২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯

আবারো বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

দুই শিক্ষার্থীসহ চারজনের মৃত্যু
-

এক দিনের ব্যবধানে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেড়েছে শতাধিক। তবে কমেছে রাজধানীতে। সার্বিকভাবে আগের চেয়ে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছে। গতকাল সারা দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭৫০ জন। রাজধানীতে আক্রান্ত হয়েছে ২৩৭ জন। রাজধানীর বাইরে আক্রান্তের সংখ্যা ৫১৩ জন। আগের দিন আক্রান্তে সংখ্যা ছিল ৬৩৪ জন।
সরকারি হিসাবে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৬০ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতর ১০১টি মৃত্যু পর্যালোচনা করে ৬০টি মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এ মৃত্যুগুলো ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্তের কারণেই হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে পর্যালোচনার জন্য রয়েছে আরো ৯৬টি মৃত্যু। হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়ই এ মৃত্যুগুলো হলেও স্বাস্থ্য অধিদফতর সবগুলো মৃত্যু ডেঙ্গুর কারণেই হয়েছে বলে স্বীকার করছে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানান, ‘ডেঙ্গুর জন্য করা সবগুলো পরীক্ষা নির্ভুল হয়েছে এমন বলা যাবে না। কিছু ভুল হতে পারে।’ স্বাস্থ্য অধিদফতরের আইইডিসিআর হাসপাতালে ডেঙ্গু সন্দেহে ভর্তি যেসব রোগীর মৃত্যু হয়েছে তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টগুলো আইইডিসিআর-এ এনে আবার পরীক্ষা করে দেখে এবং মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনদের থেকে নির্দিষ্ট নিয়মে জিজ্ঞাসাবাদ করে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই মৃত ব্যক্তি ডেঙ্গুতেই আক্রান্ত হয়েছে কি না পরীক্ষা করেই ডেঙ্গুতেই মারা গিয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়।
গতকাল রাজধানীর আক্রান্তের মধ্যে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৭৫ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয় ৬২ জন। রাজধানীর ঢাকার বাইরে সম্মিলিতভাবে আক্রান্তের সংখ্যা ৫১৩। আগের দিন থেকে ১০০ বেশি। বিভাগীয় এলাকার হাসপাতালগুলোর মধ্যে এখনো ঢাকা ও খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। গতকাল ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ১১২ জন এবং খুলনা বিভাগে ছিল ২০০ জন। এছাড়া চট্টগ্রামে ৪৬, রাজশাহী বিভাগে ৪৯ জন, বরিশাল বিভাগে ৬৪ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৭ জন, রংপুরে ১২ জন এবং সিলেট বিভাগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৩ জন। সারা দেশে চিকিৎসাধীন আছে তিন হাজার ২৯ জন। গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত পূর্বের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫১ জন। এছাড়া মিটফোর্ড হাসপাতালে ৩৩ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৯ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১৫ জন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ জন, পুলিশ হাসপাতালে দুজন, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৩ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ২৩ জন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনজন এবং কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে একজন ভর্তি হয়েছে।
এছাড়া রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে আদদীন হাসপাতালে পাঁচজন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একজন, কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে তিনজন, হলিফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে চারজন, সেন্ট্রাল হাসপাতালে আটজন, উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে পাঁচজন, সালাহউদ্দিন হাসপাতালে আটজন, আজগর আলী হাসপাতালে চারজন, পপুলার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চারজন, ইবনে সিনা হাসপাতালে একজন, আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে একজন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এদিকে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বরিশালে দুই শিক্ষার্থী, বান্দরবানে উপজেলা চেয়ারম্যানের স্ত্রী এবং সাভারে এক আইনজীবীর মৃত্যু হয়েছে।
বরিশাল ব্যুরো জানায়, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিক্ষার্থী মারা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে সুরাইয়া আক্তার (১৪) নামে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। সুরাইয়া বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা গ্রামের বাসিন্দা বাদল মুন্সীর কন্যা ও হাড়িচানা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। এর আগে বুধবার দুপুরে বরিশাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুলাদী উপজেলার সদর ইউনিয়নের মধ্য চরলক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা বাবুল হাওলাদারের ছেলে ফরহাদ হোসেন জিহাদ (১৪) ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। জিহাদ চর লক্ষ্মীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিল।
সূত্রে আরো জানা গেছে, শেবাচিম হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ১০টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত) ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১৯ জন রোগী। বর্তমানে এ হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৯ জন, নারী ৩৪ জন ও শিশু ২৬ জন।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা: মোহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাক হোসেন জানান, গত ১৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২১৭০ জন ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২০৬৩ জন। এছাড়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন আটজন।
বান্দরবান সংবাদদাতা জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বান্দরবানের রুমা উপজেলা চেয়ারম্যান উহ্লাচিং মারমার স্ত্রী দমে চিং মারমা (৩২) মারা গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রামের সিএসসিআর হাসপাতাল তিনি মারা যান।
পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে গত সপ্তাহে রুমা উপজেলার চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি উহ্লাচিং মারমার স্ত্রী দমে চিং মারমা বেবী জ্বরে আক্রান্ত হলে স্থানীয়ভাবে পরীক্ষার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে বান্দরবান হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল সিএসসিআরে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে দমে চিংয়ের মৃত্যু হয়েছে।
সাভার (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের কোন্ডা গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষানবিশ এক আইনজীবী আবির হোসেন (২৫) গত বুধবার রাতে মারা গেছেন। তিনি সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুনের ছেলে।
জানা যায়, গত দুই সপ্তাহ আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রথমে রাজধানীর কল্যাণপুরে একটি হাসপাতালে, পরে ধানমন্ডি জেনারেল ও কিডনি হাসপাতাল এবং সর্বশেষ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে গত দুই দিন আগে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। পরে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়া হলে তিনি মারা যান। আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার জন্য কিছু দিন পর আবির হোসেনের লন্ডন যাওয়ার কথা ছিল।

 


আরো সংবাদ