১৪ অক্টোবর ২০১৯

ফিটনেসবিহীন লঞ্চ নতুন রূপে

অসাধু মালিকদের টার্গেট ঈদ ; লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চ মেরামত ও রঙের হিড়িক
ঈদ সামনে রেখে বুড়িগঙ্গায় চলছে ফিটনেসবিহীন লঞ্চের জোড়াতালির কাজ : নয়া দিগন্ত -

ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষকে যাতায়াত করতে হয় লঞ্চে। ঈদের সময় ঘরে ফেরা যাত্রীর চাপ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। আর এ সুযোগ কাজে লাগায় কিছু অসাধু লঞ্চ ব্যবসায়ী। তারা ঝুঁকিপূর্ণ লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চ মেরামত ও রঙ লাগিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যান বিপদসঙ্কুল নৌপথে। ঈদকে সামনে রেখে এবারো লঞ্চ মালিকেরা নতুন-পুরনো সব ধরনের লঞ্চেই যাত্রী পরিবহনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন রুটে নামছে হাজারেরও বেশি ছোট-বড় লঞ্চ। এসব লঞ্চের বেশির ভাগই ফিটনেসবিহীন। কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন ডকইয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, পুরনো ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় এসব লঞ্চে এখন চলছে মেরামত ও রঙ করার তোড়জোড়। এছাড়াও ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর আশপাশের ডকইয়ার্ডগুলাতে আরো কয়েক শ’ চলাচলের অযোগ্য লঞ্চ ঈদে ঘরমুখো যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। বিধিনিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শতাধিক ছোট-বড় পুরনো লঞ্চ রঙ ও জোড়াতালি দিয়ে যাত্রী আনা-নেয়ার ব্যবস্থা চলছে।
জানা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর দক্ষিণপ্রান্ত দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের তেলঘাট থেকে মীরেরবাগ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি ডকইয়ার্ড রয়েছে। বেবি সাবের ডকইয়ার্ড, রহমানের ডকইয়ার্ড, সাত্তার খান ডকইয়ার্ডসহ অধিকাংশ এলাকা ঘুরে জানা গেছে, ঈদ সামনে রেখে অনেক মালিক দুই মাস আগে লঞ্চ ডকইয়ার্ডে ওঠানোর জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছেন। প্রতিটি ডকইয়ার্ডেই বিভিন্ন নৌযান তৈরি, সংস্কার ও রঙের কাজ চলছে। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন ও ভাঙাচোরা লঞ্চ জাহিদ-৩, জামাল-১, রাসেল-৪, প্রিন্স অব আওলাদ, সাব্বির-২, গাজী-৪, এমভি পূবালী, মর্নিংসান-৯, রাজদূত-৭, দুলার চর-১ নামেরসহ ১০-১২টি লঞ্চ মেরামতের কাজ চলছে।
চরকালিগঞ্জ তেলঘাট সংলগ্ন ডকইয়ার্ডে আছে এমভি জাহিদ-৩ নামক লঞ্চটি। এটি ঢাকা-রাঙ্গাবালি রুটে চলাচল করে। লঞ্চটির সাথে আরো রয়েছে জামাল-১, রাসেল-৪, প্রিন্স অব আওলাদ, সাব্বির-২ নামের ৪টি লঞ্চ। সবগুলো লঞ্চই ঈদ উপলক্ষে মেরামত, রঙ করানোর জন্য ডকইয়ার্ডে আনা হয়েছে। জাহিদ-৩ নামক লঞ্চটিতে ১০-১৫ জন শ্রমিক কাজ করতে দেখা যায়। ভেতরে কাজের তদারকি করছে লঞ্চটির মালিক আশ্রাফুল আলম জাহিদ মেলকার। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, লঞ্চটি ঢাকা-রাঙ্গাবালি রুটে চলাচল করে। এটি ১০ বছর আগে নির্মিত হয়েছে। অনেক স্থানেই ভেঙে গেছে, ঠিক না করা হলে পারমিট দেবে না তাই মেরামতের জন্য ডকইয়ার্ডে এনেছেন। লঞ্চটির ফিটনেস আছে কিনা জানতে চাইলে জাহিদ মেলকার বলেন, ফিটনেস না থাকলে পারমিশন দেয় না। আগের চেয়ে মোটা রড ও লোহা দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে। ঈদের সময় নির্ধারিত ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী তোলা হয় এবং বেশি ভাড়া নেয়া হয় কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাকা-রাঙ্গাবালি রুটে সরকার কর্তৃক ডেক যাত্রীদের নির্ধারিত ভাড়া চার শ’ পঁচিশ টাকা। সিঙ্গেল কেবিন এর চারগুণ এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ডেক যাত্রীদের আটগুণ। আমরা দুই ঈদ ব্যতীত অন্য সময় সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়া নেই। সাত্তার খান নামক ডকইয়ার্ডে মেরামতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকা-টরকীগামী লঞ্চ রাজধানী-১, ঢাকা-হুলারহাট-ভাণ্ডারিয়াগামী লঞ্চ মর্নিংসান-৯ ও রাজদূত-৭ লঞ্চটি। মেরামত কাজে নিয়োজিত একজন শ্রমিক জানালেন মর্নিংসান-৯ লঞ্চটির সামনের ফ্যান ফেটে গেছে, রাজদূত-৭ এবং রাজধানী-১ রঙ করানোর জন্য ডকইয়ার্ডে আনা হয়েছে। লঞ্চগুলোর ফিটনেস আছে কিনা তার জানা নেই।
অগ্রগতি ডকইয়ার্ড, ফারুক ডকইয়ার্ড, রহমান সাহেব ডকইয়ার্ড, বেবি সাহেব ডকইয়ার্ড, ইকবাল চেয়ারম্যান ডকইয়ার্ড, শাহালম ডকইয়ার্ড ঘুরে দেখা যায় সংস্কারের জন্য দাঁড়িয়ে আছে গাজী-৪, এমভি পূবালী, রাজদূত-৭, দুলার চর-১ নামেরসহ ৬টি লঞ্চ মেরামতের জন্য। এগুলো ঢাকার সদরঘাট থেকে কালাইয়, টর্কি, ভাণ্ডারিয়া, হুলারহাট, বালারবাজার, শরীয়তপুর, অপদাসহ বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। এলাকাবাসী বলছে প্রতি বছরই ঈদের আগে লঞ্চগুলো রঙ ও মেরামত করানোর জন্য ডকইয়ার্ডে আনা হয়। এগুলো ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চ। ফারান খান ডকইয়ার্ডে মেরামতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা ফারহান-৩ ঢাকা-বেতুয়া লঞ্চ-এর কেরানি রহিম মিয়া জানান, ফারহান-৩ এর তল প্লেট, ঝালাই, রঙ এবং অন্যান্য মেশিন চেক করার জন্য ডকে উঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের আগে যাত্রীদের আকর্ষণে লঞ্চটি সংস্কার ও রঙ করা হচ্ছে। ফারহান-৩ লঞ্চটি মেরামতের জন্য প্রত্যেক দিন ৫০-৫৫ জন কর্মচারী কাজ করছে। আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে সেটি নামানো হবে। ফিটনেস পরিদর্শনে বিআইডব্লিউটিএ’র পরিদর্শক এলে তারা কি করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু টাকা দিলে তারা চলে যায়। রহমানিয়া ডকইয়ার্ডে সংস্কারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকা-ফুলেরহাট-ভাণ্ডারিয়া রুটে মর্নিংসান-৯ শুকানি মোজ্জামেল হোসেন বলেন, সবাই চায় ঈদের সময় নতুনত্ব আনতে। সাত দিন আগে লঞ্চটি ডকইয়ার্ডে আনা হয়েছে। ভাঙাচোরা কাজের সংস্কার এবং রঙ লাগিয়ে আগামীকালই লঞ্চটি ছাড়া হবে।
কেরানীগঞ্জ ডকইয়ার্ড মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ ও ঢাকা শিপ বিল্ডার্স গ্রুপের সভাপতি মো: নাজমুল হক বলেন, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচলের সুযোগ নেই। আমাদের ডকইয়ার্ডে ঈদের আগে লঞ্চগুলো আনা হয় সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য। তা ছাড়া ফিটনেস আছে কিনা তা দেখার জন্য সরকারের সংস্থা রয়েছে। আমাদের শ্রমিকেরা কাজ করে, টাকা পায়। বিআইডব্লিউটিএ’র এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ৪৩টি নৌপথে শতাধিক লঞ্চ চলাচল করে। এগুলোর মধ্যে হাজার দশেক ভিআইপি, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কেবিন রয়েছে। এ লঞ্চগুলোতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন জেলার প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার লোক যাতায়াত করে। আর ঈদের সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার। এ সময় অতিরিক্ত যাত্রীর লোভে কিছু অসাধু লঞ্চ মালিক লক্কড়ঝক্কড়, চলাচলে অনুপযোগী লঞ্চ সংস্কার ও রঙ করে চাকচিক্য বাড়ান। অনেক সময় দেখা যায়, অনেকে কয়েক বছর ধরে বসা লঞ্চও নিয়ে আসেন।
এদিকে বাংলাদেশ নৌ দুর্ঘটনা প্রতিরোধ কমিটির মহাসচিব জি এম ছারোয়ার এ বিষয়ে বলেন, জাহাজের নকশা অনুমোদন, সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট প্রদান, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, যাত্রীবাহী নৌযানের চলাচলের অনুমতি প্রদান ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চে রঙ-কালি করে অবৈধ ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যায়। তিনি বলেন, একটি লঞ্চ সার্ভে করতে এক বছর সময় লাগে। সময় বাঁচানোর জন্য তড়িগড়ি করে লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চে মেরামত ও রঙ করে পুরনো সার্ভে দেখিয়ে ঈদের সময় লঞ্চ চালু করে। প্রতি বছর শিপিং কর্তৃপক্ষ লঞ্চের ফিটনেস পরীক্ষা করে সার্ভে সনদ দিলে এবং নৌ ট্রাফিক পুলিশ যাত্রী ধারণ ক্ষমতা নির্ধারণ করে দিলে নৌ দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
তবে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান মাহাবুব উল ইসলাম জানিয়েছেন, ঈদ এলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পুরনো ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চে মেরামত ও রঙ কালি করার কাজ করে বিভিন্ন রুটে চালায় এ রকম অভিযোগ আছে। তবে সার্ভে সনদ ছাড়া এবার কোনো লঞ্চকে ঘাটে ভিড়তে দেয়া হবে না। এ ছাড়া এবার প্রতিটি ঘাটে ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করা হবে। যে মাস্টাররা লঞ্চ চালাবেন, তাদের সার্টিফিকেটও চেক করে দেখা হবে। সবকিছু তদারকির জন্য সার্বক্ষণিক নৌ-পুলিশের পাশাপাশি কোস্ট গার্ড দায়িত্ব পালন করবে।

 


আরো সংবাদ