২২ আগস্ট ২০১৯

কাশ্মির ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বান পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসকে ‘কাশ্মির সংহতি দিবস’ পালন

-

ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা রদ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈঠকে বসার জন্য জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। গত মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদের বরাবর লেখা এক চিঠিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি এ আহ্বান জানিয়েছেন। তা ছাড়া পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসকে এবার ‘কাশ্মির সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করছে দেশটির সরকার। রয়টার্স ও ডন।
চিঠিতে কুরেশি বলেছেন, পাকিস্তান যুদ্ধের উসকানি দেবে না। কিন্তু ভারত যেন আমাদের সংযমকে দুর্বলতা না ভাবে। ভারত যদি ফের শক্তি প্রয়োগ করার পথে যায়, আত্মরক্ষার জন্য সর্বশক্তি নিয়ে পাকিস্তান জবাব দিতে বাধ্য হবে। এহেন ‘বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে’ পাকিস্তান ওই বৈঠকের অনুরোধ করছে। পাকিস্তানের অনুরোধে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ কিভাবে সাড়া দেবে এবং এ ক্ষেত্রে পরিষদের কোনো সদস্য দেশের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ দরকার হবে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা পরিষ্কার হয়নি। তাদের এ পদক্ষেপের প্রতি চীনের সমর্থন আছে বলে গত শনিবার জানিয়েছিল পাকিস্তান।
আগস্ট মাসের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে পোল্যান্ড। জাতিসঙ্ঘে এক সংবাদ সম্মেলনে পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াজেক চাপুতোভিজ পাকিস্তানের কাছ থেকে মঙ্গলবার পরিষদ একটি চিঠি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
এ দিকে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসকে এবার ‘কাশ্মির সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করেছে দেশটির সরকার। গতকাল বুধবার (১৪ আগস্ট) ইসলামাবাদের কনভেনশন সেন্টারে পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট ড. আরিফ আলভি বলেছেন, ‘আমরা বরাবরই কাশ্মিরিদের পাশে ছিলাম এবং থাকব।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাসী আজ দেখছে পাকিস্তান কেমন নিঃস্বার্থতার সাথে কাশ্মিরি ভাইদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা কোনোভাবেই কাশ্মিরিদের একা ছেড়ে যাবো না। তাদের দুঃখ যন্ত্রণা আমাদেরই দুঃখ-যন্ত্রণা।’ পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে অন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার আসাদ কায়সার, সিনেট চেয়ারম্যান সাদিক সানজরানি এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক প্রধান সহকারী ফেরদৌস আশিক আওয়ানসহ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কাশ্মিরের বন্দী নেতা মোহাম্মদ ইয়াসিন মালিকের স্ত্রী মাশাল মালিক তার বক্তৃতায় চলমান পরিস্থিতির জন্য ভীষণ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে তিনি কাশ্মিরি জনগণের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে স্বরচিত একটি কবিতাও আবৃতি করে শোনান। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গতকাল মুজাফফরাবাদ সফরে যান। যেখানে তিনি আজাদ কাশ্মিরের অ্যাসেম্বলিতে বক্তৃতা প্রদান করেন। এবারের স্বাধীনতা দিবসে পাকিস্তান সরকার একটি বিশেষ লোগো প্রকাশ করেছে। যেখানে লেখা আছে, ‘কাশ্মির বনেগা পাকিস্তান’ অর্থাৎ ‘কাশ্মির হবে পাকিস্তানের অংশ’। লোগোর অক্ষরগুলো ছিল লাল, যা ‘কাশ্মির সংহতি দিবস” বিষয়টির সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।
আজ ১৫ আগস্ট প্রতিবেশী ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এবারের কাশ্মির ইস্যুকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান দিবসটিকে একটি কালো দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছে। যদিও ভারত সরকার এরই মধ্যে বিষয়টির জন্য নিন্দা জানিয়েছে।
কাশ্মির ইস্যুতে সরকারের সময় নেয়া উচিত : ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট
জম্মু-কাশ্মির ইস্যু খুবই সংবেদনশীল একটি বিষয়, তাই বিষয়টি নিয়ে সরকারের সময় নেয়া উচিত বলে জানিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। কাশ্মিরের একটি আঞ্চলিক দলের করা পিটিশনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট গত মঙ্গলবার এমনটাই বলেছেন। সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, ‘আমরা স্বাভাবিক অবস্থা প্রত্যাশা করি। কিন্তু এক রাতের মধ্যে সব কাজ করা যাবে না। কেউ জানে না কী হবে। সরকারের ওপরও কাউকে না কাউকে নির্ভর করতে হবে। আর এটা (কাশ্মির) খুবই সংবেদনশীল একটি ইস্যু।’ ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও দুই ভাগ করে দেশটির সরকার যে বিল পাস করেছে তা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গত শনিবার পিটিশন দাখিল করে কাশ্মিরের আঞ্চলিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স। পিটিশন দাখিলের তিন দিন পর সুপ্রিম কোর্টে এ নিয়ে প্রথম শুনানি হলো। প্রথম শুনানির পর আদালত পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণে করেছেন দুই সপ্তাহ পর। গত ৫ আগস্টের পর যেসব আঞ্চলিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গত ১০ আগস্ট ন্যাশনাল কনফারেন্সের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশনটি দাখিল করেন দলটির সিনিয়র নেতা ওএমপি মোহাম্মদ আকবর লোন ও হাসনাইন মাহসুদ। পিটিশনে বলা হয়, ‘সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে কাশ্মির বিশেষ মর্যাদা রদের সরকারি সিদ্ধান্ত অবৈধ।’
পিটিশনে বলা হচ্ছে, ‘সংবিধানের ৩৭০ (১) (ঘ) অনুচ্ছেদে জম্মু-কাশ্মিরের সংবিধানকে পাইকারিভাবে পুনঃস্থাপিত করার কোনো ক্ষমতা দেয়া হয়নি।’ সুপ্রিম কোর্টকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

পিটিশন অনুযায়ী, রাজ্যের মানুষ এবং তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের (কাশ্মিরের বিধানসভা) সাথে আলোচনা ও কোনো ধরনের সম্মতি না নিয়েই জম্মু-কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা একতরফাভাবে রদ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং স্বাধীনতাকে সামান্যতম মূল্যায়ন করা হয়নি।
গত ৫ আগস্ট কাশ্মিরকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানকারী ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। শুধু বিশেষ মর্যাদা বাতিল নয়, কাশ্মিরকে জম্মু-কাশ্মির এবং লাদাখ নামে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে সেখানে নিজেদের আইন চালু করার ও স্থানীয় বাসিন্দা নন এমন নাগরিকদের সম্পত্তি কেনার সুযোগ করে দিয়েছে ভারত। ওই সিদ্ধান্ত নেয়ার দিন ৫ আগস্ট থেকে কাশ্মিরের টেলিফোন লাইন, ইন্টারনেট ও টেলিভিশন নেটওয়ার্ক বন্ধ করে রেখেছে দিল্লি এবং লোকজনের অবাধ চলাচল ও জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে।
হিমালয় পর্বত অঞ্চলে অবস্থিত কাশ্মিরের বিভিন্ন অংশ ভারত, পাকিস্তান ও চীনের নিয়ন্ত্রণে আছে। সবচেয়ে জনবহুল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মির ভ্যালি ও হিন্দু প্রভাবাধীন জম্মু নগরী ও এর আশপাশের অঞ্চল ভারতের শাসনাধীন, আজাদ কাশ্মির বলে কথিত পশ্চিম দিকের বিশাল একটি অঞ্চল পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে আছে আর উত্তর দিকের পর্বতময় একটি এলাকা আকসাই চীন চীনের নিয়ন্ত্রণে আছে। কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ১৯৪৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান অন্তত তিনবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।  

 


আরো সংবাদ