১৭ নভেম্বর ২০১৯
পদাধিকারীদের নির্বোধ উচ্চারণ

সালাম ঠোকাই আমাদের নিয়তি?

-

রাষ্ট্র ও সরকার এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সমাসীন ব্যক্তিদের কারো কারো বক্তব্য-বিবৃতি জনগণের উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ তাদের কথায় বিব্রত বোধ করছে। অনেকসময় তাদের উক্তি মানুষের বিরক্তির কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। মানুষ বুঝতে পারছে না, জাতির নেতৃত্বের আসনে যারা অধিষ্ঠিত, তাদের বোধবুদ্ধি-মেধামননে সত্যিই ঘাটতি আছে, নাকি তারা কোনো বিশেষ মহলের স্বার্থ রক্ষা করছেন।
বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে জনগণ ভোট দেয়নি এবং তিনি নিজে ও অন্য সব সংসদ সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেনÑ মর্মে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের একটি বক্তব্য নিয়ে সারা দেশে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকের মতে, মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার মনোকষ্ট থেকেই তিনি এমন কথা বলছেন এবং এর লক্ষ্য হলো সরকারকে চাপে ফেলে কোনোভাবে মন্ত্রিত্ব বাগানো যায় কি না, তার চেষ্টা করা।
মেনন সম্ভবত ভুলে গেছেন, তিনি ওবায়দুল কাদেরের মতো ‘আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত নেতা’ নন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ পড়া ওবায়দুল কাদের সরকারের সমালোচনার যে পথ ধরে মন্ত্রিত্ব পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন, একই দাওয়াই তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাই দেখা গেল, মেননের ওই বক্তব্যের পরই ক্যাসিনো থেকে তার ‘মাসে ১০ লাখ টাকা করে নেয়া’র অভিযোগ পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ খবর হয়ে গেল। এটা হয়তো ধারাবাহিকভাবে চলতে পারত, কিন্তু মেনন ‘ত্বরিত আত্মসমর্পণ’ করেছেন। রোববার রাতেই তিনি ভোল পাল্টে নিয়েছেন এবং এর আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে ‘ব্যাখ্যা’ দিয়েছেন।
এমনই আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচিত ভিসি ড. মীজানুর রহমান। তিনি হঠাৎ করেই বলে বসলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুবলীগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হলে তিনি ভিসির পদ ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। এই বক্তব্য সারা দেশে মানুষের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একজন ভাইস চ্যান্সেলরের মেধা ও মননের কতটা বিভ্রান্তি বা অপরিপক্বতা কিংবা রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতা থাকলে এ ধরনের চিন্তা মাথায় আসতে পারে, তা ভেবে অনেকে উদ্বিগ্ন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকে ছি ছি করেছেন, অনেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ধামাধরা দলীয় শিক্ষকদের নিছক রাজনৈতিক বিবেচনায় ভিসি পদে নিয়োগের কুফল সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
মনে হয়, সবচেয়ে গুরুতর ও বিপর্যয়কর মন্তব্যটি এসেছে একজন সাংবিধানিক পদাধিকারীর মুখ থেকে। তিনি আমাদের নির্বাচন কমিশনের প্রধান। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদা বলেছেন, ‘নাগরিকরা ভোট দিতে পারুক বা না পারুক সেটা বিষয় নয়; বিষয় হলো তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে হবে।’ তিনি প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, এখন দেশের নাগরিকরা ভোট দিতে পারেন না। তার সময়ে সংসদ নির্বাচনসহ যতগুলো নির্বাচন হয়েছে তার সব ক’টিতেই এই সত্য প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং তার বক্তব্যের পরের অংশটি মুখ্য হয়ে ওঠে। নাগরিকদের অন্ততপক্ষে একটি ভোটার পরিচয়পত্র তো থাকুক! তখন তারা বলতে পারবে, ‘আমি একজন সম্মানিত ভোটার’। ভোটার তালিকাবিষয়ক এক কর্মশালার উদ্বোধনকালে সিইসি আরো বলেছেন, ভোট দেয়ার চেয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার গুরুত্ব বেশি।
নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে একজন সিইসির উপলব্ধির মান যখন এতটা নেমে আসে তখন জাতির আর আশা করার কোনো ভিত্তি থাকে না। একই অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, যেসব জনপ্রতিনিধি অবৈধ উপায়ে বা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হন, তাদের নির্বাচনের বৈধতা থাকে না। তিনি বলেছেন, এ দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া দুর্নীতি মুক্ত নয়। তিনি বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই সব জাতির লক্ষ্য হয়ে থাকে। কারণ, গণতন্ত্রহীন জাতির আত্মমর্যাদা বলে কিছু থাকে না।
যা হোক, উচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিদের নির্বোধ উচ্চারণ নিয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করব না। ভিসি বা সিইসি যে-ই হোন, তাদেরকে সসম্মানে সালাম ঠোকাই যেন আমাদের জাতির অনিবার্য নিয়তি।


আরো সংবাদ