১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

উন্নয়ন ব্যয়ে বিশৃঙ্খলা

৭২৭ কোটি টাকার প্রকল্পে সম্মানী ৩২৩ কোটি, পরামর্শক ব্যয় ১৭৯ কোটি মিটিং ফি ১১ কোটি, টিএ/ডিএ ২৬ কোটি আর ভ্রমণ খরচ ১৪ কোটি টাকা
-

চরম বিশৃঙ্খলা চলছে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে। ব্যয়ের হিসাব মিলাতে চাতুরতার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। তাতেও মিলছে না হিসাব। অব্যবহৃত শত কোটি টাকা খরচের জন্য এখন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ৭২৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ের চলমান এই প্রকল্পে সম্মানী খাতে খরচ করা হচ্ছে ৩২৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা ও কমিটির মিটিং ও কমিশন ফি রয়েছে ১১ কোটি টাকা। আর পরামর্শক খাতে ১৮০ কোটি টাকা। টিএ/ডিএ খরচ রাখা হয়েছে ২৬ কোটি টাকা। আবার এই টিএ/ডিএর বাইরে ট্রাভেল খরচ করা হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। এই ব্যয়গুলো চলমান আছে ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেইজড (এনএইচডি) বা জাতীয় খানাসমূহের ডাটাবেইজ প্রকল্পে। সাড়ে চার বছরের এই প্রকল্পের ছয় বছরে অগ্রগতি মাত্র ৮৫ শতাংশ বলে পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যে জানা গেছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এসব হলো আর্থিক বিশৃঙ্খলা। বিভিন্ন পর্যায়ে এত সূক্ষ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও কিভাবে এই ধরনের ব্যয়ের পরিকল্পনা অনুমোদন দেয়া হয় সেটি কল্পনা করা কঠিন।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের সহজ শর্তের ঋণে জাতীয় খানাসমূহের ডাটাবেইজ প্রকল্পটি ২০১৩ সালের জুন থেকে বাস্তবায়ন শুরু হয়। ৩২৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্ত করার কথা ছিল। প্রকল্পে ৩১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা হলো বিশ্বব্যাংকের ঋণ। কিন্তু ওই সাড়ে চার বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি তেমন ছিল না। ফলে প্রথম সংশোধনীতে মেয়াদ আরো এক বছর বাড়িয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর করা হয়। তখন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এক লাফে ৩৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বা দ্বিগুণ। তখন ব্যয় ৬৯৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। তাতেও শেষ করতে পারেনি বিবিএস। দ্বিতীয় দফায় আবারো মেয়াদ এবং ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়। এক বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ব্যয় ২৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে প্রকল্পের মোট ব্যয় ৭২৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা করা হয়। ২০১৯ সালের জুনে এটি শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু বর্ধিত মেয়াদে প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ বলে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের জনসংখ্যা পরিকল্পনা ও সমন্বয় উইংয়ের যুগ্ম প্রধান স্বাক্ষরিত কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্পের মূলকাজ হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তালিকা সংবলিত একটি ডাটাবেইজ এবং সব খানার সদস্যগণের মৌলিক তথ্য সংবলিত ডাটাবেইজ প্রস্তুত করা। ইতোমধ্যে মোট ব্যয়ের ৬২৫ কোটি ৩৭ লাখ ২০ হাজার টাকা ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত খরচ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কমিটির মিটিংয়ে কমিশন বাবদ খরচ (কোড-৪৮৯৫) ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৯৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। সম্মানী খাতে মোট ব্যয় ৩২৩ কোটি ৪২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। দু’টি কোডে তিনটি স্তরে এই ব্যয় ধরা হয়েছে। কোড-৪৮৮৩ তে ২১৮ কোটি ১৫ লাখ ছয় হাজার টাকা এবং ১০৩ কোটি এক লাখ ৫৯ হাজার টাকা ও কোড-৪৮৯৫ তে এক কোটি ২৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। আর একই কোডে পরামর্শক খাতে দু’টি খরচ দেখানো হয়েছে। কোড-৪৮৭৪ তে ১০৭ কোটি ৬০ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং ৭২ কোটি ১২ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
বিবিএসের ব্যয়ের তথ্য থেকে জানা গেছে, একই কোডে-৪৮০১ ভিন্ন নামে একই ধরনের মোট ৪০ কোটি ৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এই ব্যয়ের মধ্যে টিএ/ডিএ হলো ২৬ কোটি ২২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা এবং ট্রাভেল এক্সপেন্সেস (টিএ/ডিএ) ১৩ কোটি ৮৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা। অন্য দিকে, দুটি কোডে চারটি স্তরে কম্পিউটার ও এক্সেসরিজ এবং সফটওয়্যার খাতে মোট ব্যয় ৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এখানে কোড-৬৮১৫তে কম্পিউটার ও এক্সেসরিজ ব্যয় ২৫ কোটি ৯ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং ৪ কোটি ১৫ লাখ ২২ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। আর কোড-৬৮১৭ এ সফটওয়্যার খাতে ৮০ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং সাড়ে ৭ লাখ টাকা। স্টেশনারি, সিল ও স্ট্যাম্পে ৫ কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার টাকা ধরে আবার একই কোড-৪৮২৮ তে স্ট্যাম্প ও সিল খাতে ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
দুটি কোডে প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে। কোড-৪৮৪০তে লোকাল ট্রেনিং খাতে ৭ কোটি ৮৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা এবং একই কোর্ডে নাম পরিবর্তন করে ট্রেনিং লোকাল খাতে ৬ কোটি ৭০ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অন্যদিকে, কোড-৪৮৪২তে বৈদেশিক ট্রেনিং, ট্যুর, স্ট্যাডি, কর্মশালায় ১ কোটি ২৪ রাখ ২ হাজার টাকা বরাদ্দ রেখে, একই কোডে খাতের নামটা একটু ঘুরিয়ে ট্রেনিং (বৈদেশিক ট্যুর, স্ট্যাডি, কর্মশালা) এ ২ কোটি ৩৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
বিবিএসের দেয়া প্রকল্প প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় জাতীয় খানাসমূহের ডাটাবেইস তৈরি করা হবে। যা নিরাপত্তা সেবা সরবরাহের জন্য দরিদ্র পরিবারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা সহজতর হবে। অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কর্তৃক যেসব নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন আছে তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন সহায়ক হবে। দেশব্যাপী সব খানার সদস্যগণের মৌলিক তথ্য সম্বলিত একটি ডাটাবেইস প্রস্তুতকরণ, যার মধ্যে ডেমোগ্রাফিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর ফলে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসমূহের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রকল্প পরিচালক এম. শফিকুল আলমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি গতকাল দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ২০১৩ সালের প্রকল্প। সব কিছু এখন জানা নেই। তবে প্রকল্পটির সময় বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। চলতি বছর জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের হার ৮৮ শতাংশ বলে তিনি দাবি করেন। তৃতীয় দফায় মেয়াদ আরো ২ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
কমিটির মিটিং ফি ১১ কোটি টাকাÑ এত কেন জানতে চাওয়া হলে প্রকল্প পরিচালক শফিকুল আলম বলেন, সারা দেশে বিভিন্ন কমিটি আছে। তাদের মিটিং হয়। তবে কাগজপত্র না দেখে বলতে পারব না। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, হয় অফিসে আসেন, না হলে আপনার যা মনে চায় সেটাই লেখেন।
এসআইডি সচিব সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনায় প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রকল্পে ১০১ কোটি ৯৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা জুনের পর অব্যবহৃত থাকবে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো না হলে ওই অব্যবহৃত টাকা পড়েই থাকবে। প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রাখার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় বড় অঙ্কের ব্যয়ভার সরকারের রাজস্ব খাত থেকে বহন করতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট উইং বলছে, প্রকল্পটি দু’বার সংশোধন করা হয়েছে। বিদ্যমান পরিপত্র মোতাবেক সংশোধন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। দ্বিতীয় সংশোধনের সময় যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল সেসব কার্যাবলি গত ২০১৯ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সমাপ্ত হওয়ার কথা। তার পরও আবার কেন তৃতীয় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সাথে প্রকল্পের এ ধরনের বিস্ময়কর ব্যয়ের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মূল্যায়ন কমিটিতে গেছে। আমার কাছে আসুক, আমি দেখে পদক্ষেপ নেব। চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের জন্য একনেকে যাওয়ার আগে আমার কাছে আসবে। তখন আমি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখব। তিনি বলেন, অনেক সময় পিইসি থেকে আমার কাছে প্রকল্প আসে না।
এই ব্যয়ের ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড অর্থনীতিবিদ ড: জাহিদ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব ব্যয়ে অনেক ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা। বিভিন্ন পর্যায়ে মনিটরিং করা হয়। তার পরও কিভাবে এ ধরনের আর্থিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ পাচ্ছে। কিভাবে এসব অনুমোদন পাচ্ছে এখানেই প্রশ্ন?
বিদেশ থেকে ঋণ এনে প্রকল্প করে জাতি কোনো সুফল পাচ্ছে কি না, জানতে চাইলে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, জাতি না পেলেও কেউ না কেউ সুফল পাচ্ছে।

 


আরো সংবাদ