২২ আগস্ট ২০১৯

চামড়ার নিম্ন দামে রেকর্ড

মূল্য না পেয়ে নদীতে ডাস্টবিনে গর্তে নিক্ষেপ ; কারসাজিকে দায়ী করলেন বাণিজ্যমন্ত্রী ;এতিম হতদরিদ্রদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ; ট্যানারি মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আড়তদারদের
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ৫ কিলোমিটারজুড়ে রাস্তার দুই পাশে ফেলে দেয়া হয়েছে শত শত পশুর চামড়া (বাঁয়ে); চট্টগ্রামে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চামড়া সড়কে রেখে যান মওসুমি ব্যবসায়ীরা। পরে সেই পচা চামড়া সরিয়ে নিচ্ছে সিটি করপোরেশনের গাড়ি হ নয়া দিগন্ত -

নামমাত্র মূল্যে কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে বাংলাদেশে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকায় গরুর চামড়ার দরে হতবাক হয়েছে পশু কোরবানিদাতা ও দেশের সাধারণ মানুষ। আর প্রকৃতমূল্য না পাওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের এতিম, দুস্থ মানুষ ও লাখ লাখ দরিদ্র শিক্ষার্থী। সরকার নির্ধারিত মূল্যকে তোয়াক্কা না করে মওসুমি ব্যবসায়ীরা নামমাত্র দামে পশু কোরবানিকারীদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কিনেছে। এ দিকে চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের কারসাজি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আর বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদরাসার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বিভিন্ন খাতের মতো এখানেও লুটপাট করে খাওয়ার জন্যই কাঁচা চামড়ার মূল্য নিয়ে খেলছে। সরকার যখন রফতানির ঘোষণা দিয়েছে ঠিক তখনই সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। দর না পেয়ে বিভিন্ন মাদরাসার হাজার হাজার কাঁচা চামড়া পানিতে, ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। অনেকে দাম না পেয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলেছে বলেও জানা গেছে। মাঠ পর্যায়ের আড়তদারেরা বলছে, ঢাকার ট্যানারি ব্যবসায়ীদের কারণেই কাঁচা চামড়ার বাজারের এই দশা। আন্তর্জাতিক চামড়া বাজারের কোনো সমস্যা এটি নয়।
ঈদের দিন সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ঢাকাসহ সারা দেশে এবার সরকার নির্ধারিত মূল্যে পশুর চামড়া কোনো মওসুমি ব্যবসায়ীরা কিনেনি। তারা নামমাত্র মূল্য ধরিয়ে দিয়েছে পশু কোরবানিকারীদের। আর এই দর নিয়ে অনেক জায়গাতেই কথা কাটাকাটি হয়েছে। দাম কম থাকায় বিভিন্ন দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ দানকৃত চামড়া নিতেও চায়নি। তাদের বক্তব্যÑ এই চামড়া নিয়ে ট্যানারিতে দিয়ে আসতে যে গাড়ি ভাড়া ও লোকের পারিশ্রমিক লাগবে তা নিজেদের তহবিল থেকে বহন করতে হবে। ঢাকার মিরপুরে ৫৭ হাজার টাকার একটি গরুর চামড়া ৪০০ টাকায়, ৭০ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়া ৩০০ টাকায়; ধানমন্ডিতে একজন ব্যবসায়ী তার পাঁচটি গরুর চামড়া বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ১১ শ’ টাকা। উত্তরার একজন সাবেক ব্যাংকার জানান, তার কোরবানির ৮৫ হাজার টাকা মূল্যের পশুর চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে ২০০ টাকায়। সিরাজগঞ্জের একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, ৬০ হাজার টাকা মূল্যের গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকায়। আর নাটোরের একজন সংবাদকর্মী জানান, তার ৮৫ হাজার টাকা মূল্যের গরুর চামড়া বিক্রি করে পেয়েছেন ৫৫০ টাকা।
রাস্তার পাশে ফেলে দেয়া চামড়ার স্তূপ
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি কামাল উদ্দিন সবুজ জানান, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছে কোরবানির পশুর শত শত চামড়া। দাম না পাওয়ায় কেউ ক্ষোভ, অভিমানে কোরবানির পশুর চামড়া রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ১০ কিলোমিটার সীমানার মধ্যে প্রায় পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে রাস্তার দুই পাশে ময়লা-আবর্জনার সাথে ফেলে দেয়া হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। এ পথ দিয়ে যাতায়াতকারী বিভিন্ন পরিবহন যাত্রীরা মন্তব্য করেছেন, পানির দরে পশুর চামড়া বিক্রি করার চেয়ে রাস্তার পাশে ময়লা-আবর্জনার মধ্যে ফেলে দেয়া অনেক ভালো।
লিংক রোডের জালকুড়ি এলাকার বাসিন্দা মাসুম আহমেদ জানান, ১ লাখ ১০ হাজার টাকার গরু কোরবানি দিলাম, আর চামড়ার দাম ৩০০ টাকা বলে। তার চেয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়া অনেক ভালো। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এতিমের হক যারা এভাবে নষ্ট করেছে তাদের কী বিচার হবে আল্লাহ ভালো জানেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, লিংক রোডের স্টেডিয়াম, জালকুড়ি, দেলপাড়া, কড়ইতলা, কাজীবাড়ি, ভূইগড়সহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার দুই পাশে পড়ে আছে পশুর চামড়া। বিশেষ করে ময়লা-আবর্জনার স্থলে পড়ে আছে চামড়ার স্তূপ। এসবে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দেলপাড়ার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, মানুষ কষ্টে-দুঃখে পশুর চামড়া রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে আরো জানা যায়, ঈদে কোরবানি হওয়া পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য পায়নি মওসুমি ব্যবসায়ীরা। যার ফলে অনেকেই চামড়া কেনেননি। যারা আবার চামড়া কিনেছেন তারাও বিক্রি করতে পারেননি। তিন হাজার টাকা দামের চামড়ার দাম চাওয়া হচ্ছিল ৩০০-৪০০ টাকা, যা পানির দামের থেকেও কম বলে মন্তব্য করেন অনেকে। যার ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে চামড়া বিক্রি না করে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে যান তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত মঙ্গলবার সকালে কেউ ট্রাকে, আবার কেউ ভ্যানে চামড়া ফেলে যায়। চামড়াগুলো পচে এখন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। যার ফলে বিড়ম্বনা ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের যাত্রীরা। স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম ফজলুল হক বলেন, কী বিশ্রী গন্ধ ছড়াচ্ছে চামড়াগুলো থেকে। কারা যেন ফেলে গেছে, কিন্তু এগুলো সরিয়ে নেয়ার জন্যও কাউকে দেখছি না। ঈদের আগে মরা গরু ফেলে রাখায় ভোগান্তি সইছি, এখন পচা চামড়ার গন্ধ।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা বারিক জানান, আমার কাছে আরো কয়েকজন অভিযোগ করেছে, আমি সংবাদটি পেয়েছি। এটা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মধ্যে। তবুও আমি যাব আমার কিছু কাজ আছে শেষ করেই।
চট্টগ্রামে সোয়া ৬ কোটি টাকা মূল্যের চামড়া ক্রেতার অভাবে নষ্ট
চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান নূরুল মোস্তফা কাজী জানান, তিন বছর আগেও ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটা কোরবানির গরুর চামড়া বিক্রি হতো দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। যার পুরোটাই নিজেদের হক হিসেবে পেতেন সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। কিন্তু গত দুই বছর ধরে সরকারিভাবেই চামড়ার মূল্য কম নির্ধারণ হওয়ায় অনেকটা পানির দামেই বিক্রি হচ্ছিল কোরবানির পশুর চামড়া। ফলে হক বঞ্চিত হচ্ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠী। কিন্তু এ বছরের চিত্র স্মরণাতীত কালের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক। ভয়াবহ বিপর্যয় নামে চামড়ার দামে। পাশাপাশি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সরকার নির্ধারিত মূল্যে ক্রেতার দেখা মিলেনি। শুধু চট্টগ্রাম নগরীতেই প্রায় সোয়া লাখ পিস কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে চোখের পানি মুছতে মুছতেই রাস্তায় ফেলে চলে যান মওসুমি ব্যবসায়ীরা। এর বাইরে গ্রামগঞ্জে অনেককেই বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিতে বা মাটিতে পুঁতে ফেলতে দেখা গেছে। আর্থিক বিবেচনায় প্রতিটির মূল্য ৫০০ টাকা করে ধরলেও চট্টগ্রামে প্রায় সোয়া ছয় কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়েছে, যার রফতানিমূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় কাঁচা চামড়ার আড়ত হামজারবাগ-আতুরার ডিপো এলাকায়। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এখানে ট্রাকে ট্রাকে কাঁচা চামড়া নিয়ে আসেন মওসুমি বেপারি আর বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানার লোকজন। কিন্তু এবার চামড়ার দামে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি মো: আবদুল কাদের নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের আড়তদারেরা ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে গত বছরের যে টাকা পাবে তার সিকি ভাগও দেয়নি। গত বছরের ৩০ কোটি টাকা বকেয়া আছে জানিয়ে তিনি বলেন, একমাত্র ট্যানারি মালিকদের কারণে ৮০ শতাংশ খরিদদার চামড়া কিনতে পারেননি। তিনি জানান, টাকার অভাবে কাঁচা চামড়ার আড়তদারেরা পর্যাপ্ত লবণ ও শ্রমিক জোগাড় করতে পারেননি। দাম কম থাকায় ধারদেনা করে সমিতির সদস্যভুক্ত ১১২ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ৩০ জন আড়তদার এবং সমিতির বাইরের ১৫০ জনের মধ্যে মাত্র ৫০-৬০ জন আড়তদার সীমিত সংখ্যক চামড়া সংগ্রহ করে তারা বাজার থেকে সরে পড়েন। তিনি জানান, কাঁচা চামড়া রফতানির সরকারি সিদ্ধান্ত দেরিতে এসেছে। এক সপ্তাহ আগে এই সিদ্ধান্ত দিলে আড়তদারেরা সুদে টাকা সংগ্রহ করে হলেও দেশের মূল্যবান এই সম্পদ রক্ষা করতেন বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, যেসব আড়তদার ধারদেনা করে কিছু টাকা জোগাড় করেছিলেন তারা প্রথমে ৩০০ টাকায় বড় চামড়া কিনছিলেন। পরে তা ২০০-১০০ টাকায় নেমে আসে। একপর্যায়ে বাজার থেকে ক্রেতা উধাও হয়ে যায়। ফলে চামড়া নিয়ে যেসব ট্রাক এসেছিল তাদের অনেকে চামড়া বিক্রির টাকায় ট্রাকের ভাড়াও তুলতে পারেননি। এমনি পরিস্থিতিতে অবিক্রীত চামড়ার ট্রাকের সারি বাড়তে থাকে। বিক্রি করতে না পেরে অনেকটা বাধ্য হয়ে ট্রাকভর্তি চামড়া রাস্তার ওপর স্তূপ করে ফেলেই পালিয়ে যান মওসুমি ব্যবসায়ীরা। যা নজিরবিহীন ঘটনা সাধারণ্যের কাছে যেমনি, তেমনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছেও। রাস্তার ওপর ফেলে যাওয়া প্রায় সোয়া লাখ পিস চামড়া অপসারণের দায়িত্ব বর্তায় সিটি করপোরেশনের ওপর, যা সিটি করপোরেশনের কাছে একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। ইতোমধ্যে পচা চামড়ার দুর্গন্ধে বিষিয়ে উঠছিল আশপাশের পরিবেশ। ঈদের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে রাত আড়াইটা পর্যন্ত ২০০ শ্রমিক ও আটটি পে লোডারের সাহায্যে ৩২টি ট্রাকে ৯০ ট্রিপে এসব পচা চামড়া অপসারণ করা হয় বলে করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র মতে, নগরীর আতুরার ডিপো-হামজারবাগ এলাকা থেকে এক লাখ, বহদ্দারহাট থেকে ৯ হাজার ও আগ্রাবাদ থেকে ১২ হাজারের বেশি পচা চামড়া হালিশহর আনন্দবাজার ও আরেফিন নগরের আবর্জনার ভাগাড়ে অপসারণ করে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাজশাহীতে চামড়া নিয়ে চরম বিপাকে ব্যবসায়ীরা : সমূহ আশঙ্কা
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহীতে এবার ঈদুল আজহায় পর্যাপ্তসংখ্যক পশু জবাই হয়েছে। কিন্তু পশুর চামড়া একরকম পানির দরেই বিক্রি হয়েছে। যারা পশু কোরবানি দিয়েছেন, তারা যেমন চামড়ার দাম পাননি, তেমনি মওসুমি ব্যবসায়ীরাও দাম পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন চামড়া সংগ্রহ করবে অন্তত আরো ১০ থেকে ১২ দিন পর। ওই সময় পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা যদি এ চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন, তাহলে সরকারনির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি করতে পারবেন। না হলে তাদের পরিণতি হবে আরো মারাত্মক। এ অবস্থায় চরম বিপাকে পড়েছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। এমন অনিশ্চয়তা দেখে এখনই যেন মাথায় হাত পড়েছে চামড়া ব্যবসায়ীদের। এতে এবারের কোরবানির মওসুমে বিশেষ করে মওসুমি ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি সূত্র জানায়, রাজশাহীর আড়তদাররা পুঁজির সঙ্কটে চামড়া কিনতে পারছেন না। এ ছাড়া সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম একেবারেই কমিয়ে দেয়া হয়েছে। তার ওপর আবার মওসুমি ব্যবসায়ীরা রাজশাহী মহানগরীসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ইচ্ছেমত দামে চামড়া কিনেছেন। না বুঝে ব্যবসা করতে এসে এখন উল্টো আড়তদারদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছেন তারা।
বিভিন্ন এলাকার চামড়ার অস্থায়ী বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোরবানির গরুর প্রতি পিস ছোট চামড়ার দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, মাঝারি আকারের প্রতিটি চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং বড় চামড়া ৭০০ থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর বকরির চামড়া ১০ টাকা ও খাসির চামড়া ৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তবে এ দাম গত বছরের তুলনায় অর্ধেক। এগুলো ছিল কাঁচাচামড়া। এখন লবণ দিয়ে সংরক্ষণের পর যা খরচ পড়বে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে গেলে তার পুঁজিই উঠবে না।
এবারের কোরবানির মওসুমে সরকার গত বছরের মত গরুর কাঁচা চামড়া প্রতি বর্গফুট সর্বোচ্চ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী- গরুর কাঁচা চামড়ার দাম রাজধানীতে প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। খাসির কাঁচা চামড়ার দাম সারা দেশে ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির কাঁচা চামড়ার দাম হবে সারা দেশে ১৩ থেকে ১৫ টাকা।
এখন মওসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসান থেকে কিভাবে বের হতে পারেন সে সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ সাংবাদিকদের জানান, যদি পর্যাপ্ত লবণ দিয়ে তারা চামড়াগুলো সংরক্ষণ করেন, তাহলে আড়ত থেকে সরকার নির্ধারিত দাম পাবেন। আর তা না করে হুজুগে পড়ে চামড়া বিক্রি করে দিলে কারোরই কিছু করার থাকবে না।
রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদ সাংবাদিকদের জানান, এ ধরনের পরিস্থিতি সম্ভবত এবারই প্রথম। এক কথায় গরুর চামড়ার দামই নেই। আর বকরি ও খাসির চামড়ায় খাজনার চেয়ে বাজনাই বেশি। বকরির কাঁচা চামড়া ১০ টাকায় কিনে ১৮ থেকে ২০ টাকা লাগছে লবণসহ তা সংরক্ষণের খরচ। তিনি আরো জানান, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন রাজশাহীর ব্যবসায়ীদের বিপুল টাকা বকেয়া রেখেছে। বকেয়া পাওনা রয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে রাজশাহীর চামড়া ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক সঙ্কটে রয়েছেন। এ অঞ্চলের ১২৭ জন ব্যবসায়ী থাকলেও পুঁজিসঙ্কটের কারণে বর্তমানে ব্যবসা করছেন মাত্র ৮-১০ জন। এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ট্যানারি ও বড় বড় চামড়ার আড়তে বাকিতে মাল দিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বকেয়া টাকা কবে নাগাদ ফেরত আসবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। পুঁজি হারিয়ে অনেকে ইতোমধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
আসাদুজ্জামান মাসুদের মত অনেকেই কোনো রকমে ব্যবসা ধরে রেখেছেন। এর ওপর গত কয়েক বছর ধরেই কমেছে চামড়ার মূল্য। সরকারের বেঁধে দেয়া দামে সন্তুষ্ট নন তারা। আর এবার যা অবস্থা তাতে চামড়ার দাম পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া বিপুল চামড়া পাচারের আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বগুড়ায় কম দামের রেকর্ড : বগুড়া অফিস থেকে আবুল কালাম আজাদ জানান, গরিবের হক লুণ্ঠন করে বগুড়ায় সর্বনি¤œ রেকর্ড দরে চামড়া ব্যবসায়িরা কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেছেন। বগুড়া জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায় থেকে সর্বত্র চামড়ার বাজারে ধস ছিল। বগুড়ায় ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। আর গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। চামড়ার বাজার ধস নিয়ে চামড়া ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে একে অপরকে দুষছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাদরাসা, মসজিদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গরিব-মিসকিনরা।
বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি সূত্রে জানা যায়, বগুড়া শহরে ৩০০ চামড়া ব্যবসায়ী রয়েছেন। তারা সারা বছর চামড়া কেনাবেচা করেন। গত দুই বছর যে গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা সেই সাইজের চামড়া এ বছর বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। এর আগের বছরও বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকায়। এর আগে কখনো চামড়ার দাম এত নিচে নেমে আসেনি। কিন্তু এ বছর এক লাখ টাকা দামের গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায়। ছোট গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকায়। ছাগলের চামড়া ১০ থেকে শুরু করে ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গ্রামে ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ৫ টাকায়। আবার কোথাও কোথাও চামড়া নেননি ব্যবসায়ীরা। তাই অনেক কোরবানিদাতা গরু ও ছাগলের চামড়া নিজেরা মাদরাসায় দান করেছেন আবার কেউ কেউ মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন বা পানিতে ফেলে দিয়েছেন।
বগুড়া শহরের সাতমাথা, চামড়া পট্টি, চকসূত্রাপুর, বাদুড়তলা, চকযাদু ক্রসলেন, থানা মোড়, চেলোপাড়া, শহরের বাইরে ঠনঠনিয়া, কলোনি, বনানী, মাটিডালি, শাকপালাসহ কমপক্ষে ১০০টি স্পটে কোরবানির ঈদের দিন চামড়া সংগ্রহ করেছে চামড়া ব্যবসায়ীরা। উপজেলা পর্যায় থেকে নেয়া চামড়া বিক্রি হয়েছে শহরের চামড়ার চেয়ে অনেক কম দামে।
শহরের সুলতানগঞ্জ পাড়ার মওসুমি ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী পল্লব জানান, আমরা লোকসানের মুখে পড়েছি চামড়া কিনে। কারণ যে দামে আমরা চামড়া কিনেছি মহাজনরা সে দামে নিতে চাচ্ছেন না। তাই আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত।
বগুড়ার চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতার মতো চামড়া ব্যবসায়ীরাও কোরবানির চামড়ার বাজার নিয়ে চিন্তিত। কয়েক বছর ধরে অব্যাহত চামড়ার দরপরতন, প্রক্রিয়াজাত করার প্রধান কাঁচামাল লবণের দ্বিগুণ মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিকের বাড়তি মজুরির চাপ এবং গত বছরের বকেয়া টাকা পরিশোধ না করার কারণে বগুড়ায় চামড়ার বাজারে ধস দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ঢাকায় ট্যানারি স্থানান্তরজনিত কারণে ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনতে ততটা আগ্রহী ছিল না।
বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ জাহিদুর রহমান মুক্তা জানান, জেলায় চামড়া ব্যবসায়ীরা ২৫ কোটি টাকার চামড়া কিনেছেন। তারাও এখন শঙ্কিত চামড়া কিনে লোকসানের আশঙ্কায়।
বিটিএ-এর তথ্যানুযায়ী, কোরবানির ঈদের মওসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৫০ শতাংশ বিনিয়োগ আসে। আমাদের স্থানীয় বাজারে চামড়ার ব্যবহার বাড়ছে। যার কারণে এখন দেশেই প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ স্থানীয় চামড়ার ব্যবহার হচ্ছে। গড়ে উঠেছে অনেক শিল্প। দেশের চামড়া ব্যবসায় ঢাকার পোস্তার পরেই নাটোরের অবস্থান। দেশে সারা বছর যে চামড়া আসে তার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ সংগ্রহ হয় শুধু কোরবানির ঈদ থেকে। কোরবানির ঈদ থেকে প্রতি বছর ৬০ লাখ পিস চামড়া পাওয়া যায়।
সারা দেশে মোট ট্যানারির সংখ্যা হলো ২১০টি। তবে চামড়াজাত পণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হলো পাঁচ শতাধিক। এই ঈদের কোরবানিকৃত প্রাণীর চামড়ার জোগান বার্ষিক মোট জোগানের ৫০ শতাংশের বেশি। আর এর মধ্যে রয়েছে গরুর চামড়া ৪৫ থেকে ৫০ লাখ পিস, ছাগল, মহিষ ও ভেড়ার চামড়া ৩০ থেকে ৩৫ লাখ পিস।
উল্লেখ্য, ঢাকায় কোরবানির পশুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকা ছাড়া সারা দেশে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। ঈদের আগে চামড়া খাতের ব্যবসায়ীদের সাথে এক বৈঠকে এ দাম নির্ধারণ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।
নাটোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এই পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়েছে ২০১৪ সাল থেকে। তখন থেকেই চামড়ার দর পতন। আন্তর্জাতিক বাজারের দর কমেনি। সেখানে দর ঠিকই আছে। তিনি বলেন, যারা মাঠ থেকে চামড়া কিনে তারা আজ দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে নেই। তাদের কাছে মাঠ পর্যায়ের আড়তগুলোর বড় অঙ্কের অর্থ পাওনা রয়েছে। শুধু নাটোরের আড়তই পাবে ১০০ কোটি টাকা। তারা দীর্ঘ সময় ধরে পাওনা টাকা আড়ত মালিকদের দিচ্ছে না। চামড়াও নিতে আসছে না। ফলে বাজারের এই দশা তো হবেই। এ কারণে আড়ত মালিকরা ঝুঁকি নিয়ে চামড়া কিনতে চাইছে না। আর দেশীয় শিল্পের পণ্য উৎপাদনে চামড়া কোনো মান ধরে কেনা হয় না। বিদেশের বাজারে চামড়ার গ্রেড অনুযায়ী দর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এখানে সব চামড়াই একই দরে কেনা হয়।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান জানান, রাজধানী থেকে প্রতি বর্গফুট লবণছাড়া চামড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় সংগ্রহ করা হচ্ছে। সে হিসাব অনুযায়ী ছোট আকারের প্রতি পিস রুর চামড়ার দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, মাঝারি আকারের প্রতিটি চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং বড় চামড়া ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, এ বছর চামড়া খাতে খুব খারাপ অবস্থা। ট্যানারি মালিকদের কাছে আমাদের বকেয়া প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা। অনেকেই টাকা পাননি। আমাদের প্রায় আড়াই শ’ আড়তদারের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ জন চামড়া কিনতে পারছেন। টাকার অভাবে চামড়া কিনতে না পারার কারণে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আবার এখন যে দাম আছে তার চেয়েও দাম আরো কমে যেতে পারে।
বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত মাওলানা আবু হানিফ নেছারী দৈনিক নয়া দিগন্তকে জানান, কোরবানির পশুর চামড়ার পূর্ণ হকদার হলো এতিম, দুস্থ ও গরিব মানুষ। এই চামড়ার দাম যত বেশি হবে তাতে ওই দুস্থ মানুষেরাই লাভবান হবে। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবার কাঁচা চামড়ার নি¤œদরে নজির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের মাদরাসা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করার জন্য এটা একটা বিদেশী ষড়যন্ত্র। ভারতের যোগসাজশে দেশের মাদরাসা শিক্ষাকে ধ্বংস করার একটা চক্রান্ত। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মাদরাসাতে বেশির ভাগই এতিম ও গরিবরা পড়াশোনা করছে। আর এই কোরবানির পশুর চামড়া থেকে বছরে একটা বিশাল অঙ্কের অর্থ আয় করে থাকে দেশের মাদরাসার এতিমখানাগুলো। চামড়ার দাম যদি নামেমাত্র মূল্যে নিয়ে আসা যায় তাহলে মাদরাসাগুলোর আয় শূন্যে নেমে আসবে। অর্থের অভাবে মাদরাসা শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে। ইসলামবিদ্বেষীদের এটা একটা পরিকল্পনা।
প্রতি বছর কোরবানির পশুর চামড়া দান পেয়ে থাকে এমন নতুনবাগ মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান দৈনিক নয়া দিগন্তকে এবারের চামড়া পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, প্রতি বছরই আমরা চামড়া পেয়ে থাকি মাদরাসার এতিমখানার জন্য। আর এই চামড়ার দর প্রতি বছরই কমছে। গত বছরের তুলনায় এবার দাম কমেছে ২৫০ টাকা প্রতি পিসে। গত বছর ২৮০ পিস গরুর চামড়া পেয়ে তা ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। এবার ৩৭৬ পিস চামড়া পেয়েছি, যা বিক্রি করেছি ৫৫০ টাকা দরে। তিনি জানান, সরকার যখন আগের বছরের তুলনায় চামড়ার দর কম নির্ধারণ করে দেয় তখনই অনেক মাদরাসা ও এতিমখানা এবার চামড়া সংগ্রহ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এবার আমরা ভুলুয়া ট্যানারির কাছে ঈদের দিন সাড়ে ৫০০ টাকা দরে প্রতিটি গরুর চামড়া বিক্রি করি। পরের দিন সেই দর আর পাওয়া যায়নি। সিলেটের একটি মাদরাসা তাদের সংগৃহীত ৭০০ গরুর চামড়া ৫০ টাকা দর বলায় মাটিতে পুঁতে ফেলেছে।
তিনি জানান, এই খাতের বড় বড় ব্যবসায়ী গরিবের টাকাও এভাবে মেরে খাচ্ছে। এটা সমাজ ও দেশের জন্য ক্ষতিকর। সিন্ডিকেট করে তারা এসব করছে। আর দেশ বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলেন, মাদরাসাগুলো এই কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে একা বড় অর্থ আয় করে থাকে। এই চামড়া নিয়ে যেহেতু বড় ধরনের একটা ষড়যন্ত্র চলছে তাই মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ আগামীতে আয়ের বিকল্প হিসেবে নতুন চিন্তা করবে। তিনি বলেন, চামড়ার যখন নামেমাত্র মূল্য নিয়ে মিডিয়াগুলো সরব, তখন চামড়া ব্যবসায়ীরা মুখ বন্ধ করেছিল। সরকার যখন কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দিয়েছে, তখন তাদের মুনাফাতে আঘাত আসছে বলে সিন্ডিকেট মুখ খুলেছে। এখন তারা রফতানি বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে। তাদের প্রকৃত চেহারা দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা চাই দেশে উৎপাদিত চামড়া দেশেই থাকবে। দেশের শিল্প বিকাশিত হবে। দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে।
চামড়ার দর নিয়ে ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেছেন, ভ্রান্ত নীতি-কৌশলের কারণে এবারো চামড়া খাতে অনাকাক্সিক্ষত বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য হ্রাসের মিথ্যা অজুহাতে ট্যানারির মালিকেরা সিন্ডিকেট করে কোরবানির ঈদে উৎপাদিত কাঁচা চামড়ার হ্রাসকৃত মূল্য নির্ধারণ করায় এ বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার মূল্য হ্রাসের যে অজুহাত ট্যানারি ব্যবসায়ীরা দাঁড় করিয়েছেন, তা সঠিক নয়। ইনডেক্স মুন্ডির পরিবেশিত খবর তারই প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কেননা ইনডেক্স মুন্ডির খবরে বলা হয় যে, বিশ্ববাজারে গত জুলাই মাসে ও প্রতি পাউন্ড চামড়ার দাম যেখানে ছিল ১০৭ ডলার, তা আগস্টে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১১ ডলার ১৭ সেন্টে।
এ দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে অবিলম্বে কাঁচা চামড়া ক্রয় শুরু করবে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: আবদুল লতিফ বকসী জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে অবিলম্বে নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া ক্রয় শুরু করবে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। কাঁচা চামড়ার গুণাগুণ যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য স্থানীয়ভাবে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চামড়া সংরক্ষণের জন্য চামড়া ব্যবসায়ী এবং সংরক্ষণকারীদের প্রতি আগেই অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তাগিদ দিয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাথে কাঁচা চামড়া নিয়ে চলমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। আলোচনার প্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনকে আগে নির্ধারিত সময়ের ২০ তারিখ আগেই জরুরি ভিত্তিতে কাঁচা চামড়া ক্রয় শুরু করার অনুরোধ জানায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের প্রেক্ষিতে চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন অবিলম্বে কাঁচা চামড়া ক্রয় শুরু করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে।
চামড়ার বাজার প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, চামড়ার দাম এত কম হওয়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের কারসাজি রয়েছে। গতকাল রংপুর নগরীর শালবন এলাকায় তার বাসভবনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। টিপু মুনশি বলেন, ঈদের আগে ট্যানারি মালিক ও চামড়া ব্যবসায়ীদের নিয়ে সভা করে আমরা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা লক্ষ্য করলাম ঈদের দিন দাম এমন কমে এলো, যা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। যখনই আমরা চেষ্টা করি কিছু ব্যবসায়ীরা তার সুযোগ নেয়।
দাম কমার কারণেই কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা মনে করেছি চামড়া রফতানি করার সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হবে। তাহলে দামটা বাড়বে। আজকে বোধহয় চামড়া ব্যবসায়ীরা একটা সভা করবেন। তারা বলছেন চামড়া এক্সপোর্ট করলে দেশীয় শিল্পের ক্ষতি হবে। দেখা যাক কী হয়। যেটা ঠিক করা হয়েছিল তারা তা মানেন কি না, দেখা যাক। আশা করি এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
কী ধরনের চামড়া, কিভাবে রফতানি হবেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে টিপু মুনশি বলেন, তা রফতানিকারকরা বুঝবেন। তবে যেভাবে রফতানি করা হোক এতে তৃণমূলের চামড়ার দাম বাড়বে এটা উদ্দেশ্য।


আরো সংবাদ