১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯
টিআইবির গবেষণা

ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে

বদলিতে লাগে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত
মাইডাস সেন্টারে টিআইবির সংবাদ সম্মেলন : নয়া দিগন্ত -

ঘুষ ছাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কাজ করানো অত্যন্ত দুরূহ। আর নিয়মবহির্ভূতভাবে একজন সাব- রেজিস্ট্রার বদলি হতে ৩ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। এলাকাভেদে ৩-২০ লাখ টাকা লাগে। আর ঢাকা বা ঢাকার আশপাশে বদলি হতে ৫০ লাখ টাকারও বিনিময় হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
টিআইবি বলেছে, বিগত বছরগুলোতে ভূমি নিবন্ধন সেবাসংক্রান্ত বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা সংশোধন ও হালনাগাদ করা এবং নিবন্ধন ফি ও যাবতীয় শুল্ক পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধের মতো বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও আইনি, পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা সীমাবদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা ও সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে এ খাতে এখনো সুশাসনের ঘাটতি বিদ্যমান। ভূমি নিবন্ধন সেবার যুগোপযোগী মানোন্নয়নে ১৫ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
‘ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক’ এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে গতকাল সোমবার টিআইবির ধানমন্ডির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবাসংক্রান্ত নানা তথ্য তুলে ধরে এই সুপারিশ প্রদান করে টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা- নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।
গবেষণায় দেখা যায়, দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় প্রতারণা ও জালিয়াতি, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, স্থানীয় রাজনৈতিক ও নানাবিধ প্রভাব বিস্তার, সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি নানা কৌশলের ফাঁদে ফেলে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে টাকা ছাড়া কোনো কাজ করানো অত্যন্ত দুরূহ। দলিল লেখার ফি সম্পর্কে সেবাগ্রহীতাদের ধারণা না থাকায় নিবন্ধনের ধরনভেদে দলিলের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে লেখকদের প্রতি লাখে ১-৩ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হয়। এ ছাড়া নির্ধারিত নিবন্ধন ফির বাইরে প্রতিটি দলিল নিবন্ধনের জন্য দলিল লেখক সমিতির নামেও সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় করা হয়। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দলিল নিবন্ধনের জন্য সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে এক হাজার ১,০০০ থেকে ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। সাব- রেজিস্ট্রার অফিসের ‘অফিস খরচ’ অজুহাতেও দলিল লেখকরা নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় করে থাকে। দলিলের নকল কপি উত্তোলনের জন্যও সরকার নির্ধারিত ফি অপেক্ষা ১০০০ থেকে ৭০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে একটি যোগসাজশ রয়েছে। এমনকি কিছু সেবাগ্রহীতাও এই যোগসাজশের অংশ হয়। আবার দলিল লেখকদেরকে তাদের সমিতিতেও দলিলপ্রতি ৫০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত প্রদান করতে হয়। অন্য দিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের এই যোগসাজশের দুর্নীতির শিকার হয় এবং তাদেরকে অসহায় করে ফেলা হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রারসহ অন্যান্য কর্মচারীর পদোন্নতি ও বদলির জন্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে তদবির ও নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আছে। সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলির ক্ষেত্রে এলাকাভেদে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং ঢাকা বা আশপাশের এলাকায় বদলির জন্য ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। আবার সাব- রেজিস্ট্রার থেকে জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নিয়ম-বহির্ভূত অর্থের লেনদেন, প্রভাব বিস্তার বা তদবিরের অভিযোগ রয়েছে।
গবেষণায় আরো দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নকলনবিস পদে তালিকাভুক্তি, কাজে যোগদান এবং নকলনবিস থেকে স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। একইভাবে নকলনবিস থেকে মোহরার পদে যোগদানের জন্য জেলা রেজিস্ট্রার অফিস ও নিবন্ধন অধিদফতরে ২ লাখ থেকে ৮ লাখ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, মোহরার থেকে অফিস সহকারী পদে পদোন্নতির জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা দিতে হয়। অফিস সহকারী থেকে প্রধান সহকারী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। দলিল লেখকদের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া লাইসেন্স পাওয়ার পর দলিল লেখক সমিতিতে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য একজন দলিল লেখককে আরো ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা দিতে হয়। আবার প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়ন করার সময় অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হয়।


আরো সংবাদ