১৭ নভেম্বর ২০১৯

বন্দর নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

ভারতকে ব্যবহারের সুবিধা প্রদান
-

চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেয়ার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, বন্দরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে এমনিতেই প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। কনটেইনার জটে পড়ে পণ্য নিয়ে খালাসের অপেক্ষায় বন্দরে অপেক্ষা থাকতে হচ্ছে দিনের পর দিন। নতুন করে ভারতীয় পণ্য খালাসে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করা হলে শত শত দেশী ব্যবসায়ী পথে বসবেন এবং নিত্যপণ্যের দাম আরো বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ ব্যবসায়ীদের অনুমান, একই বন্দর ব্যবহার করা হলেও ভারতীয় ব্যবহারকারীরা ভিআইপি মর্যাদা পাবেন এবং এর মাধ্যমে দেশী ব্যবহারকারীদের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হবে। এমতাবস্থায় অবকাঠামো যথাযথ মানে উন্নীত করার পর ভারতকে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার দাবি জানান তারা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরকালে যে সাতটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তার অন্যতম বন্দর ব্যবহারের অনুমতিদান। সফরকালে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের বিষয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সই হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় এ-সংক্রান্ত খসড়া অনুমোদিত হয় এক বছর আগে। তারও আগে ২০১১ সালে ট্রান্সশিপমেন্টের আওতায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ত্রিপুরা রাজ্যের ‘পালটানা বিদ্যুৎকেন্দ্র’ নির্মাণের মালামালের চালান বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চলমান ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সুদীর্ঘ করার উদ্দেশে’ ‘এগ্রিমেন্ট অন দ্যা ইউজ অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মংলা পোর্ট ফর মুভমেন্ট অব গুডস টু অ্যান্ড ফর্ম ইন্ডিয়া বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া’ চূড়ান্ত করা হয়।
চুক্তিতে কয়েকটি রুটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর থেকে আগরতলা ভায়া আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর থেকে ডাউকি ভায়া তামাবিল (সিলেট), চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর থেকে সুতারকান্দি ভায়া শেওলা (সিলেট), চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর থেকে বিবিরবাজার ভায়া শ্রীমন্তপুর (কুমিল্লা)। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যই স্থলাবদ্ধ (ল্যান্ড লকড)। ভারতের অন্য অংশ থেকে ওই সব রাজ্যে যেতে হয় অনেক পথ ঘুরে। ফলে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে ওই সব রাজ্যে পণ্য নিতে ভারত বরাবরই আগ্রহী ছিল। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরের মাধ্যমে ভারতের সে প্রত্যাশা চূড়ান্তভাবে পূরণ হলো।
বিভিন্ন পর্যায়ের আমদানি-রফতানিকারক এবং বন্দর সংশ্লিøষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এমনিতেই বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজজট, পণ্য নিয়ে আসা জাহাজের বার্থিং পেতে সময়ক্ষেপণ, পণ্য হ্যান্ডলিং ও ডেলিভারিতে ধীরগতি, লাইটার জাহাজ ও জেটি সঙ্কটসহ বিভিন্ন কারণে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতা ও ব্যর্থতাসহ নানা কারণে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না চট্টগ্রাম বন্দর। এর খেসারত দিতে হচ্ছে শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, রাষ্ট্রকেও। এমতাবস্থায় ভারতীয় পণ্য পরিবহনের অনুমতি দেয়া হলে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ মন্তব্য করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এফবিসিসিআইর একজন সাবেক সভাপতি বলেন, মোট আমদানি-রফতানির প্রায় ৯২ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয় এ বন্দর দিয়ে। এ বন্দর থেকে ট্রানজিট পণ্য পরিবহন উপযোগী কোনো অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক লাভ হবে এবং বিপরীতে বাংলাদেশের সামগ্রিক রফতানি খাতের ওপর এর কেমন প্রভাব পড়বে সেটি বিবেচনায় নেয়া না হলে দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, বর্তমান অবস্থাতেই অতিরিক্ত লোডিং-আনলোডিং চার্জ, কাস্টমসের পর্যাপ্ত জনবল সঙ্কটে রফতানিতে হিমশিম অবস্থা। এমতাবস্থায় এ বন্দর দিয়ে বিদেশী পণ্য আনা-নেয়া শুরু হলে আরো নতুন পণ্য বেসরকারি আইসিডিতে পাঠাতে হবে। এতে দেশের রফতানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণে রফতানি বাণিজ্যে ৮৪ শতাংশ অবদান রক্ষাকারী দেশের তৈরী পোশাক শিল্পখাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তবে ভারতকে মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হলে দেশের ক্ষতি না হলে লাভ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। যদিও মংলা বন্দর ব্যবহারে ভারতের তেমন আগ্রহ নেই বলে জানা গেছে।
জানা যায়, ২০০৭ সালের পর সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য আর কোনো জেটি নির্মাণ করা হয়নি। বর্তমানে মাত্র ১৯টি জেটি আছে। এসব জেটিতে স্বাভাবিকভাবে যেখানে ১৫ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যায়, সেখানে হ্যান্ডলিং হচ্ছে ৩০ লাখ টিইইউএস কনটেইনার। তা ছাড়া দেশে যে হারে আমদানি-রফতানি বাড়ছে, সে হারে ১০ বছর পর অন্তত ৬০টি জেটির প্রয়োজন হবে। বে-টার্মিনাল নির্মাণ করতে পাঁচ বছর সময় লাগবে। তাই আগামী দুই বছরের মধ্যে বে-টার্মিনালের আওতায় ট্রাক টার্মিনাল ও কনটেইনার টার্মিনাল বা ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণ জরুরি বলে মনে করছেন ব্যবহারকারীরা। তাদের ধারণা, বন্দর থেকে সরাসরি কনটেইনার বে-টার্মিনালে চলে গেলে বন্দরের ওপর চাপ কমবে। গভীর সমুদ্রবন্দরের সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগামী ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রায় তিন মিলিয়ন বা ৩০ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে হবে। তখন চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান সুবিধাদি দিয়ে দেড় মিলিয়ন এবং মংলা বন্দর দশমিক ০৪৭ মিলিয়ন কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। বাকি ১.৪৫৪ মিলিয়ন কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে না বলে ওই সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়। এর সাথে ভারতীয় পণ্য যুক্ত হলে কী পরিণতি হবে, তা ভাবতেই আঁতকে উঠছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ দিকে ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগদানের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি ও চট্টগ্রাম পোর্ট ইউজার্স ফোরামের চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম বলেন, বন্দরের সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আমরা যদি ২১০০ সালকে কেন্দ্র করে বন্দরের পরিকল্পনার কথা চিন্তা করি, তা হলে এই সক্ষমতা বাড়াতে হবে বহুগুণ। ব্যবসা বাণিজ্য যে গতিতে চলছে, সেই গতিতে বন্দর এগোতে পারছে না; যে কারণে আজকে জাহাজজট এবং কনটেইনার জট সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে বন্দরে জেটি আছে মাত্র ১৯টি। অথচ এই মূহূর্তে কমপক্ষে ৬০টি জেটি দরকার। তিনি বলেন, বন্দরকেন্দ্রিক যানজট কমানোর জন্য গাড়ি প্রবেশ ও বের হওয়ার অন্তত পাঁচটি পথ থাকতে হবে। এ ছাড়া সড়কপথে চাপ কমানোর জন্য কনটেইনার পরিবহনের জন্য আলাদা রেললাইন করতে হবে। মূল কথা হচ্ছেÑ চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা যত বাড়ানো যাবে, দেশের অর্থনীতির জন্য তা হবে তত মঙ্গলজনক। এই সক্ষমতা বাড়াতে হলে সবার আগে বে-টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে।
ভারতকে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বন্দর ব্যবহারে দেশীয় ব্যবহারকারীদের মধ্যে সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টির বিষয় বর্তমানে রয়েছে। নিজেদের সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণেও এটা হতে পারে। তিনি বলেন, প্রতিবেশীর প্রতি উদারতা দেখাতে গিয়ে নিজেদের প্রতি উদাসীনতার ব্যাপারটি যাতে না আসে। তার মতে, সক্ষম বন্দর হলে দেশীয় ব্যবহারকারীদের কাছ থেকেও মাশুল আদায় বাড়ানো যায়। এতে অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা যায়। তবে বর্তমান মুক্তবিশ্বে মুক্ত বাণিজ্যের ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে হয়। তিনি একটি আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলেন, বন্ধু রাষ্ট্রের প্রয়োজনের প্রতি উদার আর দেশীয় স্বার্থে এক ধরনের উদাসীনতা কাজ করার আশঙ্কা থেকে বলা যায়, তাদের পণ্যকে যদি ভিআইপি মর্যাদা দিয়ে আলাদা নজর দেয়া হয় সে ক্ষেত্রে দেশীয় ব্যবহারকারীদের প্রতি সমান আচরণ করা সম্ভব হবে না। বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে।


আরো সংবাদ