২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০
প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন

দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে তা হতে পারে না

ভারতকে সামান্য পানি দিয়েছি বলে এত হইচই কেন; আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে; বুয়েট চাইলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : বাসস -

ভারতের সাথে করা চুক্তির বিরোধিতাকারীদের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে এটা কখনো হতে পারে না।’
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফর নিয়ে গতকাল বুধবার গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ড, ক্যাম্পাসে চলমান অস্থিরতা, ছাত্ররাজনীতি এবং চলমান শুদ্ধি অভিযান নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
ভারতে গ্যাস রফতানি নিয়ে সমালোচকদের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, বরং আমদানি করা বোতলজাত এলপিজি গ্যাস রফতানি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটি তো দেশের স্বার্থেই করা। ব্যবসায়ীদের জন্য বিনিয়োগ উন্মুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে অপপ্রচার চলছে। বিশেষ করে বিএনপি এটা নিয়ে বেশি অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের ভুলে গেলে চলবে না, ২০০১ সালে আমি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্যাস বিক্রির চুক্তিতে রাজি হইনি বলে আমাদেরকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়নি। তখন গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসে। দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে এটা কখনো হতে পারে না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ত্রিপুরা যদি কিছু চায় তাহলে আমাদের দিতে হবে। ’৭১ সালে তারা আমাদের অসংখ্য মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিয়েছে। ত্রিপুরা ছিল একরকম আমাদের ঘাঁটি। তাই ত্রিপুরার সাথে আমাদের সব সময় সুসম্পর্ক ছিল এবং থাকবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বোতলজাত গ্যাস আমদানি করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভারতে রফতানি করছে। এক সময় হাতেগোনা দু-একটি কোম্পানি একচেটিয়া ব্যবসা করত, বর্তমানে তা ওপেন করে দেয়ায় ২৬টি কোম্পানি প্রতিযোগিতামূলকভাবে ব্যবসা করছে। তাই ১০ থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডার দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করত, সেখানে এখন ৯০০ টাকায় বিক্রি করছে। আর ভারতে গ্যাস রফতানি হওয়ায় বাংলাদেশের রফতানি আইটেমে এলপিজি গ্যাস নতুন যুক্ত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।’ ত্রিপুরাকে ফেনী নদীর পানি দেয়ার বিরোধিতাকারীদের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ত্রিপুরায় যে পানি দেয়া হচ্ছে, তা হচ্ছে খাবার পানি। কেউ খাবার পানি চাইলে, তা যদি না দিই তাহলে কেমন হয়! আর ত্রিপুরা আমাদের ঐতিহাসিক বন্ধু। সেই ত্রিপুরায় সামান্য খাবার পানি দেয়ার জন্য আপত্তি থাকতে পারে না।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘ফেনী নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশের খাগড়াছড়িতে হলেও এই নদীর বেশির ভাগ দুই দেশের সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক নদী। এই নদী ৪০ কিলোমিটার আমাদের ভেতর হয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে, যার বড় অংশই সীমান্তে। আর সীমান্ত নদীতে দুই দেশেরই অধিকার থাকে। সেখান থেকে সামান্য পানি আমরা দেবো। সামান্য ১.৮২ কিউসিক পানি দিচ্ছি ভারতকে। এটি অত্যন্ত নগণ্য। এটা নিয়ে হঠাৎ এত চিৎকার কেন জানি না। এ নিয়ে হইচই করার কী আছে?’ তিনি বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক নদীগুলো খননের পরিকল্পনা নিয়েছি। ভারত তাতে সহায়তা করবে। যৌথ নদীগুলোর সমস্যা সমাধানে আমরা আলোচনা করে যাচ্ছি, কাজ চলছে।’
এ প্রসঙ্গে বিএনপির সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া ভারতে সফর করেছিলেন। কিন্তু তারা কি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি করতে পেরেছে? পারেনি।
তিস্তার পানি বণ্টনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আশ্বস্ত করেছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিস্তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে। একইসাথে আরো সাতটি নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়েও আলোচনা চলছে। আলোচনার মাধ্যমে পানি সমস্যার সমাধান করা হবে।’ আসামের নাগরিকপঞ্জি এনআরসি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন। বলেছেন, নাগরিকপঞ্জিতে বাংলাদেশের উদ্বেগের কোনো কিছু নেই। আমি আশ্বস্ত হয়েছি।’
আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে : বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কি অমানবিক! ২১ বছরের একটি মেধাবী ছেলেকে কিভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। আবরারের বাবা-মা কত কষ্ট পেয়েছে। এই নৃশংসতা কেন? এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হবে। আমার বাবা, মা, ভাইকে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু বিচার পাইনি। ৩৮ বছর লেগেছে। দেশবাসীকে সেই কথা ভুলে যাওয়া উচিত না।’ শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘কেউ যদি অপরাধ করে তবে সে কোন দলের সেটা আমার কাছে বিবেচ্য নয়। আমার কাছে অপরাধী অপরাধীই। সে জন্য বুয়েটের ঘটনার পরপরই আমি ব্যবস্থা নিতে বলি। যাকে যেখানে পাওয়া যায় সেখান থেকেই গ্রেফতারের নির্দেশ দেই। ইতোমধ্যেই অনেককে ধরা হয়েছে। এখানে কে ছাত্রলীগ কে ছাত্রদল সেই হিসেব করিনি।’ বুয়েটে সনি হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘ছাত্রদলের টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে মেধাবী ছাত্রী সনিকে হত্যা করা হলো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরো অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। কিন্তু কেউ কি বিচার পেয়েছে? প্রত্যেকটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল অস্ত্রবাজদের দখলে। আমি ক্ষমতায় আসার পর তার পরিবর্তন করেছি।’
শিক্ষার্থীরা যত দিন খুশি আন্দোলন করুক : আবরার হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি তারা যেন দূরে থাকে। শিক্ষার্থীরা যত দিন খুশি আন্দোলন করতে থাকুক। কিন্তু নিজেদের ভেতরে কিছু ঘটলে সেই দায়িত্ব কে নেবে? তবে নিরাপত্তাবাহিনী প্রস্তুত আছে। আমি চাই না এখনি তারা হস্তক্ষেপ করুক। আন্দোলনের বিরুদ্ধে আমি কখনো যাই না।’
বুয়েট চাইলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে : বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি নেই। তাই বুয়েট চাইলে সেখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বুয়েটের কমিটি আছে, সিন্ডিকেট আছে। তারা যদি মনে করে বন্ধ (ছাত্ররাজনীতি) করে দিতে পারে। এখানে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করব না।’
এ সময় সামগ্রিকভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বিরোধিতা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি ব্যান করে দিতে হবেÑ এটা তো মিলিটারি ডিক্টেটরদের কথা। আবরার হত্যার সাথে রাজনীতিটা কোথায়? এর কারণটা কোথায়, এটা খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনীতি হচ্ছে শিক্ষার ব্যাপার, প্রশিক্ষণের ব্যাপার এবং জানার ব্যাপার। দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের সর্বাগ্রে ছাত্ররাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ছাত্ররাজনীতি করেই এত দূর এসেছি। যারা উড়ে এসে জুড়ে বসে তারা ক্ষমতা উপভোগ করতে আসেন। তারা ছাত্ররাজনীতি পছন্দ করেন না।’
দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাঁড়াশি অভিযান : দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাঁড়াশি অভিযানের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের প্রত্যেকটা হল খুঁজে খুঁজে দেখা হবে। তিনি বলেন, ‘একটি রুম দখল করে জমিদারি-মাস্তানি করা হবে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আবাসিক হলে কারা থাকছে, কারা মাস্তানি করছে তা খতিয়ে দেখা হবে।’
যেখানে অনিয়ম সেখানেই ধরব : চলমান শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানে যেখানে অনিয়ম আছে সেখানেই ধরব। এটার শুরু আর শেষ নেই। যারাই অন্যায় করবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
ক্যাসিনো নিয়ে হাস্যরস : জুয়াড়িরা চাইলে ক্যাসিনো বা জুয়ার জন্য দেশের একটি জায়গা নির্ধারণ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা ক্যাসিনো ও জুয়া খেলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে তাদের কেউ কেউ হয়তো দেশ থেকে ভেগে গেছে। এখানে সেখানে খেলার জায়গা খোঁজাখুঁজি করছে। আমি বলেছি, একটা দ্বীপ মতো জায়গা খুঁজে বের করো, সে দ্বীপে আমরা সব ব্যবস্থা করে দেবো। দরকার হলে ভাসানচর বিশাল দ্বীপ, এর একপাশে রোহিঙ্গা আরেক পাশে এই ক্যাসিনোর ব্যবস্থা করে দেবো। সবাই ওখানে চলে যাবে। ক্যাসিনো ও জুয়ার জন্য প্রয়োজনে নীতিমালা তৈরি করে লাইসেন্স দেয়া হবে, তাতে রাজস্ব বাড়বে। আর অভ্যাস যদি বদভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, এই বদভ্যাস যাবে না। তার চেয়ে এটা করলে আমরা (সরকার) টাকা পাবো।’ এর আগে লিখিত বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 

 


আরো সংবাদ