১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আবারো প্রশ্নবিদ্ধ পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন

আবারো প্রশ্নবিদ্ধ পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন - ছবি : সংগৃহীত

এবার এইচএসসি পরীক্ষায় খাতা পুনঃমূল্যায়নের আবেদনের পর ফলাফলে ব্যাপক পরিবর্তনে আবারো প্রশ্নের মুখে পড়েছে পাবলিক পরীক্ষায় খাতা মূল্যায়ন ব্যবস্থা। পরীক্ষকরা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন, তেমনি প্রশ্নের মুখে পড়েছেন খাতা নিরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকরাও। একজন পরীক্ষক খাতা পরীক্ষার পর তা নিরীক্ষা করেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আরেকজন শিক্ষক। এরপর তা জমা দেয়া হয় প্রধান পরীক্ষকের কাছে। তারও এটি নিরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। এভাবে কয়েক স্তরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ফল তৈরি করা হয়। কিন্তু এসবই যে নামকাওয়াস্তে দায়সারাভাবে চলছে তা প্রকটভাবে ফুঠে উঠেছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ব্যাপক ফল পরিবর্তনে। 

এ বিষয়ে পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকদের সথে আলাপ করলে অনেক অপ্রীতিকর তথ্য জানিয়েছেন তারা। একজন প্রধান পরীক্ষক জানান, তার কাছে খাতা জমা দেয়ার পর তিনি ব্যাপকভাবে খাতা পরীক্ষা করেন। অনেক খাতা পুনরায় মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষকদের কাছে পাঠান তিনি। এতে তার ওপর ক্ষুব্ধ অনেক পরীক্ষকরা। পুনরায় খাতা মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষকদের কাছে পাঠালেও তারা তখনো সঠিকভাবে খাতা দেখেন না। অনেকে পুনরায় খাতা মূল্যায়নের জন্য নিতেই চান না। 

আবার অনেক পরীক্ষক জানিয়েছেন, খাতা মূল্যায়নের জন্য সময় এবং পারিশ্রমিক দুইÑ খুব সীমিত। যেখানে খাতা মূল্যায়নের পারিশ্রমিক বাড়ানো দরকার ছিল সেখানে বর্তমানে শতকরা ১০ ভাগ হারে পারিশ্রমিক কেটে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে গত বছর থেকে। এতে করে পরীক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ এবং হতাশা বিরাজ করছে। এ ছাড়া খাতা দেখার জন্য বরাদ্দকৃত সময়ও যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন অনেক পরীক্ষক। অনেক বিষয়ে রয়েছে তীব্র পরীক্ষক সঙ্কট। খুবই স্বল্প সময়ে অনেক বেশি খাতা দেখতে হয় তাদের। এতে করেও অনেকে খাতা দেখার প্রতি সুবিচার করতে পারেন না। এ ছাড়া এসএসসির ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে যাদের প্রধান পরীক্ষক করা হয় তাদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রধান পরীক্ষক নন। প্রধান পরীক্ষক হয়তো গণিতের শিক্ষক কিন্তু তার অধীনে যারা পরীক্ষক থাকেন তারা দেখা যায় ইংরেজির পরীক্ষক। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশা প্রকাশ করে পরীক্ষকেরা জানিয়েছেন, গণিতের শিক্ষক হয়ে তিনি কিভাবে ইংরেজির খাতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন? খাতা দেখা আর নিরীক্ষার ক্ষেত্রে বিরাজমান এ ধরনের অনেক ভুলের শিকার হচ্ছেন দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী। পরীক্ষক ও খাতা নিরীক্ষার সাথে জড়িতদের অবহেলা, অমনোযোগ, প্রধান পরীক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ভুল নিয়ম আর বিদ্যমান ব্যবস্থার নানা অনিয়মের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর জীবন তছনছ হয়ে যাচ্ছে। 

বর্তমানে খাতা পুনঃনিরীক্ষার আবেদনে পুরো খাতা মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই। শুধু নম্বর যোগে ভুল আছে কি না, খাতা থেকে নম্বর ঠিকমতো তোলা হয়েছে কি না, খাতায় সব উত্তরের পাশে নম্বর দেয়া আছে কি না এবং ওএমআর শিটে ঠিকমতো বৃত্ত ভরাট হয়েছে কি না এসব বিষয় দেখা হয়। আর এতে করেই প্রায় প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হচ্ছে। এটা পরীক্ষক ও খাতা নিরীক্ষার সাথে যারা জড়িত সম্পূর্ণরূপে তাদের অবহেলা আর অমনোযোগিতার ফল। কিন্তু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতে, যদি পুরো খাতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকত তাহলে ফলাফলে আরো ব্যাপক পরিবর্তন আসত। কিন্তু বর্তমান আইনে পুরো খাতা পুনরায় মূল্যায়নের সুযোগ নেই। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর মতে এটি থাকা উচিত। অনেকের আশঙ্কা, এতে করে নৈরাজ্য দেখা দিতে পারে ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে। লাখ লাখ শিক্ষার্থী আবেদন করবে প্রতি বছর। 

কিন্তু এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থী জানান, খাতা মূল্যায়নের পর যদি বড় ধরনের অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ধরা পড়ে তাহলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষক ও এর সাথে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা দরকার। তাহলে প্রতিটি পর্যায়ে তারা সতর্ক থাকতে বাধ্য হবেন। ভুলের পরিমাণ কমে আসবে। আর ভুলের পরিমাণ কমে এলে খাতা পুনঃমূল্যায়নের আবেদনও কমে আসবে পর্যায়ক্রমে। 

এর আগে ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় খাতা পুনঃমূল্যায়নের পর ব্যাপকভাবে ফল পরিবর্তন হয়েছিল। ২০১৫ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১০ শিক্ষা বোর্ডে ফল পরিবর্তন হয় ২ হাজার ৯১ শিক্ষার্থীর। এর মধ্যে নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪৪১ জন। ২০১৬ সালে ১০ বোর্ডে ফল পরিবর্তন হয় ৪ হাজার ১৫২ জনের। এর মধ্যে নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৮১১ জন। 
অপর দিকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় খাতা পুনঃমূল্যায়ন আবেদনের পর ৪ হাজার ৩১২ জন পরীক্ষার্থীর নম্বর গণনার ক্ষেত্রে ভুল ধরা পড়ে এবং তাদের ফল পরিবর্তন হয়। এর মধ্যে ৬৪৭ জন নতুন করে জিপিএ ৫ পায়। আর ৬১৯ জন শিক্ষার্থী ফেল করা থেকে পাস করে। 
প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, সর্বশেষ এইচএসসি পরীক্ষায় ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদনের পর ১০টি শিক্ষা বোর্ডে ২৬৬ জন শিক্ষার্থী নতুন করে জিপিএ ৫ পায়। ফল পরিবর্তন হয়েছে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর। 

বর্তমানে মাত্র দুই মাসের মাথায় এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এটি খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অবিচারের বড় একটি কারণ বলে জানিয়ছেন পরীক্ষকরা। খাতা গ্রহণের মাত্র ৯ দিনের মাথায় তাদের প্রথম কিস্তির খাতা জমা দিতে হয়। ২০০ থেকে ৫০০ খাতা দেখার জন্য মাত্র ১৫ থেকে ১৮ দিন সময় পান বলে জানান এইসএসএসির একজন প্রধান পরীক্ষক। খাতা মূল্যায়নের পর আরো অনেক কাজ করতে হয়। সময়ের অভাবে এসব কাজ অনেক সময় বাইরের লোক দিয়েও পরীক্ষকরা করান বলে জানিয়েছেন অনেকে। এ কারণে অনেক ভুলভ্রান্তি হয়। শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার করা হয়। তা ছাড়া মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমানে অষ্টম শ্রেণীতে আরেকটি পাবলিক পরীক্ষা যোগ হওয়ায় শিক্ষকদের ব্যস্ততা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। 

ঢাকা বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এইচএসসির একজন প্রধান পরীক্ষক বলেন, গত বছর থেকে তাদের খাতা দেখার বিল থেকে সরকার শতকরা ১০ টাকা করে কেটে রাখছে। এইচএসসি থেকে ডিগ্রি, অনার্স সব পর্যায়ে এ নিয়ম করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে এইচএসসিতে খাতা প্রতি ৩৫ টাকা, এসএসসিতে ২৫ টাকা ও জেএসসিতে ১৬ থেকে ২০ টাকা দেয়া হয় ১০০ নম্বরের একটি খাতা দেখার ক্ষেত্রে। শিক্ষকরা জানান, এটি খুবই অপ্রতুল বিশেষ করে জেএসসির ক্ষেত্রে। 
শিক্ষকরা জানান, তাড়াহুড়া করে ফল প্রকাশ প্রথা বাতিল করা দরকার। ফল প্রকাশের সময় আগের মতো অন্তত তিন মাস করা দরকার। পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের জন্য আরো সময় দেয়া দরকার। 

ঢাকা বোর্ডের এসএসসির একজন পরীক্ষক বলেন, তারা জানা মতে খাতা দেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হচ্ছে প্রধান পরীক্ষক অন্য বিষয়ের হলে। তিনি বলেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক হলেই তাকে প্রধান পরীক্ষক করা হয়। কিন্তু দেখা যায় প্রধান পরীক্ষক হয়তো বাংলা বা ইংরেজির শিক্ষক। আবার তার অধীনে পরীক্ষকরা থাকেন গণিতের। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তার পক্ষে কিভাবে অন্য বিষয়ের খাতা নিরীক্ষা করা সম্ভব? তিনি বলেন, প্রধান পরীক্ষকের শতকরা ১২ ভাগ খাতা নিজের দেখার কথা। 
গত কয়েক বছর শিক্ষার মানের ধস আর শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। কয়েক বছর আগে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ব্যাপকভিত্তিক পাসের পেছনে প্রশ্ন ফাঁস, পরীক্ষার হলে নৈরাজ্যসহ নানা বিষয় ছাড়াও একটি ছিল খাতা মূল্যায়নে নৈরাজ্য। খাতায় যাই লেখা থাক না কেন ওপর মহল থেকে হাত খুলে নম্বর দেয়ার নির্দেশের কথা তখন জানান অনেক পরীক্ষক। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার মানের সাথে জড়িত সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন। প্রকৃত মেধাবীদের বের করে আনা ও তাদের প্রতি সুবিচার করতে হলে সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে কারণে খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সব ধরনের অব্যবস্থাপনা, সমস্যা দূর করার দাবি জানিয়েছেন অনেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক।


আরো সংবাদ