১৬ জুন ২০১৯

প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস

প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা - ছবি : সংগ্রহ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাজস্ব খাতভুক্ত ‘সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০১৮’-এর প্রশ্ন ফাঁস শেষ পর্যন্ত ঠেকানো গেল না। প্রশ্ন ফাঁস রোধে ব্যাপক প্রস্তুতি, হাঁক-ডাক আর নতুন সফটওয়্যার ও ৯ সেট প্রশ্ন তৈরি, পরীক্ষার দিন প্রশ্ন ছাপিয়ে বিতরণসহ নানা উদ্যোগ নেয়ার পরও তা ঠেকানো যায়নি। গত শুক্রবার দেশের ২৫টি জেলায় এ পরীক্ষা হয়েছে। কোন কোন জেলায় প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে তা-ও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না এ পরীক্ষার মূল আয়োজক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই)। ডিপিই মহাপরিচালক এ এফ এম মনজুর কাদির প্রশ্ন ফাঁসের কথা স্বীকার করেছেন। 

ডিপিই ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষার আগে সাতক্ষীরার একটি কোচিং সেন্টার থেকে র্যাব-৬ প্রশ্নের উত্তর বলে দেয়ার সময় পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় চক্রের সদস্যসহ ২৯ জনকে আটক করে। এতে সাতক্ষীরার স্থানীয় পাঁচ ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গেছে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ২১ জনকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেন। এদের মধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তা এবং প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকও রয়েছেন। ঢাকা থেকে একটি চক্র এ প্রশ্ন ফাঁস করেছে বলে শোনা যাচ্ছে। র্যাব ঘটনাটি ডিপিইকে অবহিত করেছে। 

পরীক্ষা অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিলেও জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাই পরীক্ষা অনুষ্ঠানের মূল ব্যবস্থানপায় ছিলেন। তারা প্রশ্ন ফাঁসের জন্য যেসব ব্যবস্থা নেয়ার ও তদারকির প্রয়োজন ছিল তা নির্দেশনামতো করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। 

তাদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না, তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি ডিপিইর ডিজি এ এফ এম মনজুর কাদির। প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, নিয়োগ পরীক্ষার প্রথম ধাপেই সাতক্ষীরায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য-প্রমাণ আসেনি। এ ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো। দ্বিতীয় ধাপে যাতে প্রশ্ন ফাঁস না হয় সে জন্য নজরদারি জোরদারের কথা জানিয়েছেন তিনি। 

জানা গেছে, সরকারি ছুটির দিনেও গতকাল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে (ডিপিই) নিয়মিত অফিস করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আগের দিন শুক্রবার দেশের ২৫ জেলায় নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ত্রুটিহীনভাবে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠান নিয়ে গত এক মাস ডিপিইর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেক পরিশ্রম করলেও শুরুতেই তারা হোঁচট খেলেন। সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রায় ছয় লাখ প্রার্থী অংশগ্রহণ করেন।

প্রশ্ন ফাঁস চক্রের ঢাকার মূল হোতাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। অন্য দিকে, পটুয়াখালীতে নকল সরবরাহের সময় ধরা পড়া পুলিশ কর্মকর্তাকে এক মাসের দণ্ড দেয়া হয়েছে। লক্ষ্মীপুরেও সোলায়মান নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি ফেসবুকে কথিত প্রশ্ন আপলোড করেছিলেন, যার সাথে মূল প্রশ্নের মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি পরীক্ষার্থীদের। অনিয়মের দায়ে পাবনায় আটজন আটক এবং চারজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন জেলায় পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বেশ কয়েকজনকে আটক ও বহিষ্কারের খবর নিশ্চিত করেছে ডিপিই। 

আটককৃতদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র সাতক্ষীরা নয়, ঢাকা থেকে ফাঁস করা হয়েছে। সাতক্ষীরায় রাতভর মোবাইল ফোনে প্রশ্ন সংগ্রহ করে উত্তর লিখে দেয়া হয় পরীক্ষার্থীদের। সন্দেহ করা হচ্ছে, দেশের অন্যান্য জেলায় যেখানে যেসব জেলায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানেও ফাঁসকৃত প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়তে পারে; কিন্তু তৎপরতার অভাবে কোথাও কেউ ধরা পড়েনি। কেউ কেউ বলছেন, সাতক্ষীরা থেকেও ফাঁস হতে পারে। তবে গ্রেফতার ব্যক্তিদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলে জানা গেছে। মূল হোতাদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করার প্রচেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। 

প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে গতকাল সরকারি ছুটি থাকায় মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণে মন্ত্রণালয়ের ১৪ সদস্যের কমিটি কাজ করেছিল। মন্ত্রণালয় সূত্রে আগে জানানো হয়েছিল, একাধিক সেট প্রশ্নপত্র করা হলেও বিন্যাস পরিবর্তন করে সেট করা হয়েছে মোট ৯টি। ওই প্রশ্ন এনক্রিপ্ট ফরমেটে দুই ভাগে একটি ডিসি এবং আরেকটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়। পরে দু’জনে একত্র হয়ে বিশেষ পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে ডাউনলোড করে বৃহস্পতিবার রাতে ছাপানোর ব্যবস্থা নেন।

উল্লেখ্য, তিন পার্বত্য জেলা বাদে সারা দেশে ৬১ জেলার ২৪ লাখ এক হাজার ৯১৯ জন প্রার্থী প্রায় ১২ হাজার পদের বিপরীতে এ পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। প্রথম ধাপে ২৪ মে, দ্বিতীয় ধাপে ৩১ মে, তৃতীয় ধাপে ২১ জুন এবং চতুর্থ ধাপে ২৮ জুন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা হয়েছে।


আরো সংবাদ