১৯ জুলাই ২০১৯

ইসলামী পর্যটনকে বিশ্বব্র্যান্ড করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা দ্য ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম-২০১৯-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন :পিআইডি -

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসলামী পর্যটনকে বিশ্ব বাণিজ্য ব্র্যান্ড হিসেবে বিকশিত করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামী পর্যটনকে ‘বিশ্ব বাণিজ্য ব্র্যান্ড’ হিসেবে গড়ে তুলতে সার্বিক প্রয়াস ও রোডম্যাপের প্রয়োজন অতিজরুরি। কারণ এর বাজার বার্ষিক ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বেড়ে ২০২১ সাল নাগাদ তা ২৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছবে। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা দ্য ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম-২০১৯ উদযাপন উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকালে এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি মুসলিম উম্মাহর একসাথে কাজ করা একান্তভাবে প্রয়োজন। যাতে আমরা সারা বিশ্বে সবার সাথে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একসাথে চলতে পারি। নিজেদের যেকোনো সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে পারি। যাতে করে অন্য কেউ মুসলমানদের ভাগ্য নিয়ে খেলতে না পারে। তিনি আন্তঃওআইসি পর্যটক প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংস্থাটির সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভিসা সহজীকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পর্যটনকেন্দ্রিক খাতগুলোর মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মুসলিম পর্যটক এবং পাশ্চাত্য দেশগুলোর জন্য বিশ্বের সববৃহৎ বালুময় সমুদ্রতট কক্সবাজারে পৃথক পর্যটন স্পট তৈরির প্রস্তাব করেন। তিনি বঙ্গপোসাগরের নিকটবর্তী দেশগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশের একটি নৌট্যুরিজম রুট তৈরির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো: মাহবুব আলী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আর এ এম ওবায়দুল মুকতাদির চৌধুরী, মন্ত্রণালয়টির সচিব এম মহিবুল হক এবং ওআইসির সহকারী মহাসচিব মুসা কুলাকলিকায়া অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানে ৪০০ বছরের প্রাচীন নগরী ঢাকার মুসলিম ঐতিহ্য ও নিদর্শন নিয়ে একটি অডিও ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়।
মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় দফতর ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাবেক মন্ত্রী ও উপদেষ্টাসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনা, কূটনৈতিক মিশনের সদস্যবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি ও অনুষ্ঠানে যোগদানকারী প্রায় ৩০টি দেশের পর্যটন মন্ত্রী ও তাদের প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি, ঢাকায় ওআইসির পর্যটন মন্ত্রীদের ১০ম সম্মেলনে গৃহীত ঢাকা ঘোষণায় ঢাকাকে ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম ২০১৯ হিসেবে নির্বাচন করা হয়। ৪ ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শীর্ষস্থান দখল করে ঢাকা। সম্মেলনে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আজারবাইজানের গাবালাকে ২০২০ সালের সিটি অব ট্যুরিজম হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ঢাকাকে সিটি অব টুরি্যজম ঘোষণাকে উদযাপনের জন্য গতকাল এবং আজ বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিদেশী পর্যটকদের জন্য ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুসলিম নিদর্শনগুলো পরিদর্শন, কনসার্ট এবং হাতিরঝিলে লেজার শো এবং আতশবাজি প্রদর্শন করা হবে। ওআইসির ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে মুসলিম ট্যুরিস্টের সংখ্যা ১৫৬ মিলিয়ন, যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়াবে ১৮০ মিলিয়ন। একই বছর সারা বিশ্বের জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ হবে মুসলিম।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে ‘ইসলামী অর্থনীতি’ সম্পর্কে বলেন, এটি বর্তমানে নবরূপে বিকাশ লাভ করছে। হালাল ফুডস, ইসলামী ফাইন্যান্স, হালাল ফার্মাসিউটিক্যালস এবং প্রসাধনী, হালাল পর্যটন ইত্যাদি হচ্ছে ইসলামিক অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান খাত। এ খাতগুলো বিকাশের জন্য ওআইসি সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব একান্ত প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা ওআইসি পর্যটন নগরী ২০১৯’র মহাউদযাপন আন্তঃওআইসি পর্যটক প্রবাহ বৃদ্ধি এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে, যা সংস্থাভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিনিয়োগের সুযোগ উন্মোচন ও টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনীয় বিষয়টি মক্কা মুকাররমায় গত ৩১ মে অনুষ্ঠিত ওআইসির ১৪তম সম্মেলনে গুরুত্বের সাথে স্বীকৃত হয়। মক্কা ঘোষণায় ওআইসি রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যৌথ ইসলামী কর্মপন্থা গ্রহণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি বলেন, এর আগে ২০১৮ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি, ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওআইসি সদস্যভুক্ত পর্যটন মন্ত্রীদের ১০ম সম্মেলনে গৃহীত ঢাকা ঘোষণায় আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময়, সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ইসলামী পর্যটন জনপ্রিয় করার গুরুত্ব স্বীকার করা হয়। একই সাথে পর্যটন খাতে দক্ষতা, উন্নয়ন ও সার্টিফিকেশনের জন্য একটি ইনস্টিটিউট স্থাপনের গুরুত্ব অনুধাবন করা হয়। তিনি বলেন, আমাদের স্বপ্ন পূরণে পর্যটন খাতের বিকাশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইসলামী পর্যটন আমাদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত যেখানে আমাদের সবার একত্রে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ পর্যটন স্পটের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখ- সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, প্রাচীন ও আধুনিক প্রতœতাত্ত্বিক ও ইসলামিক স্থাপনা ইত্যাদি বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ।
শেখ হাসিনা বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন শহর ঢাকা গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য সুপ্রসিদ্ধ। এখানে রয়েছে আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, কার্জন হল, ঢাকার অদূরের পানাম নগরসহ উল্লেখযোগ্য প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। তিনি বলেন, ঢাকা মসজিদের শহর হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের নকশা পবিত্র মক্কা নগরীর কাবা শরিফের আদলে তৈরি করা হয়েছে। শুধু মুসলিমদের জন্যই নয়, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য ঢাকায় রয়েছে বিখ্যাত আর্মেনিয়ান গির্জা, ঢাকেশ্বরী মন্দির, প্যাগোডা এবং রোজ গার্ডেনসহ সুন্দর সুন্দর স্থাপনা। তিনি বলেন, নগর হিসেবে ঢাকা শুধু পুরানো নয়, এই নগরকে ঘিরে শিল্পী বা সৃজনশীল মানুষের বিপুল সমাবেশ হয়েছিল। যেমন ঢাকার মসলিন, যা সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত ছিল। বর্তমানে ভৌগোলিক নির্দেশক অর্জন করায় ঢাকার জামদানি শাড়ি সারাবিশ্বে আমাদের পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার পাদপীঠ হিসেবে ঢাকার ভূমিকা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে মাসব্যাপী বইমেলা আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে। বাংলা বর্ষের প্রথম দিন ‘নববর্ষ’ জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির জাতীয় উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়। একই সাথে সুস্বাদু খাবার এবং আতিথেয়তার জন্যও ঢাকার সুনাম রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের শুরুতে ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার শহর ঢাকায় ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের আগমনের জন্য তাদের প্রতি শুভেচ্ছা জানান এবং ২০১৯ সালের জন্য ওআইসি সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর পর্যটন নগরী হিসেবে ঢাকাকে নির্বাচিত করায় কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ প্রকাশ করেন।
নেদারল্যান্ডস খুচরা লেনদেন ডিজিটাইজ করতে সহায়তা করবে : নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা বাংলাদেশে খুচরা লেনদেন ব্যবস্থা ডিজিটাইজ করার প্রস্তাব দিয়ে এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। রানী ম্যাক্সিমা গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে এ প্রস্তাব দেন। সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সংবাদমাধ্যমকে ব্রিফ করেন। রানী বলেন, তিনি বাংলাদেশে ১৫টি শিল্প, ই-কমার্স ও আই-পে পরিদর্শন করেছেন। তিনি এই খাতে অগ্রগতি ও মোবাইল ফোন ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার প্রশংসা করেন এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো: নজিবুর রহমান এবং ঢাকায় নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। 

 


আরো সংবাদ