২৫ আগস্ট ২০১৯

৬ বছরেও চাকরি জাতীয়করণ শেষ হয়নি প্রাথমিক শিক্ষকদের

৬ বছরেও চাকরি জাতীয়করণ শেষ হয়নি প্রাথমিক শিক্ষকদের -

২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি একযোগে ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সেগুলোতে কর্মরত এক লাখ তিন হাজার ৮৪৫ জন শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নানা ধরনের অভিযোগ আর মামলা জটিলতায় গত ছয় বছরেও প্রায় তিন হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ এখনো ঝুলে আছে। তিন ধাপে ওই স্কুলগুলো এবং কর্মরত শিক্ষকদের জাতীয়করণের আওতায় আনার ঘোষণা দেয়া ছিল। কিন্তু শেষ ধাপের স্কুল ও শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ শেষ হয়েও হচ্ছে না বলে অভিযোগ। শেষ ধাপের ২৯১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হলেও নানা জটিলতায় আটকে রয়েছে শিক্ষকদের আত্তীকরণ। এসব স্কুলে কর্মরত দেড় হাজার শিক্ষকদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই) এবং শিক্ষকদের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই যুগের আন্দোলনের পর টানা তিন মেয়াদের বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘোষণা অনুযায়ী ২২ হাজার ৯৮১টি রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯১ হাজার ২৪ জন শিক্ষক ২০১৩ সালে ১ জানুয়ারি থেকেই জাতীয়করণের সুবিধা পাবেন। আর স্থায়ী বা অস্থায়ী নিবন্ধনপ্রাপ্ত, পাঠদানের অনুমতিপ্রাপ্ত, কমিউনিটি ও সরকারি অর্থায়নে এনজিও পরিচালিত দুই হাজার ২৫২টি বিদ্যালয়ের ৯ হাজার ২৫ জন শিক্ষককে ১ জুলাই ২০১৩ থেকে এবং পাঠদানের অনুমতির সুপারিশপ্রাপ্ত এবং পাঠদানের অনুমতির অপেক্ষায় থাকা ৯৬০টি বিদ্যালয়ের তিন হাজার ৭৯৬ জন শিক্ষককে তৃতীয় ধাপে ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয়করণের সুবিধা দেয়ার কথা থাকলেও কোনো ধাপই ঘোষিত সময়ে শেষ হয়নি। প্রথম ধাপে রেজিস্ট্রার্ড বা এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ করতে বেশি সময় নেয়া হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের প্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রায় ছয় মাস পরে জাতীয়করণের আদেশ জারি হয়। তবে তৃতীয় ধাপের প্রতিষ্ঠানগুলো গত ছয় বছরেও জাতীয়করণের আওতায় আসেনি এবং শিক্ষকেরাও কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। এ সময়ের মধ্যে কিছু শিক্ষকের চাকরির বয়স শেষে অবসরেও চলে গেছেন, তারা চিরদিনের জন্যই বঞ্চিত হলেন। 

ছয় বছর পরও তৃতীয় ধাপের বঞ্চিত শিক্ষকদের মধ্যে ২৯১টি বিদ্যালয়ে কর্মরত প্রায় দেড় হাজার শিক্ষকের চাকরি সরকারিকরণ কার্যক্রম আটকে যায়। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে পাঁচজন করে শিক্ষককে জাতীয়করণ করতে আগামী ২৮ আগস্ট সাত সদস্যের ট্রাস্কফোর্স কমিটির সভা ডাকা হয়েছে। সভায় বলা হয়, যেসব শিক্ষকের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও যোগ্যতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের আত্তীকরণের আওতায় আনা হবে। আত্তীকরণ হলে এসব শিক্ষক ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বেতনভাতার সুবিধা ভোগ করবেন। জাতীয়করণ হওয়া সব প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকেরা এ সময় থেকে বেতনভাতা সুবিধা পেয়ে আসছেন। 

বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বদরুল হাসান চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পাওয়ায় তৃতীয় ধাপে প্রায় সাড়ে ৫০০ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয়করণ করা হলেও ২৯১টি বিদ্যালয়ের প্রায় দেড় হাজার শিক্ষককে এ আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। চলতি মাসে এসব শিক্ষককে আত্তীকরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আগামী ২৮ আগস্ট মন্ত্রণালয়ে একটি সভা ডাকা হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব শিক্ষকের প্রয়োজনীয় সব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাবে সভায় তাদের আত্তীকরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, আর যেসব বিদ্যালয় ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ পাওয়া গেলে তা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের জাতীয়করণ স্থগিত থাকবে। তবে মন্ত্রণালয়ে আসা অভিযোগগুলো মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে যাচাই-বাছাই করা হবে। 

বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ আন্দোলনের নেতা মো: আমিনুল ইসলাম চৌধুরী গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই গত বছর ধরে জাতীয়করণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়নি। মিথ্যা মামলা ও স্বার্থান্বেষীদের অভিযোগ আমলে নেয়ার কারণেই এত বিলম্ব হচ্ছে জাতীয়করণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষকদের হয়রানি বন্ধের দাবি জানান। 

অপর দিকে সারা দেশের বাদ পড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের দাবিতে রাজপথে টানা প্রায় দেড় মাস জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অবস্থান ও আমরণ অনশনে দুই শতাধিক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সর্বশেষ ১০ জন শিক্ষক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এদের মধ্যে একজন শিক্ষকর মৃত্যু ঘটলেও নীতি-নির্ধারক বা মন্ত্রণালয় অথবা সরকারের উচ্চপর্যায়ের কারো কোনো অনুকম্পা বা আশ্বাস না পেয়ে সম্প্রতি বিফল বা ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেছেন। 

বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিরি সভাপতি মো: মামুনুর রশিদ খোকন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘টানা প্রায় দেড় মাস প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় ফুটপাথে বসে আন্দোলন করেছি। ডেঙ্গু ও কলেরায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ১৮ জন। আন্দোলনে আসা ফরিদপুর জেলার মধুখালী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন অসুস্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত মারা গেছেন। তবুও দাবি পূরণে কোনো দৃশ্যমান আশ্বাস পায়নি। দাবি আদায়ে সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য আশ্বাস না পেয়েই বাড়ি ফিরে গেছি। 
সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়া এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক রয়েছেন। তার মধ্যে এক হাজার ৩০০টির মতো প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের জন্য যাচাই-বাছাই করা হলেও তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের।


আরো সংবাদ