১৭ অক্টোবর ২০১৯

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পিছুটান : বিনিয়োগসীমা ফের বৃদ্ধি

-

ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগ বন্ধে বিনিয়োগসীমা ৮৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৮৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক; কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই কার্যকর করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর চাপে সিদ্ধান্ত কার্যকরের সময়সীমা তিন দফা পরিবর্তন করা হয়। গতকাল একই কারণে বিনিয়োগসীমাও আগের অবস্থানে নিয়ে যেতে হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক আগের অবস্থান থেকে সরে এসে বিনিয়োগসীমা আবারো আগের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এখন থেকে প্রচলিত ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানতের ৮৫ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারবে। আর ইসলামী ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারবে ৯০ শতাংশ। আগে এ বিনিয়োগসীমা ছিল সাড়ে ৮৩ শতাংশ ও ৮৯ শতাংশ।
বিনিয়োগসীমা আগের অবস্থানে নেয়ার যৌক্তিকতা তুলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, কার্যকরের সময়সীমা কয়েক দফা পরিবর্তন করেও কমপক্ষে ১২টি ব্যাংক এখনো নির্ধারিত সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে পারেনি। ফলে তারা নতুন করে ঋণও বিতরণ করতে পারছে না। অপর দিকে, বর্তমান বিনিয়োগসীমা দিয়ে বছর শেষে জাতীয় প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২ শতাংশের ওপরে অর্জন করা সম্ভব হবে না। মূলত জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সহায়ক হিসেবে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক গ্রাহকদের বেশি মাত্রায় ঋণ দিতে পারবে। পুঁজিবাজারসহ সামগ্রিক খাতে বাড়বে টাকার প্রবাহ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১৭ সালের শুরুর দিকে যখন এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তখন ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রবাহ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছিল। তখন বাস্তবে বিনিয়োগ চোখে না পড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। আগ্রাসী এ ব্যাংকিংয়ের কারণে ঋণ আমানতের অনুপাত কোনো কোনো ব্যাংকের শতভাগ ছাড়িয়ে যায়। যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ছিল ৮৫ ভাগ। ব্যাংকগুলোর এমন আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে তহবিল ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। দীর্ঘ দিন আমানতের প্রবৃদ্ধি হয় ১০ শতাংশের নিচে। সাধারণত ঋণের প্রবৃদ্ধি আমানতের চেয়ে কম হওয়ার কথা, সেখানে আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ হয়ে যায়।
তহবিল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়ার আগেই ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে ওই বছরের ৩০ জানুয়ারি ব্যাংকগুলোর জন্য এ বিষয়ে এক সার্কুলার জারি করা হয়। বলা হয়, ঋণ আমানতের অনুপাত প্রচলিত ব্যাংকগুলোকে ৮৫ শতাংশের পরিবর্তে সাড়ে ৮৩ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য ৯০ শতাংশের পরিবর্তে ৮৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এর জন্য সময় দেয়া হয় প্রথম ছয় মাস। অর্থাৎ যেসব ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগ থাকবে তাদেরকে ওই বছরের ৩০ জুনের মধ্যে পুনর্নিধারিত সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে বলা হয়; কিন্তু ব্যাংকের ব্যবসায়ী পরিচালকদের চাপের মুখে গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি সার্কুলার দিয়ে সময়সীমা ছয় মাস বাড়ানো হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালনের সময়সীমা ছয় মাস থেকে বাড়িয়ে ১২ মাস করা হয়; কিন্তু এতেও ব্যবসায়ীরা সন্তুষ্ট না হয়ে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। ব্যাংকের ব্যবসায়ী পরিচালকেরা হোটেল সোনারগাঁওয়ে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরকে নিয়ে এক বৈঠকের আয়োজন করে। ওই বৈঠকের পর গত বছরের ৯ এপ্রিল আবারো সার্কুলার সংশোধন করে বিনিয়োগসীমা সমন্বয়ের সময় আরো তিন মাস বাড়িয়ে ৩১ মার্চ করা হয়; কিন্তু আলোচ্য সময়েও তা সমন্বয় করতে না পারায় চলতি বছরের ৭ মার্চ তৃতীয় দফা সংশোধন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময় সার্কুলারটি কার্যকরের সময়সীমা ছয় মাস বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়, যা চলতি মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে; কিন্তু সার্কুলার কার্যকরের সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়েও ১২টি ব্যাংক এখন নির্ধারিত সীমার মধ্যে আনতে পারেনি। এ কারণে গতকাল চতুর্থ দফা সংশোধন করা হয় সার্কুলারটি।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশনের মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্বে) মো: সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারের মাধ্যমে বিনিয়োগসীমা আবারো আগের অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এ নিয়ে সার্কুলারটি চতুর্থ দফা সংশোধন করা হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের সহায়ক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যমান বিনিয়োগসীমার কারণে অনেক ব্যাংক ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ হলো ব্যাংকগুলো কাক্সিক্ষত হারে আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না। একদিকে আমানত প্রবাহ বাড়ছে না, অপরদিকে বিদ্যমান ঋণের সুদ যুক্ত হয়ে সামগ্রিক ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে নির্ধারিতসীমা অর্থাৎ সাড়ে ৮৩ শতাংশে বিনিয়োগ নামিয়ে আনতে পারেনি প্রায় ডজন খানেক ব্যাংক। মূলত, জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের সহায়ক হিসেবেই বিনিয়োগসীমা বাড়ানো হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ বিষয়ে জারিকৃত সার্কুলারটি কার্যকর করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

 


আরো সংবাদ