১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ মোদির

অবৈধ অভিবাসী ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু : জয় শঙ্কর
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শংকরের সাক্ষাৎ : পিআইডি -

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঢাকা সফররত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করে তার হাতে মোদির আমন্ত্রণপত্র তুলে দেন।
পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেন। তিনি জানান, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ আমন্ত্রণের জন্য নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত পাঁচ বছরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি নতুন উচ্চতায় আসীন হয়েছে। তিনি বলেন, এই সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা এবং সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত তাদের ব্যবসা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা এবং পায়রা বন্দর ব্যবহার করতে পারে।’ দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রগুলো উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, রেল, সড়ক এবং আকাশ পথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক রুট ইতোমধ্যে উন্মুক্ত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে চমৎকার সহযাগিতা বিদ্যমান রয়েছে। দু’টি দেশ নিজেদের অনেক সমস্যাই দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিশেষ করে দু’দেশের মধ্যকার সীমান্ত সমস্যা সমাধানের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী এর সমাধান বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ভারতের সকল রাজনৈতিক দল তাদের সংসদে সীমান্ত চুক্তি সংক্রান্ত বিলের প্রতি সর্বসম্মতভাবে সমর্থন জানায়।’
ভারতকে বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই নয়াদিল্লি বাংলাদেশের প্রতি অব্যাহতভাবে সমর্থন জানিয়ে আসছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মুয়াজ্জেম আলী, ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাস এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
আমাদের কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, আসামের অবৈধ অভিবাসী ইস্যুটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেনের সাথে সোয়া ঘণ্টার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে জয়শঙ্কর এই মন্তব্য করেন। জয়শঙ্করের এই মন্তব্যটি বাংলাদেশের অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তবে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। চলতি বছর ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি হিসেবে আসামের অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অমিত শাহ। সম্প্রতি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে অমিত শাহের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে ইস্যুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথ বিবৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে বাংলাদেশের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। আসামে ৪০ লাখ অধিবাসী এনআরসি হিসেবে পরিচিত নাগরিকপঞ্জিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। এসব মানুষকে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা ভারতের রাজনীতির একটি উত্তপ্ত ইস্যু।
জয়শঙ্কর বলেন, ভারত ‘প্রতিবেশী প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্বে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আমাদের বন্ধন কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী হতে পেরে আমরা গর্বিত। বাংলাদেশের উন্নয়ন এজেন্ডাকে এগিয়ে নিতে ভারত সব ধরনের সহযোগিতা দেবে। ভারত নিজের স্বার্থেই এটা করবে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত মানুষ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে আমরা এসব মানুষের নিরাপদ, দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়েছি। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এসব মানুষকে সহায়তা দেয়া এবং রাখাইনে তাদের জন্য উন্নতর পরিবেশ সৃষ্টিতে ভারত তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে। প্রত্যাবাসনে ইচ্ছুক মানুষের জন্য গত মাসে ১৫০টি ঘর তৈরি করে মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছে ভারত। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত মানুষের মানবিক দিকটি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। ‘পানিসম্পদ দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ’ মন্তব্য করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে আমরা উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি ফর্মুলা খুঁজছি। সম্ভাব্য যে কোনো স্থান থেকে কাজ শুরু করতে আমরা প্রস্তুত।
তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে কোনো অগ্রগতি রয়েছে কি না জানতে চাওয়া হলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই ইস্যুতে ভারতের আগের দেয়া প্রতিশ্রুতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উন্নত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এটার সুফল দুই দেশের জনগণ সরাসরি পেয়ে থাকে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে উন্নতর কানেক্টিভিটি দুই দেশের জন্য আয় ও প্রবৃদ্ধির সুযোগ এনে দেয়। অংশীদারিত্বের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে আমরা কানেক্টিভিটি থেকে সর্বোচ্চ সুফল অর্জন করতে চাই।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সাথে অংশীদারিত্বে জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ খাতে পরস্পরের সাফল্যের সুফল আমরা পেয়ে থাকি। সরকারি-বেসরকারি খাতের বেশ কিছু জ্বালানি বিনিময় প্রকল্প নিয়ে আমরা আলাপ করছি। তিনি বলেন, বাণিজ্য আরো সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমরা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব পরবর্তী ধাপে উন্নীত করতে চাই। বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশেই এ খাতে আমরা অগ্রগতি অর্জন করতে চাই। তিনি বলেন, বিশ্বে ভারতের সবচেয়ে বড় কনসুলার কার্যক্রম বাংলাদেশে চলছে। জনগণের মধ্যে এই বন্ধনে আমরা গর্বিত। বাংলাদেশের মানুষের ভারত সফর আমরা যতটা সম্ভব নির্বিঘœ করতে চাই। ঐতিহাসিক বন্ধনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করতে চাই।
জয়শঙ্কর বলেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আজকের আলোচনায় আমরা এই সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ আকাক্সক্ষার বিষয়ে আলোচনা করেছি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এটা আমার প্রথম বাংলাদেশ সফর। বাংলাদেশের সাথে বিদ্যমান অংশীদারিত্ব আরো শক্তিশালী করা আমার এই সফরের লক্ষ্য। তিনি বলেন, আগামী অক্টোবরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ‘সোনালী অধ্যায়’ চলছে উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, এ জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বকে ধন্যবাদ দিতে হবে। প্রথমে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এই সম্পর্কে জড়িত হতে পেরে আমি আনন্দিত। এই দৃষ্টান্তমূলক সম্পর্কের গতিধারা অব্যাহত রাখতে আমরা চেষ্টা করে যাবো।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে উষ্ণ পরিবেশে বৈঠক হয়েছে উল্লেখ করে আব্দুল মোমেন বলেন, আমি খুবই উৎফুল্ল। অনেক ইস্যুতে আমাদের আলোচনা হয়েছে। এসব ইস্যু সমাধানে আমরা মোটামুটিভাবে ঐকমত্যে পৌঁছেছি। আমরা সামনে আরো ভালো দিনের অপেক্ষায় আছি। সম্পর্ক আরো উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যেতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ইচ্ছার কথা তুলে ধরে ড. মোমেন বলেন, বাংলাদেশও একই প্রত্যাশা করে। আজকের আলোচনায় আমরা খুবই সন্তুষ্ট।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন দিনের সফরে গত সোমবার রাতে ঢাকায় পৌঁছান। গতকাল সকালে তিনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। রাতে ভারতীয় হাইকমিশনের দেয়া নৈশভোজে অংশ নেন। জয়শঙ্কর আজ বুধবার সকালে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যাবেন।

 


আরো সংবাদ