২০ অক্টোবর ২০১৯
শিক্ষার হালহকিকত

শিশুদের ভাষার আগে ব্যাকরণ শেখাচ্ছে স্কুল!

শিশুদের ভাষার আগে ব্যাকরণ শেখাচ্ছে স্কুল! - ছবিটি প্রতিকী

শাওন রাজধানীর বনশ্রীর একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। কয়েক দিন আগে তার অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তার ইংরেজি বিষয়ের প্রশ্ন ছিল মোট তিন পৃষ্ঠার। এর মধ্যে ইংরেজি গ্রামার বিষয়ে তিনটি প্রশ্ন ছিল। এগুলো হলো গ্রামার কাকে বলে উদাহরণ দাও, সাউন্ড কাকে বলে, অ্যালফাবেট কাকে বলে উদাহরণ দাও। 

শাওন এ প্রতিবেদককে জানায়, ব্যাকরণ বিষয়ে স্কুল থেকে তাদের জন্য কোনো বই পাঠ্য করেনি। তবে ইংরেজি বিষয়ে স্কুল থেকে তাদেরকে যে শিট দেয়া হয়েছে তাতে এক পৃষ্ঠায় ইংরেজি গ্রামার বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। সেখান থেকেই স্কুলের পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছে। 

শাওনের ইংরেজি প্রশ্নপত্রে যেসব প্রশ্ন এসেছে তার অনেক কিছুই মূল বইয়ে নেই। সাধারণত অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা হয় বইয়ের প্রথম অর্ধাাংশ থেকে। শাওনের ইংরেজি বিষয়ের প্রশ্নপত্রে এমন সব প্রশ্ন রয়েছে, যা দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্য সরকারিভাবে পাঠ্যকৃত ইংরেজি বইয়ের প্রথম অর্ধাংশে তো নেই-ই পুরো বইয়ে নেই। প্রশ্নপত্রে বাংলা থেকে ইংরেজি ও ইংরেজি থেকে বাংলায় ট্রান্সলেশন এসেছে। বাংলা থেকে ইংরেজি ট্রান্সলেশনের মধ্যে একটি বাক্য রয়েছে ‘কত দিনে এক সপ্তাহ?’। আবার ইংরেজি থেকে বাংলাকরণের মধ্যে একটি বাক্য রয়েছে! 'ডব যধাব ধ ারষষধমব.'
শাওনের অভিভাবক এ প্রতিবেদককে বলেন, উই হ্যাভ এ ভিলেজ’ এটা কোন জাতের বাক্য। এ ছাড়া কি আর কোনো অর্থবোধক সহজ কথা দুনিয়ায় নেই?

এ ছাড়া প্রশ্নপত্রে সত্যমিথ্যা নির্ণয়, বাক্য রচনা ও প্যারাগ্রাফ রাইটিং রয়েছে। শাওন জানায়, যেসব প্রশ্ন বইয়ে নেই তা স্কুল থেকে দেয়া শিট থেকে এসেছে পরীক্ষায়। 

দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল থেকে গ্রামার বই পাঠ্য করা না হলেও রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে তৃতীয় শ্রেণী থেকে ভারী ইংরেজি গ্রামার বই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইংরেজি পরীক্ষায় ব্যাকরণ থেকে করা হয় কঠিন সব প্রশ্ন। বিভিন্ন স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীর জন্য পাঠ্য করা হয়েছে ২৬০ পৃষ্ঠার ইংরেজি গ্রামার বই। এ বইয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে টেন্স, পার্টস অব স্পিচ, সেন্টেন্সসহ ব্যাকরণের যাবতীয় বিষয়। এ ছাড়া এ বইয়ে আরো যেসব বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ভাওয়েল, কনসোনেন্ট, ওয়ার্ড অ্যান্ড সিলেবল, সাবজেক্ট অ্যান্ড প্রেডিকেট, জেন্ডার, নাম্বার, কেস প্রভৃতি। 

তৃতীয় শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর একজন অভিভাবক এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি যখন এইচএসসিতে পড়ি তখন দু’জন ইংরেজি শিক্ষকের যৌথভাবে লেখা একটি ইংরেজি গ্রামার বই পড়েছিলাম। ২৫ বছর পরে তাদেরই লেখা গ্রামার বই এখন দেখতে পাচ্ছি আমার তৃতীয় শ্রেণী পড়ুয়া সন্তানের জন্য পাঠ্য করা হয়েছে। বইয়ের ওপর লেখা রয়েছে ফর ক্লাস থ্রি। কিন্ডার গার্টেন, মাদরাসা ও প্রাইমারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য রচনা করা হয়েছে এ বই। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ অভিভাবক বলেন, এ বই দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। তৃতীয় শ্রেণীর শিশুদের জন্য কী করে তারা ব্যাকরণ বই লিখতে পারলেন। তা-ও আবার এত বড় এবং বিস্তারিতভাবে। 

এ অভিভাবক বলেন, যেখানে তৃতীয় শ্রেণীর একটি শিশু ভালো করে নিজের মাতৃভাষাই শেখেনি সেখানে তার ওপর স্কুল থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বিশাল এ ইংরেজি ব্যাকরণ বই। তৃতীয় শ্রেণীর একটি শিশু ইংরেজি ভাষারই বা কী জানে। এত ছোট শিশুদের ওপর কেন চাপানো হলো এ বিশাল ব্যাকরণ বইয়ের বোঝা? মানুষের নীতিনৈতিকতা কত নিচে নামতে পারে তার উদাহরণ এ বই। 

রাজধানীর অনেক স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতেও পড়ানো হচ্ছে অতি পরিচিত এ দুই লেখকের লেখা ইংরেজি গ্রামার বই। বনশ্রীর চতুর্থ শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, স্কুলে বিশাল ব্যাকরণ বই পাঠ্য করা হয়েছে; কিন্তু স্কুল থেকে এসব তেমন কিছু শেখানো হচ্ছে না। পুরো কোর্স শেষ করতে পারে না। অনেক বিষয় স্কুলে আদৌ টাচই করা হয় না; কিন্তু পরীক্ষায় সেসব বিষয়ে প্রশ্ন আসে। আসলে শিক্ষকদের কাছে যারা প্রাইভেট পড়ে তাদেরকে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন বলে দেন অনেক শিক্ষক। আর তারা পরীক্ষায় ভালো করে। আমার মেয়েকে প্রাইভেট পড়াতে পারিনি। সে ইংরেজি পরীক্ষায় মোটেই ভালো করতে পারেনি। 

চুতর্থ শ্রেণীর আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, কোনো দিন কি কেউ শুনেছেন, স্কুলের ক্লাসে শিক্ষার্থীরা ব্যকরণ শিখতে পারে ভালো করে? গণিত যেমন কোচিং বা প্রাইভেটে শিখতে হয় তেমনি ব্যাকরণও শিক্ষার্থীরা মূলত শেখে কোচিং প্রাইভেটে অথবা মা-বাবার কাছে। আর অনেকে শেখে নিজে বই পড়ে। আসলে এসব বই পাঠ্য করে শিক্ষার্থীদের ওপর যেমন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে তেমনি অভিভাবকদেরও ঠেলে দেয়া হয়েছে হয়রানির মধ্যে। বাধ্য করা হচ্ছে এই ছোট শিক্ষার্থীদের কোচিং প্রাইভেট পড়তে শিক্ষকদের দ্বারস্থ হতে। 

অনেক অভিভাবক ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ যা ইচ্ছা তা করে যাচ্ছে; কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে কোনো দেখভাল করছে না। তাদের সঠিক তদারকি থাকলে কোনো স্কুল এভাবে তৃতীয় শ্রেণীর জন্য গ্রামার বই যেমন পাঠ্য করতে পারত না তেমনি কোনো লেখক-প্রকাশকও এসব বই লেখা ও প্রকাশে আগ্রহী হতেন না। তাদের মতে, যেসব স্কুল এসব বই পাঠ্য করেছে তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। শিক্ষার নামে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জিম্মি দশা থেকে মুক্ত করা উচিত।

 


আরো সংবাদ