১৭ নভেম্বর ২০১৯

কাউন্সিলর রাজীবের হাতে ছিল আলাদিনের চেরাগ

-

আলাদিনের চেরাগ পেয়েছিলেন রাজীব। হঠাৎ কেউ দেখলে মনে করত রাজা-বাদশাহ বা সুলতান। কোথাও গেলে সাথে থাকত দামি গাড়ি আর মোটরবাইকের বহর। ভিআইপি মর্যাদায় এই বহর রাস্তা দিয়ে চলত। রোদে গেলে আশপাশের কেউ ধরে রাখে ছাতা। এই পরিবর্তন ঘটে মাত্র চার বছরে। এই চার বছরে গড়ে তোলেন অঢেল সম্পত্তি, গাড়ি আর বাড়ি। ইচ্ছে হলেই বদলাতেন গাড়ির মডেল।
স্থানীয় সূত্র জানায়, যুবলীগ নেতা ও ঢাকা মহানগর ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজিব ছয় বছর আগে মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১০ নম্বর রোডের ৬ নম্বর বাসার নিচতলার গ্যারেজের পাশেই ছোট্ট এক কক্ষে সস্ত্রীক ভাড়া থাকতেন। ভাড়া দিতেন ছয় হাজার টাকা। তখনো তিনি কোনো ব্যবসাবাণিজ্য করতেন না। এখনো করেন না; কিন্তু পরিবার নিয়ে থাকেন একই হাউজিং এলাকায় নিজের ডুপ্লেক্স বাড়িতে। আগে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে রাজীব চলাফেরা করতেন। এখন তিনি কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুর এলাকার সাবেক এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানকের পোষ্যপুত্র হিসেবে খ্যাত রাজীব। নানকের একমাত্র পুত্র সায়েমুর রহমান সায়েম সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করার পর নানকের স্নেহের দুর্বলতার সুযোগ নেন রাজীব। নানক মেকানিজমে থানায় বসে সিল মেরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয়া তারেকুজ্জামান রাজীব পাস করে যান কাউন্সিলর হিসেবে। ২০১৫ সালের কাউন্সিলর নির্বাচনে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। বিভিন্ন কারসাজি করে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে হারানো হয়। অভিযোগ রয়েছেÑ এর পর থেকেই এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন শুরু করেন রাজীব। নির্বাচনে জেতার পর মনে হয় হাতে আলাদিনের চেরাগ পেয়ে যান। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অপরের জমি দখল, মাদক কারবারসহ নানা উপায়ে টাকার পাহাড় গড়ে তোলেন কিছু দিনের মধ্যেই।
এই কাউন্সিলর নিজের এলাকায় গড়ে তুলেছেন একচ্ছত্র রাজত্ব। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, টেন্ডারবাজি, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ আর মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত করেছেন তার অফিস। মোহাম্মদপুরের বসিলা, কাটাসুর, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান, নবোদয় হাউজিং, মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড, গ্রাফিক্স আর্টস ও শারীরিক শিক্ষা কলেজ, চান মিয়া হাউজিং ও বাঁশবাড়ী এলাকায় তৈরি করেছেন একক আধিপত্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় লেগুনার হেলপারি এবং বাবার সাথে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন রাজীব। মোহাম্মদপুর এলাকায় যুবলীগের রাজনীতি দিয়েই শুরু হয় রাজীবের রাজনৈতিক জীবন। দেখতে স্মার্ট এবং স্বভাবে চতুর রাজীব অল্প দিনেই নেতাদের সান্নিধ্যে এসে মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ বাগিয়ে নেন। এই পদ পেয়েই থানা আওয়ামী লীগের এক নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম পাইন আহমেদকে প্রকাশ্যে জুতাপেটাসহ লাঞ্ছিত করেন। সে সময় যুবলীগ থেকে তাকে বহিষ্কারও করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তারেকুজ্জামান রাজীব মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে উল্টো ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বনে যান। কেন্দ্রীয় যুবলীগের আলোচিত দফতর সম্পাদক আনিসুর রহমানকে এক কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে এ পদ কেনেন রাজীব। যুবলীগের সাইনবোর্ড আর কাউন্সিলরের পদটি ব্যবহার করে এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক কারবার, ডিশ ব্যবসাসহ পরিবহনে চাঁদাবাজিসহ নানা মাধ্যমে হয়ে ওঠেন আরো দুর্ধর্ষ ও বেপরোয়া।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত চার বছরে কমপক্ষে ১০ টি দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনেছেন রাজীব। এর মধ্যে সাতটি গাড়ির নম্বর পাওয়া গেছে। গাড়িগুলো হলোÑ ঢাকা মেট্রো-ম ০০-৬৬৪, ঢাকা মেট্রো-শ ০০-০৬৬৪, মেট্রো-ল-০০-০৬৬৪, মেট্রো-ঘ-১৮-২৬৯৩, ঢাকা মেট্রো ভ-১১-০১৭১, ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৪-২৮৫৪, ঢাকা মেট্রো-খ ১১-৭৭৮২। এই গাড়িগুলোর বেশ কয়েকটি নম্বরের রেজিস্ট্রেশন নেই। ভুয়া নম্বর ব্যবহার করে তিনি গাড়িগুলো চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। এ ছাড়াও গুলশান, মোহাম্মদপুরে তার সাত-আটটি ফ্ল্যাট কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলেন, কমিশনার হওয়ার পরপরই রাজীব তার ক্যাডার বাহিনীর প্রচারণায় বনে যান স্বঘোষিত ‘জনতার কমিশনার’। আর এই ‘জনতার কমিশনার’ জনতার কাছ থেকেই চাঁদা তোলেন কোটি কোটি টাকা। দখল করেন জনগণের জমি, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড ও ফুটপাথ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহআলম, জীবন, ইয়াবা কারবারি সিএনজি কামাল, অভি ফারুক, আশিকুর রহমান রনির মাধ্যমে প্রতি মাসে শুধু পরিবহন থেকেই তোলেন প্রায় ১০ লাখ টাকা। শুধু মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড় থেকে পান মাসে পাঁচ লাখ টাকা। এ ছাড়াও মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, বসিলা, ঢাকা উদ্যান, শিয়া মসজিদ স্ট্যান্ড থেকে পান আরো পাঁচ লাখের মতো। মোহাম্মদপুর এলাকার ফুটপাথগুলো থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা চাঁদা আসে তার পকেটে। তার ওয়ার্ডে সব ধরনের টেন্ডার থেকে তাকে দিতে হয় নির্দিষ্ট টাকা। মোহাম্মদপুর থেকে আল্লাহ করিম মসজিদ পর্যন্ত পুরো ফুটপাথ থেকে প্রতিদিনই চাঁদা তোলে তার লোকজন। অভিযোগ রয়েছে আল্লাহ করিম মসজিদ ও মার্কেট কমিটিতে জোর করে তার লোককে রাখা হয়। যদিও এই কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে অনেক আগে। তারপরও নতুন কমিটি দেয়া হচ্ছে না। এই মসজিদ মার্কেটের পার্কিংয়ের জায়গায় দোকানপাট করে এসব দোকানপ্রতি একটা বড় অঙ্কের টাকা নেন তিনি। শুধু তাই নয়, মসজিদ ও মার্কেটের জেনারেটর রাখার জায়গাটিতেও তিনি দোকান বসিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, তারেকুজ্জামান রাজীব মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নম্বর রোড এলাকায় পানির পাম্পের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বাড়ি বানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আর্কিটেক্ট দিয়ে ডিজাইন করে অত্যাধুনিক ফিটিংস দিয়ে রাজপ্রাসাদের আদলে আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি বানান তিনি। শুধু বাড়ির জায়গাটির দাম প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। বাড়িটি তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে আরো পাঁচ কোটি টাকা। এ ছাড়াও মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম, দুবাইতে বুর্জ খলিফার পাশে একটি বাড়ি এবং সৌদি প্রবাসী মিজান নামক এক ব্যক্তির সাথে হোটেল ব্যবসায় অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন বলে আলোচনা রয়েছে তার এলাকায়।

 


আরো সংবাদ