২২ আগস্ট ২০১৯

ত্যাগের মহিমায় পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

-

ধর্মীয় ভাবগম্ভীর্য, যথাযোগ্য মর্যাদা আর আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদ। ঈদের নামাজ আর সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানির মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পালন করেছেন তাদের দ্বিতীয় প্রধান এ ধর্মীয় উৎসব।
কোরবানির ঈদের সাথে জড়িত রয়েছে হজরত ইবরাহিম (আ:) ও হজরত ইসমাইলের (আ:) অতুলনীয় ত্যাগের স্মৃতি। পিতা-পুত্রের সেই ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু কোরবানির মাধ্যমে পালন করা হয় এ উৎসব। বাংলাদেশসহ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও শন্তি কামনা করে বিশেষ মুনাজাত করা হয় সারা দেশের ঈদের জামাতে।
ঈদুল ফিতরের মতো ঈদুল আজহারও অন্যতম আকর্ষণ ঈদগাহ ময়দানে সমবেত হয়ে জামাতের সাথে ঈদের নামাজ আদায় করা। নামাজ শেষে দেশ ও জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মুনাজাত করা হয়। এরপর লোকজন কোলাকুলির মাধ্যমে পরস্পর শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। ঈদের নামাজের পরপরই শুরু হয় পশু কোরবানির পর্ব। কোরবানিকৃত পশুর তিন ভাগের এক ভাগ নিজেরা রেখে বাকি দুই ভাগ নিকট আত্মীয়স্বজন ও গরিব প্রতিবেশী, দুস্থদের মাঝে বিতরণ করা এ উৎবের অন্যতম একটি রেওয়াজ। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে রাজধানী থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ যার যার গ্রামের বাড়িতে গেছেন।
ঈদুল আজহার প্রধান জামাত সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হয় সুপ্রিম কোর্টসংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ সাধারণ মানুষের সাথে এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তিনি সর্বস্তরের মানুষের সাথে কোলাকুলির মাধ্যমে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। প্রধান ঈদ জামাতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিক, উচ্চপদস্থ সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাসহ সর্বস্তরের লোকজন অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় ঈদগাহে সুষ্ঠুভাবে ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
রাজধানীতে ঈদের দ্বিতীয় বৃহত্তর ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। এখানে প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৭টায়। এরপর প্রতি বছরের মতো এক ঘণ্টা পরপর আরো চারটি জামাত অনুষ্ঠিত হয় এ মসজিদে। দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মোট ৫৮২টি ঈদ জামাতের আয়োজন করা হয় রাজধানীতে।
ঈদের নামাজ শেষে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজনের সাথে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। এ ছাড়া ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনে আলোকসজ্জা করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়ক ঈদ মোবারক ও কালেমা খচিত পতাকা দিয়ে সাজানো হয়। কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের সব কারাগার, সরকারি হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, দুস্থ নিবাস, সরকারি শিশু সদন, মাতৃ সদন, ভবঘুরে কল্যাণকেন্দ্র, ছোটমনি নিবাসে বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হয়। টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচার করা হয় বিশেষ অনুষ্ঠান। বিভিন্ন সংবদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয় ঈদুল আজহার তাৎপর্য তুলে ধরে।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহীতে সকাল ৮টায় প্রধান ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় হজরত শাহ্ মখদুম রহ: কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে। জামাতে ইমামতি করেন মহানগরীর জামিয়া ইসলামীয়া শাহ্ মখদুম রহ: মাদরাসার অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ শাহাদাত আলী। সহকারী ইমাম ছিলেন হেতেমখাঁ বড় মসজিদের ইমাম মুফতি মাওলানা ইয়াকুব আলী। বয়ান করেন জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা নাজমুল হক। তাকে সহায়তা করেন মুফতি কারি রেজাউল করিম।
একই সময়ে ঈদের দ্বিতীয় প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় মহানগর ঈদগাহ (টিকাপাড়া) ময়দানে। তৃতীয় জামাত হয় সকাল ৮টায় মহানগরীর সাহেব বাজার বড় রাস্তায়।
শাহ্ মখদুম রহ: কেন্দ্রীয় ঈদগাহে রাজশাহী সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, রাজশাহী সদর আসনের এমপি ফজলে হোসেন বাদশা, রাজশাহী-৪ আসনের এমপি ডা: মনসুর রহমান, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার নূর-উর-রহমান, জেলা প্রশাসক মো: হামিদুল হক, বিভিন্ন সরকারি দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক অন্যান্য নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায় করেন।
পরে কেন্দ্রীয় ঈদগাহে সবাই একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা ও কুশলাদি বিনিময় করেন। এ ছাড়া একই সময় রাজশাহী মহানগরীর ১১৮টি ঈদগাহসহ জেলার ৯টি উপজেলার শতাধিক ঈদগাহে ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
খুলনা ব্যুরো জানায়, সকালে ভারী বর্ষণ হওয়ায় খুলনা মহানগরীতে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় টাউন জামে মসজিদে সকাল ৮টায়। জামাতে ইমামতি করেন খুলনা টাউন জামে মসজিদের ভারপ্রাপ্ত খতিব মাওলানা আবু দাউদ। জামাতে খুলনার বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া কোর্ট জামে মসজিদে সকাল সাড়ে ৮টায় একটি জামাত হয়। নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ মুনাজাত করা হয়।
নগরীতে ঈদের দ্বিতীয় ও শেষ জামাত অনুষ্ঠিত হয় খুলনা টাউন জামে মসজিদে সকাল ৯টায়। নিউমার্কেটসংলগ্ন বায়তুন-নূর জামে মসজিদ, ডাকবাংলা জামে মসজিদ ও ময়লাপোতা বায়তুল আমান জামে মসজিদে ঈদের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
এ ছাড়া নগরীর খুলনা ইসলামাবাদ ঈদগাহ ময়দান, খালিশপুর ঈদগাহ ময়দান, আলিয়া কামিল মাদরাসা, কাস্টমস ঘাট জামে মসজিদ, পিটিআই জামে মসজিদ, কেডিএ নিরালা জামে মসজিদ, সিদ্দিকীয়া মাদরাসা, তালিমুল মিল্লাত মাদরাসা, দারুল উলুম মাদরাসা, আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মসজিদ, শিপইয়ার্ড, লবণচরা, চাঁনমারী, রূপসা, টুটপাড়া, মিয়াপাড়া, শেখপাড়া, বসুপাড়া, করবস্থান জামে মসজিদ, জোড়াগেট সিঅ্যান্ডবি কলোনি মসজিদ, বয়রা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন, খালিশপুর ক্রিসেন্ট জুট মিলস, বিএল কলেজ, দেয়ানা ঈদগাহ, সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকা, খানজাহান নগর খালাসী মাদ্রাসা ঈদগাহ এবং দৌলতপুর ঈদগাহ ময়দানসহ নগরীর বিভিন্ন মসজিদ ও ময়দানে ঈদের জামাত অনুুষ্ঠিত হয়।
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ময়মনসিংহ শহরের আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠে সকাল ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন আঞ্জুমান ঈদগাহ মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মামুন। এখানে সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, বিভাগীয় কমিশনার খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান, সিটি মেয়র ইকরামুল হক টিটু, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এহতেশামুল আলমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং শহরের ধর্মপ্রাণ লাখো মুসলমান ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে দেশ ও জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধ কামনা করে বিশেষ মুনাজাত করা হয়।
রংপুর অফিস জানায়, রংপুর মহানগরীতে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল সাড়ে ৮টায় কালেক্টরেট ঈদগাহে। এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, বিভাগীয় কমিশনার তরিকুল ইসলাম, ডিসি আসিব আহসানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। নামাজ শেষে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রূহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া করা হয়।
অন্য দিকে গঙ্গাচড়া ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। এ অঞ্চলে সবচেয়ে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল সাড়ে ৯টায় গঙ্গাচড়ার তালুক হাবু ঈদগাহ মাঠে। এখানে লক্ষাধিক মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করেন। এ ছাড়াও সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ১০ টার মধ্যে রংপুর মহানগরীসহ জেলার আট উপজেলায় প্রায় ২ হাজার ৭০০ ঈদগাহ মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর মহানগর সভাপতি সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা নয়া দিগন্তকে জানান, আগের প্রতিটি কোরবানির ঈদ আমি সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের পাশে থেকে উদযাপন করেছি। কিন্তু তিনি আজ নেই। আল্লাহ যেন ওনাকে বেহেশত নসিব করেন।
রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা জানান, রাঙ্গামাটি পৌর শহরে ঈদের ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঈদগাহ মাঠে জামাত হওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে বেশ কিছু জামাত মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়।
ঈদুল আজহার প্রধান জামাত হয়েছে শহরের তবলছড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশীদ ও পুলিশ সুপার মো: আলমগীর কবীরসহ মুসল্লিরা এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। এখানে সকাল ৮টায় ও ৯টায় দু’টি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়াও রিজার্ভ বাজার জামে মসজিদে সকাল সাড়ে ৮টায়, বনরূপা আদালত মসজিদ সকাল ৮টায় ও সকাল ৯টায় ২টি, ভেদভেদী আমানতবাগ মাঠে সকাল ৮টায় ও সকাল ৯টায় ২টি এবং পুরানপাড়া সরকারি প্রাথমিক স্কুল মাঠে সকাল ৯টায় ১টি ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
রাজবাড়ী সংবাদদাতা জানান, রাজবাড়ীতে সকাল ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত হয়েছে জেলা শহরের রেলওয়ে ময়দানে। নামাজে ইমামতি করেন মাওলানা মোস্তফা সিরাজুল কবির। জামাতে জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম, পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিকগণ ও রাজবাড়ী পৌরসভার মেয়র মহম্মদ আলী চৌধুরীসহ জেলার প্রায় দশ হাজার মুসুল্লি অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া রাজবাড়ী পুলিশ লাইন মাঠে, সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে, আঞ্জুমান ই কাদরীয়া মসজিদ, নিউ কলোনি মসজিদ মাঠ, দুধ বাজার মসজিদ ও ৪টি উপজেলা সদরের বড় বড় মাঠে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।


আরো সংবাদ