২৩ জানুয়ারি ২০২০
জলবায়ু আন্দোলন

ধনী দেশগুলো এখন বেখবর

-

মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের ফলে পৃথিবী দ্রুত বসবাসের উপযোগিতা হারাচ্ছে। বাসাবাড়ি, পরিবহন, কৃষিকাজ ও কারখানায় অপরিণামদর্শী কার্বন গ্যাস নিঃসরণ কমাতে না পারলে অচিরেই বড় বিপর্যয় নেমে আসবে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন। এ ধরনের একটি প্রেক্ষিতে প্রথমে ১৯৯৭ সালে জাপানে কিয়াটো প্রটোকল, পরে ২০১৬ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এসব চুক্তির মূল বক্তব্য হলো কার্বন নিঃসরণ একটা নির্ধারিত মাত্রার মধ্যে কমিয়ে আনতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী, কার্বন নিঃসরণ কমাতে ব্যর্থ হয়েছে পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রগুলো। বরং যারা প্রধানত দায়ী তারা কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যথার্থ অংশগ্রহণও করছে না।
জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন কপ২৫ এবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে। অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশটি এ সম্মেলন আয়োজনে অপারগতা প্রকাশ করলে জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠান অনিশ্চিত হয়ে যায়। এ অবস্থায় জলবায়ু রক্ষায় সচেষ্ট স্পেন এগিয়ে এসে সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে এ সম্মেলনে আশার কোনো বাণী নেই। জলবায়ু নিয়ে কাজ করে এমন গবেষণার যেসব খবর সংবাদমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ। কার্বন নিঃসরণ আগের চেয়ে ৪ শতাংশ বেড়েছে। প্যারিস চুক্তির পক্ষগুলো কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটি কার্যকর করতে পারেনি। প্রধান পাঁচটি কার্বন নিঃসরণকারী দেশের চারটি হলোÑ চীন, ভারত, রাশিয়া ও জাপান। এসব দেশ মোট বিশ্বের ৬০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ করে থাকে। এগুলোর মধ্যে ভারত ও চীন এখনো উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে দেশ দুটোতে কার্বন নিঃসরণ মাত্রা আরো বাড়বে। এর মধ্যে জলবায়ু উষ্ণতার ফলে দরিদ্র ভারতও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে। কিন্তু তাদেরও রয়েছে উন্নয়নের সীমাহীন আকাক্সক্ষা। এ দুটো দেশের শীর্ষ নেতারা জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেননি। এ ব্যাপারটা তাদের কাছে যতটা গুরুত্ব পাওয়া দরকার ততটা পাচ্ছে না। অন্য দিকে রাশিয়া ও জাপান উন্নত দেশ হিসেবে বাকি বিশ্বের প্রতি যে দায়িত্ব, সেটি পালন করছে না। আর যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশ। জলবায়ু আন্দোলনে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়টি হচ্ছে, বিশ্ব নেতৃত্ব দানকারী এ দেশটি প্যারিস চুক্তি থেকে ঘোষণা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ফলে জলবায়ু আন্দোলনের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনের জন্য ধনী দেশগুলো দায়ী। অন্য দিকে এর শিকার বেশির ভাগ দেশ হতদরিদ্র। বিশেষ করে বাংলাদেশের কথাই বলা যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এর ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গিয়ে তলিয়ে যেতে পারে সমুদ্র উপকূলের জনবসতি। কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তু হতে পারে। এখন প্রাকৃতিক বিপর্যয় আগের চেয়ে বেড়েছে। প্রতি বছরই উপকূলে আঘাত হানছে ঘূর্ণিঝড়। এ ছাড়া লবণাক্ততা বেড়েই চলেছে। ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে উপকূলের কৃষির ওপর। সারা বিশ্বেই এর নেতিবাচক প্রভাব অব্যাহত বাড়ছে।
জলবায়ু আন্দোলনের পক্ষগুলো ‘কপ’ নামে নিয়মিত সম্মেলন আয়োজন করছে। এ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে উষ্ণতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করা। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রধান পার্টিগুলো এতে গুরুত্বের সাথে অংশ না নেয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে গতি আসছে না। এতে করে এই ধরণী এগিয়ে চলেছে ভয়াবহ পরিণতির দিকে। সুইডিশ তরুণী গ্রেটা থুনবার্গের মতো তরুণীরা এগিয়ে এসেছেন। বিশ্বকে বসবাস উপযোগী রাখতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। কিন্তু মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের এখনো বোধোদয় নেই। তাহলে কি মানুষই এ বিশ্বকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাবে?

 


আরো সংবাদ