২২ আগস্ট ২০১৯

৪ দিনে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১২ জন কাল ভর্তি হয়েছে ১৮৮০

-

ঈদের ছুটির মধ্যে ডেঙ্গুতে ১২ জন মারা গেছে। তবে এ ক্ষেত্রে মোট আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কম ছিল। ১৩ আগস্টে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা দেখলে মনে হতে পারে যে এডিস মশাবাহিত এ ভাইরাস জ্বরের আক্রমণ হ্রাস পাচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, শিগগিরই ডেঙ্গু জীবাণুবাহী এডিস মশা কমছে না। গতকাল বুধবারের চিত্রটা লক্ষ করলেই বিষয়টি বুঝা যাবে। কারণ মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এক হাজার ২০০ জন। গতকাল আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৮৮০ জন। এ সংখ্যাটা আজ বৃহস্পতিবার দুই হাজারের কোটা অতিক্রম করতে পারে।
মাঝে রোগীর সংখ্যা কম হওয়ার কারণ হিসেবে চিকিৎসকেরা বলেছেন, এটা হয়েছে ঈদের ছুটির কারণে। ঈদের ছুটির মধ্যে হয়তো হাসপাতালে আসতে চাননি রোগীরা। অথবা রোগীর স্বজনেরা একদিন পর ভর্তি করবেন এমন সিদ্ধান্তও নিয়ে থাকতে পারেন। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমে গেলে আজো (গতকাল বুধবার) আগের দিনের মতো প্রায় একই রকম সংখ্যায় হাসপাতালে ভর্তি হতো। কিন্তু সরকারি হিসাবেই মঙ্গলবারের চেয়ে আজ (বুধবার) বেশি ভর্তি হয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুসারে গত ১১ আগস্ট দুই হাজার ৩৩৪, ঈদের দিন ১২ আগস্ট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৯৩ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৪৬ হাজার ৩৫১ জন।
গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি হিসাবেই সারা দেশে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২৯। গতকাল এ সংখ্যা বেড়ে ৪০-এ দাঁড়িয়েছে। অবশ্য সরকারি হিসাবের সাথে বেসরকারি হিসাবের যথেষ্ঠ অমিল রয়েছে। বেসরকারি হিসাবে একশোর ঘরে পৌঁছে গেছে মৃত্যু। নিশ্চিত না হয়ে সরকারিভাবে মৃত্যু বলা হয় না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা।
গতকাল রাজধানীর চেয়ে রাজধানীর বাইরের অন্যান্য এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি ছিল। রাজধানীতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭৫৪ জন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৮২ এবং বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ছিল ২৭২। কেবল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার দুপুর ১২টার আগের ২৪ ঘণ্টায়) ১৪৭ জন। মিটফোর্ড হাসপাতালে ৮৩ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ২০, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৭৩, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩১, পুলিশ হাসপাতালে ১৫, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪৭, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৫২, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১১ জন, বিজিবি হাসপাতালে ৩ জন। ঢাকার বাইরে ঢাকা বিভাগে (ঢাকা ছাড়া) ২৭৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯৪, খুলনা বিভাগে ১৬৫, রাজশাহী বিভাগে ১৩২, রংপুর বিভাগে ১১৪, বরিশাল বিভাগে ১৫৬, সিলেট বিভাগে ২১ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৭০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
গত মঙ্গলবার থেকে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এভাবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে খোলা আকাশের নিচে পরিষ্কার পানিতে মশা জন্মানো কিছুটা কমে যাবে কিন্তু রাজধানীর নির্মাণাধীন ভবনগুলোর পরিষ্কার পানিতে মশা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এসব নির্মাণাধীন ভবনে সামনে ঈদের ছুটিতে শ্রমিকদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে চলে যাওয়ার কারণে আরো কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকবে। রাজধানীতে এ মুহূর্তে হাজারের বেশি নির্মাণাধীন ভবন রয়েছে। সিটি করপোরেশনের মশক নিধনে নিযুক্ত শ্রমিক এসব স্থানে ফগিং করতেও যান না। ফলে অবাধে মশা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাপকভিত্তিক প্রচারণার কারণে ঘরের ভেতর মশা খুব বেশি থাকছে না। ঈদের ছুটির মধ্যে যারা বাড়ি গেছেন তারা মশা জন্মাতে পারে এমন স্থানগুলো পরিষ্কার করে গেছেন। ফলে মশা উৎপাদনের জন্য নির্মাণাধীন ভবনই একমাত্র আশ্রয়স্থল হতে পারে।
এ দিকে আমাদের সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, ময়মনসিংহে একজন কলেজছাত্র, লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে একজন শিশু, চাপাইনবাবগঞ্জে এক তরুণ, খুলনায় ও রাজশাহীতে দুইজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।
কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আশিকুর রহমান পরশ নামে চার বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত সোমবার রাতে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পরশ উপজেলার চরজাঙ্গালীয়া এলাকার কামরুজ্জামান পাটওয়ারীর ছেলে। পরশের দাদা চরজাঙ্গালীয়া এসসি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লকিয়ত উল্যাহ পাটওয়ারী জানান, গত শনিবার পরশের জ্বর দেখা দেয়। দুই দিনেও জ্বর ভালো না হওয়ায় সোমবার বিকেলে লক্ষ্মীপুরে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হলে তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। নোয়াখালী নেয়ার পথে রাত ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আবদুল মালেক নামের এক ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে এই প্রথম কোনো ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হলো। আব্দুল মালেক চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বহরম হাউসনগর মহল্লার গোলাম নবীর ছেলে। তিনি ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা: সাইফুল ইসলাম ফেরদৌস জানান, ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন আবদুল মালেক। ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরে গত সোমবার ভোর ৫টার দিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ভর্তির পরপরই তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে তিনি মারা যান।
খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত আরো মো: রাসেল (৩২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (খুমেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার বিকেলে তিনি মারা যান। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার নারিকেলবাড়ী গ্রামের মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে রাসেল ঢাকার রমনা পার্কে ক্লিনারের কাজ করতেন। এ নিয়ে খুলনায় এ পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে একজন বৃদ্ধাসহ চারজন মারা গেছেন।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা: পার্থ প্রতিম দেবনাথ জানান, রাসেল ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে সম্প্রতি গোপালগঞ্জের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে গত ১১ আগস্ট তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১২ আগস্ট সোমবার বিকেলে তিনি মারা যান। এ দিকে খুলনার সিভিল সার্জন ডাক্তার এ এস এম আব্দুর রাজ্জাক জানান, খুলনায় গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে ৪৪৭ জন। এর মধ্যে ৩০৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৪২ জন। এ ১৪২ জনের মধ্যে নতুন রোগী ১৭ জন।
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফরহাদ হোসেন (২০) নামে এক কলেজছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। সে গত শনিবার রাত ১০টায় কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামের ফেরদৌস আলীর ছেলে ফরহাদ হোসেন ইটনা ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা: সুলতানা রাজিয়া জানান, ঢাকায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ৮ আগস্ট কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ফরহাদের অবস্থার অবনতি হলে শনিবার রাতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারি পরিচালক ডা: এ বি মো: শামসুজ্জামান জানান, ঈদ উপলক্ষে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে আসা ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৭ জন ভর্তি হয়েছেন। বুধবার সকাল নাগাদ চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ছিল ১৯৪ জন। গত তিন দিনে ১৩২ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। গত ২১ জুলাই থেকে বুধবার পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৭২ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬৭৮ জন।
আগৈলঝাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত আরো তিনজনসহ মোট ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। তাদের বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে হয়েছে। হাসপাতালে সদ্য যোগদানকারী স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আবদুল মুনায়েম সাদ জানান, এ পর্যন্ত ৩০ জন রোগীকে বিনামূল্যে এ হাসপাতালে পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে ছয় রোগীর শরীরে ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত হয়।
তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়) সংবাদদাতা জানান, তেঁতুলিয়ায় দু’জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। ঢাকা থেকে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে আসে তেঁতুলিয়া শালবাহান ইউনিয়নের কাজিগজ গ্রামের আবুল কাসেমের পরিবার। গতকাল বুধবার সকালে ছেলে নিঝুমের (১৯) ডেঙ্গু ধরা পড়লে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এ দিকে ঢাকা থেকে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে তেঁতুলিয়া তিরনইহাট ইউনিয়নের ইসলামবাগ গ্রামের মাহবুবুল হকের মেয়ে শোভা (২২) ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। তিনি ঢাকা জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, ঢাকায় ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুল মালেক (১৮) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সে সদর উপজেলার রানীহাটি ইউনিয়নের বহরম হাউসনগর গ্রামের গোলাম নবীর ছেলে। ঈদুল আজহার দিন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল সাড়ে ৯টায় সে মৃত্যুবরণ করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা: জাহিদ নজরুল চৌধুরী জানান ঢাকায় ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে আব্দুল মালেক বাড়ি এসে হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাড়িতেই অবস্থান করছিল। এ অবস্থায় তার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে গত ১১ আগস্ট রাতে প্রথমে তাকে সদর হাসপাতালে ভর্র্তি করে তার পরিবার। পরে অবস্থার ক্রমাবনতি হলে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঈদুল আজহার দিন সকাল সাড়ে ৯টায় সে মারা যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক এ জেড এম নুরুল হক জানান মঙ্গলবার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মৃত আব্দুল মালেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।


আরো সংবাদ