২৬ আগস্ট ২০১৯

বাংলাদেশে মোদির জয়ের প্রভাব নিয়ে বিপরীতমুখী মূল্যায়ন

ভারত আমাদের বন্ধু, অনিষ্ট করবে বলে মনে করি না : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ; নরেন্দ্র মোদির জয় বাংলাদেশের জন্য চিন্তার বিষয় হতে পারে : রওনক জাহান
-

ভারতের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি বিপুল বিজয় পাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়া হয় কি নাÑ তা নিয়ে বাংলাদেশের ‘চিন্তার কারণ’ আছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিবিসি।
ভারতে গত পাঁচ বছর ধরে ক্ষমতাসীন বিজেপি বলে আসছে যে দেশটিতে বহু অবৈধ অভিবাসী রয়েছেÑ যারা বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়েছে বলে দাবি করছেন বিজেপির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই।
এই কারণ দেখিয়ে আসাম রাজ্যের মতো নাগরিক যাচাইয়ের একটি উদ্যোগ বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গেও নিতে চায় বিজেপি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর হতে পারে। তবে এ বিষয়টিকে সরকার কিভাবে দেখছে, এমন এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, বাংলাদেশের জন্য অনিষ্টকর কোনো কিছু ভারত করবে বলে তিনি মনে করেন না।
নরেন্দ্র মোদি সরকারের সময় আসাম রাজ্যে যে বিতর্কিত নাগরিক তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে ৪০ লাখ মানুষ বাদ পড়েন এবং এদের বেশির ভাগই বাংলাভাষী মুসলমান।
আসামের মতো একটি নাগরিক তালিকা পশ্চিমবঙ্গেও করতে চায় বিজেপি।
ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ দেশটির পার্লামেন্টে এমন কথাও বলেছেন যে নাগরিক তালিকার বিরোধিতা করার অর্থ হচ্ছে অবৈধ বাংলাদেশীদের মদদ দেয়া।
বাংলাদেশকে ঘিরে থাকা ভারতের রাজ্যগুলোতে এবারের নির্বাচনে বেশ ভালো ফলাফল করেছে বিজেপি।
নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় থাকার সময় গত পাঁচ বছর বিজেপির মুসলিমবিরোধী মনোভাব ছিল প্রবল। সে ক্ষেত্রে তথাকথিত নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টিকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশী বিশ্লেষকেরা।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি নিয়ে কী ভাবছে?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বন্ধুত্ব থাকলে কখনো বন্ধু অপর বন্ধুর অনিষ্ট করে না। ভারত সরকার আমাদের বন্ধু। আমাদের কোনো অনিষ্ট করবে বলে মনে করি না।’
নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের কাজটিকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করেন জনাব মোমেন।
তার কথায়, বিষয়টি নিয়ে এখনো বাংলাদেশের চিন্তার কোনো কারণ নেই।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দেখা যাক কী ইস্যু হয়, আমরা হাওয়ার মধ্যে কোনো বক্তব্য দিতে চাই না। যদি কোনো সিরিয়াস ইস্যু হয়, তখন আমরা এ নিয়ে আলাপ করব।’
এবারের নির্বাচনের পর বাংলাদেশের চার পাশের রাজ্যগুলোতে বিজেপির নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পরিষ্কার উত্থান দেখছেন বাংলাদেশী বিশ্লেষকেরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামানের মতে ভারতে তথাকথিত নাগরিকত্ব বাছাইয়ের বিষয়টিকে শুধুই রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ এবং আসাম অঞ্চলে একটা বড় ধরনের ধাক্কা আসছে। এটা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর হতে পারে।’
দ্বিতীয় বারের মতো নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে বলে মনে করেন দেশটির রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান মনে করেন, ভারতের লোকসভা নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি যে ব্যাপক বিজয় পেয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, বহু বছর ধরে উপমহাদেশে ভারতের পরিচিতি ছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির’ একটি মডেল হিসেবে।
তবে তিনি মনে করেন, ভারতে ‘পরপর দুটো নির্বাচনে বিজেপির জয় বাংলাদেশের সেক্যুলার রাজনীতি যারা করতে চায়, তাদেরকে চিন্তায় ফেলবে।’
অধ্যাপক জাহানের মতে, বাংলাদেশ সরকার চাইবে ভারত সরকারের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার। কিন্তু ভবিষ্যতে সে সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, সেটি নির্ভর করছে বিজেপি সরকারের মনোভাবের ওপর।
‘ভারতে যদি সেক্যুলার রাজনীতি না চলে, এবং তারা যদি আমাদের চারিদিকে বিদ্বেষের রাজনীতি নির্বাচনে জেতার জন্য আরম্ভ করে দেন, তখন সরকারের পক্ষে সে জিনিসটা ম্যানেজ করা আরো অসুবিধা হবে’, বলছিলেন রওনক জাহান।
হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ভারতে যেভাবে দিনকে দিন শক্তিশালী হচ্ছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরে থাকবে বলে অনেকে মনে করেন। কারণ বাংলাদেশকে ঘিরে থাকা ভারতের রাজ্যগুলোতে এবারের নির্বাচনে বিজেপি বেশ ভালো ফলাফল করেছে।
ভারতে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান হলে, বাংলাদেশ সরকার চাইলেও কি ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব নাও হতে পারে?Ñ এমন এক প্রশ্নে তেমন আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেননি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান।
তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী। বাংলাদেশের সব সরকারই চাইবে যে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় থাকুক।
তবে বাংলাদেশের সরকারকে দেশের জনগণের মনোভাবের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ কোন কনসেশন বা ছাড় পাচ্ছে না বলে মনে করেন অধ্যাপক জাহান। এ ক্ষেত্রে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের অনাগ্রহকে একটি বড় উদাহরণ হিসেবে তিনি মনে করেন।
সাম্প্রতিক বছরে ভারতের আসাম রাজ্যে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে যে ৪০ লাখ মানুষ ‘অবৈধভাবে’ সেখানে বসবাস করছে, তাদের বেশির ভাগ মুসলমান।
বিভিন্ন সময় বিজেপির সিনিয়র নেতারা বলেছেন ‘অবৈধভাবে’ যারা আসামে বসবাস করছেন, তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
নির্বাচনের প্রচারণার সময় বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আসামের মতো ‘নাগরিকত্ব যাচাইয়ের’ কাজ পশ্চিমবঙ্গেও তারা করতে আগ্রহী।
এ প্রসঙ্গে রওনক জাহান বলেন, ‘তাদের নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য মুসলমানদের ওপরে কিংবা বাঙালিদের ওপরে তারা যে ধরনের স্লোগান ব্যবহার করছেন, এগুলো হলে আমাদের সাধারণ মানুষ তো খুব বিক্ষুব্ধ থাকবে। কিন্তু আমাদের সরকার তো কখনোই চাইবে না ভারতের সাথে সম্পর্ক বিরূপ হোক। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের সেন্টিমেন্টকে তো তাদের দেখতে হবে।’
এ বিষয়টি বাংলাদেশে সরকারের জন্য এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে বলে মনে করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
ভারতে বিজেপি যদি মুসলিমবিরোধী কথাবার্তা জোরালো করে, তাহলে সে বিষয়টি বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।


আরো সংবাদ