২৫ আগস্ট ২০১৯

ম্যাট প্রোগ্রামে স্বেচ্ছাচারিতা ও ভুতুড়ে বিলের গুরুতর অভিযোগ

ম্যাট প্রোগ্রামে স্বেচ্ছাচারিতা ও ভুতুড়ে বিলের গুরুতর অভিযোগ - ছবি : নয়া দিগন্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্স অব অ্যাকাউন্টিং ইন ট্যাক্সেস (ম্যাট) নামক একটি সান্ধ্যকালীন প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। এর পরিচালনায় স্বেচ্ছাচারিতা ও বিভিন্ন সময়ে করা ভুতুড়ে বিল নিয়ে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে প্রোগ্রামের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। বিশ^বিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের চলমান প্রোগ্রামগুলোতে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকলেও ব্যতিক্রমভাবে ২৩ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯১ টাকা ঘাটতিতে পড়েছে এ প্রোগ্রামটি। সম্প্রতি বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটির (এসি) সভায় এমন গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠে অধ্যাপক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। ভুতুড়ে বিল, স্বেচ্চাচারিতা, অমিতব্যয়িতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে বিভাগের টাকায় প্রোগ্রাম পরিচালনা করায় এ বিশাল অঙ্কের ঘাটতি গুণতে হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

জানা যায়Ñ একজন পরিচালক, সহকারী পরিচালক এবং বিভাগের চেয়ারম্যানকে পদাধিকারের ভিত্তিতে সদস্য মনোনীত করে তিন সদস্যদের কমিটির মাধ্যমে ম্যাট প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হয়। ২০১৭ সালে ম্যাট প্রোগ্রামের পরিচালক হিসেবে অনেক সিনিয়র শিক্ষককে ডিঙিয়ে অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। অভিযুক্ত এই সাবেক পরিচালক ড. মিজানুর রহমানের মেয়াদ শেষ হয় চলতি বছরের ৩০ জুনে। ১লা জুলাই থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নতুন পরিচালকের দায়িত্ব পান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। দায়িত্ব নিয়ে প্রোগ্রামের কাগজপত্রে বিভিন্ন অসঙ্গতি দেখে এক সপ্তাহের মাথায় পরিচালক পদ থেকে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে অব্যাহতি নেন অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। পরে নতুন করে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন প্রোগ্রামের বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহফুজুল হক। কমিটিতে অন্য দুই সদস্যের মধ্যে সহযোগী পরিচালক হিসেবে অধ্যাপক ড. মো: মহব্বত আলী এবং সদস্য হিসেবে বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রিয়াজুর রহমান চৌধুরী দায়িত্ব পালন করছেন।

বিভাগ সূত্র জানায়, সাধারণত দুই বছরের কমিটি ২৪ মাসে সর্বোচ্চ ২৪-১৬টি সভা করে। তবে পরিচালক থাকাকালে অধ্যাপক মিজানুর রহমান সভা করেছেন ৪০টি। এর মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো: আব্দুল হাকিমের সময়ে ২৫টি এবং বর্তমান চেয়ারম্যানের সময়ে করেছেন বাকি ১৫টি সভা। অভিযোগ রয়েছে- দায়িত্ব নেয়া প্রথম চার ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কোনো ব্যাচেরই রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যাননি। এমতাবস্থায় বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকদের প্রশ্ন তবে কিসের জন্য এত মিটিং (সভা)। 

অভিযোগ রয়েছে বিভাগের বাইরের শিক্ষকদের দ্বিগুণ টাকা দিয়ে ক্লাস নেয়াতেন অধ্যাপক মিজান। এক্সটারনাল সেই শিক্ষকদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে অনুষদের প্রথার বাইরে এ পেমেন্ট করা হতো। পরবর্তীতে সে শিক্ষকদের মাধ্যমে নিজেও অন্যত্র ক্লাস নেয়ার সুযোগ পেতেন। এটাও ছিল তার ব্যক্তিগত স্বার্থে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আয়োজন করা প্রোগ্রাম বিভাগের টাকায় পরিচালনা করতেন। এ ক্ষেত্রে বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটিতে কোনো আলোচনাও করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি তিনি। অভিযোগ আছে, বিভাগের সিনিয়র-জুনিয়র শিক্ষকদের সাথে সমন্বয় না করেই মাত্র দুই প্রোগ্রামে প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ করেছেন। সেখানেও কিছু ভুতুড়ে বিল দেখানোর অভিযোগ রয়েছে অধ্যাপক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। যদিও এর সাথে ম্যাট প্রোগ্রামের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকদের।

পরবর্তী আত্মোন্নয়নের স্বার্থেই বিভাগের টাকা গচ্চা দিয়ে এসব প্রোগ্রামের আয়োজন করেছেন তিনি। এর মধ্যে এক প্রোগ্রামে ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে তোরণ নির্মাণ, ৪৬ হাজার টাকার ক্রেস্ট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে ৭৫ হাজার, ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার খাবার এবং এসব বহনকারী কর্মচারীদের ২০ হাজার টাকা উপহার দেয়াসহ প্রায়া চার লাখ ৩২ হাজার টাকার খরচ করেন একটি অনুষ্ঠানে। তবে এসব প্রোগ্রামের কোনো অনুমোদন নেয়া হয়নি। এমনকি বিভাগের ৪৪জন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র চারজন। ছিলেন না কোনো সিনিয়র শিক্ষক। চেয়ারম্যান ছিল দেশের বাইরে।

অভিযোগ রয়েছেÑ কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ না করে অননুমোদিত অসংখ্য খাতে ব্যয় দেখিয়ে ‘ভুতুড়ে’ বিল দিয়েছেন প্রায় কয়েক লাখ টাকার। ফলে বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রিয়াজুর রহমান চৌধুরী বেশ কিছু বিলে স্বাক্ষর করেননি। এর আগে বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল হাকিম সম্পর্কে মিজানুর রহমানের ভায়রা হন। ফলে তার কাছে কোনো বিল গেলে কিছু না দেখেই তিনি তাকে স্বাক্ষর করতেন। পরে বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রিয়াজুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি যথারীতি বিলে স্বাক্ষর করলেও হঠাৎ কিছু দিন আগে তার কাছে কয়েকটি বিলের পরিমাণ অস্বাভাবিক মনে হলে তিনি তাতে স্বাক্ষর করেননি। এভাবে প্রায় দেড় মাসে অন্তত ১৮টি অননুমোদিত খাতে লক্ষাধিক টাকার বিলিং করেছেন প্রোগ্রাম পরিচালক মিজানুর রহমান। তবে সেসব বিলের প্রকৃত পরিমাণ জানা যায়নি।
তা ছাড়া প্রোগ্রাম পরিচালনায় ভুতুড়ে বিল নিয়ে বিভাগে তোলপাড় সৃষ্টি হলে অডিটর নিয়োগ করেন অধ্যাপক মিজান। তবে এ ব্যাপারে এসির কাউকে কিছু জানানো হয়নি। পরে এ নিয়ে আলোচনা হলে তিনি ইতোমধ্যে অডিট নিয়োগ দিয়েছেন বলে জানান। পরে সব শিক্ষক এর বিরোধিতা করেন। 

অভিযোগ আছে ম্যাট প্রোগ্রামের ডিরেক্টর হওয়ার আগে ৩ কোটি টাকার ইউজিসির একটি গবেষণা প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম করেছিলেন অধ্যাপক মিজানুর রহমান। অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সময়ও মিজানুর রহমানের প্রকাশনায় ঘাটতি ছিল। সিএনইডির সভায় বিভাগের এক শিক্ষক এ নিয়ে আপত্তি তোলেন। কিন্তু তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সাথে বিশেষ সম্পর্ক থাকায় আপত্তি সত্ত্বেও তাকে অধ্যাপক করা হয়। 

এ অনিয়মের বিষয়ে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন নয়া দিগন্তকে বলেন, এর আগে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে অধ্যাপক মিজানুর রহমানকে অব্যাহতি দেয়া হলে বিভাগকে এত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতো না।

ভুতুরে বিল ও ঘাটতির বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক মিজানুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আয়-ব্যয় সব ডকুমেন্টেড এবং অনুমোদিত। আয়ের বড় অংশ হলো শিক্ষার্থীদের ফি যা তারা সময়মতো দেয় না। আর খরচ আগে-পরে হয়। এটা সেমিস্টারের ঘাটতি যা সাময়িক।

বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রিয়াজুর রহমান চৌধুরী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় তো, সেজন্য এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাচ্ছি না।


আরো সংবাদ