরার কারণে বিজিবি এক ভারতীয় জেলেকে আটক করেছিল। আর বিএসএফের সদস্যরা এসে ওই জেলেকে গায়ের জোরে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালায়। বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যেন পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আলোচনা করে তাকে ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ। কিন্তু তারা রীতিমাফিক, পতাকা বৈঠক ছাড়া নেহায়েত গায়ের জোরে সে জেলেকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। বিএসএফের একগুঁয়েমি ও বাড়াবাড়ির কারণেই সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং বিজিবি সদস্য গুলি চালাতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে গিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অসত্য তথ্য তুলে ধরে সে দেশের জনগণের মধ্যে বাংলাদেশবিরোধী চেতনা উসকে দেয়ার কাজ করছে। এ ধরনের আচরণ সৎ প্রতিবেশীসুলভ নয়।
গত বৃহস্পতিবার রাজশাহীর চারঘাট সীমান্তে পদ্মা নদীর চরে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনাকে ‘অনাকাক্সিক্ষত’ বলেছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সাংবাদিকদের তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বিএসএফ পতাকা বৈঠকের জন্য অপেক্ষা না করে আটক জেলেকে ছেড়ে দিতে জোরাজুরি করায় গোলাগুলির এ ঘটনা ঘটেছে। একই বিষয়ে কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেনও। তিনি বলেন, বিএসএফ সদস্যরা রাজশাহী সীমান্তে ঢুকে ‘বাহাদুরি’ দেখিয়েছে বলেই (বিজিবি) বাধ্য হয়ে গুলি করেছে। বিজিবিকে সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে বাধ্য হয়ে গুলি করতে হয়েছে। আমাদের মনে আছে, সম্প্রতি অপরাধীদের তাড়া করে ভুলে ভারতীয় এলাকায় ঢুকে পড়ায় বিএসএফ বাংলাদেশের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) দু’জন সদস্যকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। তাদেরকে চোখ বেঁধে আহত অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছিল ভারতের বিএসএফ। বাংলাদেশী নাগরিকদের সাথে প্রায় সময়ে বিএসএফ যে আচরণ করে, তাকে কোনোভাবেই সভ্য আচরণ বলা যায় না। বিএসএফ প্রতিনিয়ত সীমান্তে বাংলাদেশীদের গুলি করে খুন জখম করছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এর বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেয়া দূরের কথা, যথাযথভাবে প্রতিবাদও জানায়নি। এ জন্য মামলা করা তো দূরঅস্ত।
জার্মান মিডিয়ার সাথে কথা বলতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগে বিএসএফের গুলিতে বছরে একজন মারা যেত। আমরা তখন কেবল দুঃখ করেছি। গত বছর তিনজন মারা গেছে। তিনি বলেন, সীমান্তের ঘটনায় আমরা আগে কখনো মামলা করিনি। ভারত এখন মামলা করছে। আগামী দিনে বাংলাদেশও একই পথে হাঁটতে পারে। সবাই জানেন, সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে গত এক দশকে অন্তত ৩০০ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। তবে একটি ঘটনারও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। এমনকি বহুল আলোচিত মর্মান্তিক ঘটনা, ফেলানী হত্যারও ন্যায্য বিচার হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে সীমান্ত হত্যার প্রতিটি ঘটনায় বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা হলে এটি ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু রাজনৈতিক ও অন্যান্য নানা কারণেই সরকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে বিএসএফ আমাদের ভূখণ্ডে এসে অন্যায় ‘বাহাদুরি’ দেখানোর সাহস পায়। আর ভারতীয় গণমাধ্যম কোনো কোনো মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে অযৌক্তিকভাবে তুলকালাম কাণ্ড বাধায়।
আমরা আশা করব, সীমান্তের প্রতিটি অবাঞ্ছিত ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার জোরালো অবস্থান নেবে এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের যথাযথ মর্যাদা ও ইমেজ রক্ষায় সচেষ্ট থাকবে।


আরো সংবাদ