২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সংসদে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না

-

সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। আমরা যদি তাই বিশ্বাস করতাম তাহলে এ দেশে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না। তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার জন্য নয়, সব প্রতিষ্ঠানকে আরো সক্রিয় রাখার জন্য আমি সর্বদা সচেষ্ট থাকি। তা না হলে সংসদ সদস্যের নেত্রী খালেদা জিয়ার মতো ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালে কি প্রশ্ন করে খুশি হতেন?
গতকাল বুধবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপির রুমিন ফারহানা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার লিখিত প্রশ্নে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুগ্রহ করে বলবেন কি, দেশে বর্তমানে মানুষ হত্যা হতে মশা মারা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা প্রয়োজন হয়, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেঙে পড়া, অকার্যকর হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। প্রাতিষ্ঠানিক সফলতা একটি কার্যকর রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত। এই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো কি রাষ্ট্রপরিচালনায় সরকারের সার্বিক ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে না?’
জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারপ্রধানের দায়িত্ব হলো- সব মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয় করা। মন্ত্রীদের কাজের তদারকি করা। জনগণ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। আরাম আয়েশের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিনি। আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। যিনি তার জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন এই দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। তার কন্যা হিসেবে জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতার একটা আলাদা জায়গা রয়েছে। আমি সেটাই প্রতিপালনের চেষ্টা করি। সে জন্যই দিনরাত পরিশ্রম করি। কোনো প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার জন্য নয়, সব প্রতিষ্ঠানকে আরো সক্রিয় রাখার জন্য আমি সদা-সর্বদা সচেষ্ট থাকি।
সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার নিরলস প্রচেষ্টা এবং আমাদের জনগণের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজকে বাংলাদেশ বিশ্বে একটা মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্বের রোলমডেল। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি জায়গা দখল করেছে। এসব আপনা-আপনি হয়নি। সব শ্রমে হয়েছে। প্রতিষ্ঠান অকার্যকর থাকলে সব অর্জন সম্ভব হতো না। কারণ রাষ্ট্র একটি যন্ত্রের মতো। এই যন্ত্রের বিভিন্ন কলকব্জা যখন সমন্বিতভাবে কাজ করে, তখন রাষ্ট্র ভালো থাকে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ, রাষ্ট্রযন্ত্র ভালোভাবে কাজ করছে। তা না হলে সংসদ সদস্যের নেত্রীর খালেদা জিয়ার মতো ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালে কি উনি প্রশ্ন করে খুশি হতেন?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আর প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হওয়ার কথা বলছেন? অকার্যকর রাষ্ট্রের উদাহরণ তো বিএনপি সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত নয়- এমন ব্যক্তির কাছ থেকে আসতো। প্রধানমন্ত্রী ঘুমিয়ে থাকতেন, তার পুত্র হাওয়া ভবন থেকে মনমতো সিদ্ধান্ত নিত। মন্ত্রী, সচিবরা হাওয়া ভবন থেকে নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন। তিনি বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য একটি অনাকাক্সিক্ষত, সংসদীয় ও অবান্তর প্রশ্ন করেছেন। তিনি মানুষ হত্যা আর মশা মারাকে একই সমতলে নিয়ে এসেছেন।
আমি তো আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না : গণফোরাম দলীয় সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জনগণ নির্বাচিত করে আমাকে সংসদে পাঠিয়েছে, আমি যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি, যেখানেই থাকি না কেন আমি সবসময় মনে করি- জনগণের ভালো-মন্দ দেখা আমার দায়িত্ব। আমি তো আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না। আর ১২টায় ঘুম থেকে উঠি না। বলতে গেলে আমি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টা ঘুমের সময় পাই। সার্বক্ষণিক চেষ্টা করছি দেশের কোথায় কী হচ্ছে সেগুলোর নজর রাখার। এটা নিজের কর্তব্য বলে মনে করি।
সব অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্যহিস্যা পেতে সরকার সতর্ক : জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নুর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশ যাতে ন্যায্যহিস্যা পায় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং সতর্কতা গ্রহণ করা হয়েছে। শুষ্ক মওসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ হ্রাসের বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে এবং এটি সুরাহার তাগিদ দেয়া হয়েছে। পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির জন্য ভারতের সাথে আমাদের জোর কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত আছে। তিস্তাসহ অন্যান্য সব অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে এখনো তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তাদের সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। আগামী অক্টোবরে ভারত সফরের সময়ও আমি এ বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করব।
মিয়ানমার শিগগিরই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সর্বশেষ অগ্রগতি বিষয়ে সংরক্ষিত আসনের রুমানা আলীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার ফিরে যাওয়ার প্রশ্নে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। ২২ আগস্ট ২০১৯ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ ঠিক করা হয়। যাবতীয় প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে সম্মত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হওয়ার কারণ হিসেবে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়ন না হওয়া, রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ পরিবার অনুযায়ী ভেরিফিকেশন না করা, নিজ বাসস্থান বা গ্রামে ফেরত ও স্থাবর সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও জীবিকার অধিকারসহ অন্যান্য নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তার অভাব এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের অব্যাহত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ শিগগিরই রাখাইন রাজ্যে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে এবং দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া শুরু হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার ডেঙ্গুটা শুধু বাংলাদেশে নয়, আশপাশের দেশগুলোতেও দেখা দিয়েছে। মহামারী আকার বলা হচ্ছে, প্রকৃত অর্থে মহামারী আকারে হয়েছে ফিলিপাইনে। আমাদের ১৬ কোটি ৩৫ লাখ মানুষের দেশে যে সংখ্যা দেখছি, ফিলিপাইনে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৫০০ লোক মারা গেছে। মহামারী আকার সেখানে দেখা দিয়েছিল, তারা জরুরি অবস্থা জারি করেছিল। আমাদের দেশে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে দেইনি, যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ওষুধ কেনার ব্যাপারে যারা দায়ী বা সত্যিকারে কেন কাজ হয়নি এ ব্যাপারে তদন্ত করা হচ্ছে। মশার প্রজনন যেন না হয় সে বিষয়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছি।

 


আরো সংবাদ