২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯

লুটপাট অনিয়ম অব্যবস্থাপনায় অস্থির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

বুধবার (১৮-০৯-২০১৯) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সলর অধ্যাপক ড. মো: আখতারুজ্জামান ও অনুষদের ডিন শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামের পদত্যাগের দাবীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন - ছবি : নয়া দিগন্ত

পাঠ্যক্রম পরিচালিত দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব ক’টিতেই চলছে কোনো না কোনো অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়োগবাণিজ্য, অব্যবস্থাপনা এবং লুটপাটের মতো অস্থির ও উত্তাল সব ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দিতে ছাত্রলীগ নেতাদের ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই ভর্তি করানো নিয়ে চলছে বিতর্ক। এ নিয়ে গত কয়েকদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ব্যবসায় অনুষদের ডিনের পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন সংগঠনের যৌথ ঘেরাও কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে। সাধারণ ছাত্রসহ আন্দোলনকারী ছাত্র সংগঠনগুলো বৃহস্পতিবার ঢাবির ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার অবকাঠামো নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। শিক্ষকরা ভিসির নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।

সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহঃ) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সলরের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনজন শিক্ষক। তাদের অভিযোগ ভিসির আদেশে তাদের প্রত্যেকের বেতন থেকে ২১৭ টাকা করে কেটে নেয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে বহিষ্কার নিয়েও দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা ওই ছাত্রীকে অশোভন ভাষায় ভিসির গালিগালাজের একটি অডিও সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করছে। দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় অডিটোরিয়ামে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বসানো বাবদ এক কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা এর পুরো টাকাই লোপাট করে দিয়েছে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নানা-অনিয়ম, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে নানা স্তরে নিয়োগবাণিজ্য, ছাত্রলীগের অন্তর্দ্বন্দ্বসহ নানা ইস্যুতে অস্থিরতা চলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এর মধ্যে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির নানা অনিয়ম-স্বেচ্ছারিতা এবং আরবি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগবাণিজ্য নিয়ে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। অস্থিরতা চলছে কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও।

গত কয়েকদিন ধরে পরীক্ষা ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের অবৈধ ভর্তির সুযোগ নিয়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপর ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের একটি সন্ধ্যাকালীন স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান ৩৪ নেতাকর্মীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভর্তির সুযোগ দেয়া হয়েছিল। অবৈধভাবে ভর্তি হওয়া ছাত্রলীগ নেতাদের ছাত্রত্ব বাতিলের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ঘেরাও কর্মসূচিতে দুই সহকারী প্রক্টরের উপস্থিতিতেই হামলা চালায় ছাত্রলীগ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সলর অধ্যাপক ড. মো: আখতারুজ্জামান ও অনুষদের ডিন শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামের পদত্যাগ, সেই ৩৪ জনের ছাত্রত্ব বাতিলসহ তাদের মধ্যে ডাকসু ও হল সংসদে নির্বাচিত আট নেতার পদত্যাগ এবং রোকেয়া হলে নিয়োগবাণিজ্যের ঘটনায় জড়িত হল প্রাধ্যক্ষ জিনাত হুদা ও হল সংসদের ভিপি ইসরাত জাহান, জিএস সায়মা প্রমির পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে আন্দোলনকারীরা মানববন্ধন করেছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে বলেও ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংস করে অপরিকল্পিতভাবে হল ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে। এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বরাদ্দকৃত এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার মধ্য থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা কমিশন বা ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিজে জাবি ছাত্রলীগ নেতাদের দুই কোটি টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়েছেন।

এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভিসি প্রথমে বলেছিলেন, ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। টাকা নিয়ে আলোচনা হয়নি। তারপর হঠাৎ করেই তিনি সংবাদ সম্মেলন করে জানান, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তার কাছে চাঁদা দাবি করেছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেÑ ভিসি জাবি ছাত্রলীগকে এক কোটি ৬০ লাখ টাকা দিয়েছেন। অপরিকল্পিত নির্মাণ ও আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত-বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আবার এই আন্দোলনের বিরুদ্ধেও ভিসির অবস্থানকে সমর্থন করছেন কিছু সংখ্যক শিক্ষক ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একাংশ। এ নিয়ে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে দেশের একমাত্র আবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে সাক্ষাৎ করেন জাবির ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেননি তিনি। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল।

অপর দিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ-মিছিল করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তবে আন্দোলনের মুখে কোনোভাবেই পদ থেকে সরবেন না বলে জানিয়েছেন ভিসি।
মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আগামী ১ অক্টোবরের মধ্যে ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেন আন্দোলনকারীরা। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে তার পদত্যাগ নিশ্চিত করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। এ ছাড়া আসন্ন ভর্তি পরীক্ষায় সব ভবনে ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন তারা।

কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে আলোচিত হচ্ছেন, গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সলর অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিন। এবার আইন বিভাগের শিক্ষার্থী এবং একটি সংবাদমাধ্যমের বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ফাতেমা-তুজ-জিনিয়ার সাথে তার অশোভন ভাষায় কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে শোনা যায়, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান কাজ কী হওয়া উচিত’ শিরোনামে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে শিক্ষার্থী জিনিয়াকে বকাঝকা করছেন ভিসি নাসির উদ্দিন। ফাতেমার সাংবাদিকতা ও ফেসবুক স্ট্যাটাসের জের ধরে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে গতকাল তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ।

সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় শিক্ষা দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় শিক্ষকসমাজ ‘লজ্জিত’। তিনি বলেন, উন্নয়নের টাকা থেকে চাঁদাবাজির এমন ঘটনা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ঘটছে। অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, উন্নয়ন কাজের টাকায় ছাত্র রাজনীতিকরা ভাগ বসায়, এখান থেকে টাকা চায়, এটি অচিন্তনীয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি ও ভাগ-বাটোয়ারাতে শিক্ষকরাও জড়িত বলে অভিযোগ এনে ঢাবিতে দুই টার্ম ভিসির দায়িত্ব পালনকারী অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, এ ধরনের সব অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, শুধু কি শিক্ষার্থীদের দোষ? কারা তাদের ব্যবহার-অপব্যবহার করছে এটি দেখতে হবে। প্রশাসনে থেকে এক শ্রেণীর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যোগসাজশে অপকর্ম হচ্ছে। এগুলোরও তদন্ত হওয়া উচিত। সততার শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব যাদের সেই শিক্ষকরা ব্যর্থ হচ্ছেন বলেই ‘সন্তানতুল্য’ শিক্ষার্থীরা চাঁদাবাজি করছে বলে মত ব্যক্ত করেন অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, অভিভাবক হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে এই ব্যর্থতা আমাদের। আমরা নানাভাবে সমাজকে কলুষিত করে চলেছি। তার প্রভাব পড়ছে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের উপর।

আওয়ামী লীগপন্থী এই শিক্ষক ও সাবেক ভিসি, ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া ছাত্র ভর্তির ব্যাপারেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া ছাত্র ভর্তি হয়েছে, তারা ডাকসুতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। কেউ কেউ ডাকসুর সদস্য পদ পেয়েছে। এ ছাত্ররা কি নিজেরাই গিয়ে ভর্তি হয়েছে? তাদের পক্ষে কি ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া তা সম্ভব ছিল? নিশ্চয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের ভর্তির সুযোগ দেয়া হয়েছে।


আরো সংবাদ

নিরীক্ষা জটিলতায় বাতিল হচ্ছে রবির হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ খেলা চলাকালেই গ্যালারিতে ঘুম শাস্ত্রীর! নেটদুনিয়ায় তোলপাড় ঢাবির ক ইউনিটের ফলে ভুল : দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি সাদা দলের নিজেকে ‘স্যার’ বলতে বাধ্য করতেন ওমর ফারুক চৌধুরী হেরিটেজ হ্যান্ডলুম ফেস্টিভ্যাল শুরু কাল কেরানীগঞ্জে বিএনপির কমিটি গঠন নিখোঁজের ৮ দিন পর ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার নিরীক্ষা জটিলতায় বাতিল হচ্ছে রবির হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রাথমিক শিক্ষকদের কর্মস্থল ত্যাগ না করতে পরিপত্র মহাসমাবেশ ঘিরে টানটান উত্তেজনা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি সাদা দলের টঙ্গীতে বেগম জিয়ার কারা ও রোগমুক্তি কামনায় দোয়া

সকল