১৮ নভেম্বর ২০১৯

আ’লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর চাবিকাঠি কার হাতে

-

অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য এবং টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে যুবলীগসহ তাদের কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতার গ্রেফতার হওয়ার ঘটনায় অস্বস্তিতে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ফলে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে এসব সংগঠনের নেতৃত্ব ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে দল। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোতে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার লক্ষ্যে এখন একের পর এক কাউন্সিল করা হচ্ছে। কিন্তু সহযোগী সংগঠনগুলো কি স্বাধীনভাবে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারে নাকি তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়Ñ এমন প্রশ্ন এখন এই সংগঠনগুলোরই নেতাকর্মীদের অনেকেই তুলছেন।
কী ভাবছে তৃণমূল : সাত বছর পর কৃষক লীগের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গত ৬ নভেম্বর। কাউন্সিলে সারাদেশ থেকে কাউন্সিলর বা প্রতিনিধিরা আসেন তাদের সংগঠনের নতুন নেতৃত্ব ঠিক করার জন্য।
এই প্রতিনিধিদের মধ্যে পুরনো যারা এর আগে দু’টি কাউন্সিলে অংশ নিয়েছিলেন, এমন কয়েকজনের বিবিসিকে বলেন, তাদের সংগঠনে কখনই ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়নি। তারা বলেন, তাদের মূল দল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যাকে ঠিক করে দেবেন, এবারো সেটাই তারা মেনে নেবেন।
উত্তরের একটি জেলা থেকে আসা কৃষক লীগের একজন নারী কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘নেত্রী যাকেই দেবেন, আমরা সেই নেতৃত্বই মানব। আজকে আমি হয়তো শুধু একজনকে চাইব, কিন্তু নেত্রী তো সবকিছু বিবেচনা করে নেতৃত্ব বাছাই করবেন। নেত্রী সংগঠনের ভেতরে জনমত বিবেচনায় নেন।’
ঢাকার বাইরে থেকে আসা সংগঠনটির আরেক কর্মী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ হলো আমাদের মূল মাথা। ফলে আওয়ামী লীগ আমাদের যেটা বলবে, আমরা সেটাই মানতে বাধ্য।’
নেতা বাছাই : কাউন্সিলররা শুধু মেনে নেন
কৃষক লীগের সম্মেলনের উদ্বোধন করে আওয়ামী লীগ নেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কৃষক লীগের নেতা ঠিক করার কাউন্সিল অধিবেশনে থাকবেন। কিন্তু সংগঠনটির কাউন্সিলররা তাদের নেতৃত্ব ঠিক করবেন। সেই কাউন্সিলে কৃষক লীগের সভাপতি পদে ১৩ জন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১১ জন প্রার্থী হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত কাউন্সিলররা তাদের নেতা নির্বাচন করতে পারেননি।
ওবায়দুল কাদের তাদের দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর কৃষক লীগের কাউন্সিলরদের সামনে সংগঠনটির নতুন নেতাদের নাম ঘোষণা করেছেন। সেখানে শুধু সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ঠিক করা হয়। নতুন এই দু’জন সাবেক দু’জন নেতা এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সাথে আলোচনা করে পুরো কমিটি গঠন করবেন। এটাই বলা হয় কৃষক লীগের সম্মেলনে।
আওয়ামী লীগ নেতাদের দেয়া সেই সিদ্ধান্ত কৃষক লীগের কাউন্সিলররা মেনে নেন। শুধু কৃষক লীগ নয়, অন্য সহযোগী সংগঠনগুলোতেও নেতৃত্ব মূল দল আওয়ামী লীগ থেকে একইভাবে ঠিক করে বা চাপিয়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের অনেকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে সহযোগী সংগঠনগুলোতে সবার মাঝে নেতৃত্ব আসার প্রবণতা বেড়েছে। সে কারণে এসব সংগঠনেও এখন নেতার সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
গোয়েন্দা রিপোর্ট
যুব মহিলা লীগের সভানেত্রী এবং সাবেক এমপি নাজমা আকতার বলছিলেন, যেহেতু আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় রয়েছে, এই সময়ে সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মূল দলের শীর্ষ নেতৃত্ব গোয়েন্দা রিপোর্টও নিয়ে থাকেন। ‘সহযোগী সংগঠন সবগুলোর নেতৃত্ব একই পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। সংগঠনে কে বেশি জনপ্রিয়, সে ব্যাপারে কাউন্সিলের আগে একটা ধারণা পাওয়া যায়। এরসাথে এখন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে থেকে রিপোর্ট নেয়া হয়। সব বিষয় বিবেচনা করে আমাদের নেত্রী আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে আলোচনা করে একটা পরার্শ দেন। সেই পরামর্শ নিয়ে সহযোগী সংগঠনটির নেতাকর্মীরা আলোচনা কমিটি গঠন করেন। এখানে চাপিয়ে দেয়ার কোনো বিষয় নেই।’
আওয়ামী লীগ চাপিয়ে দেয়ার অভিযোগ মানতে রাজি নয় : দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলছিলেন, তাদের দল এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর গঠনতন্ত্র মেনেই মূল দল সহযোগীর ভূমিকা নেয়। তবে ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে গেলে সংগঠনে বিভক্তি দেখা দেয় বলে তারা মনে করেন।
‘আওয়ামী লীগ হচ্ছে মূল দল। মাদার অর্গানাইজেশন হিসেবে যখন তাদের কোনো সহযোগী সংগঠন সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হয়, তখন মূল দলের কাছে তারা শরণাপন্ন হয়। যেমন কৃষক লীগের সম্মেলনে এত সভাপতি সম্পাদক প্রার্থী ছিল যে আমরা তাদের নিয়ে বসেছিলাম। কিন্তু তারা কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলেন না। তখন আমরা কেন্দ্রীয় নেতা যারা ছিলাম, তারা আমাদের নেত্রীর সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’
কাউন্সিলও হয় না নির্ধারিত সময়ে
তিন বছর পর পর সম্মেলন বা কাউন্সিল করে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা থাকলেও সহযোগী সংগঠনগুলোর কয়েকটিতে সাত কিংবা আট বা তারও চেয়ে বেশি সময় ধরে তা হয় না। যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং শ্রমিক লীগে বছরের পর বছর জেলা উপজেলা পর্যায়েও কোনো সম্মেলন হয় না এবং নেতৃত্বের কোনো পরিবর্তন নেই।
এর মধ্যে প্রথমে কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলো। শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং যুবলীগের কাউন্সিল এখন নভেম্বর মাসেই পর্যায়ক্রমে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রলীগের শীর্ষ দু’জন নেতাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরামে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি তুলেছিলেন এবং তারপর ছাত্রলীগের ওই দু’জন নেতাকে বিদায় নিতে হয়।
সে সময় দলটির সিনিয়র নেতাদের অনেকে বলেছিলেন, তাদের নেত্রী নিজে ছাত্রলীগের সেই দু’জন নেতাকে বাছাই করেছিলেন এবং সেজন্য চাঁদাবাজির অভিযোগ আসায় তিনি বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
অন্য দিকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যুবলীগ, কৃষক লীগসহ কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছেন। এসব সংগঠনের আরো অনেকের নাম এসেছে।
এমন পরিস্থিতি আওয়ামী লীগকেই ভাবমূর্তির সঙ্কটে ফেলে। তখন সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রশ্ন আসে। সেজন্য এখন এসব সংগঠনের কাউন্সিল করা হচ্ছে। কিন্তু সেই নেতৃত্ব নির্বাচন কতটা গণতান্ত্রিকভাবে হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় বলে মনে করেন নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুরশিদ।
সংগঠনগুলো কতটা স্বতন্ত্র থাকতে পারছে
সহযোগী সংগঠনগুলোতে নেতৃত্ব চাপিয়ে দেয়ার অভিযোগ যখন রয়েছে, তখন কৃষক লীগের কাউন্সিলেও নেতৃত্ব ঠিক করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতাদের হস্তক্ষেপ ছিল দৃশ্যমান।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করার সময় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংশোধনী আনা হয়েছিল। সেখানে ছাত্র, শ্রমিক এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন হিসেবে না রাখার কথা বলা হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী কোনো অঙ্গ সংগঠন থাকবে না। ফলে অন্য সংগঠনগুলোকে সহযোগী সংগঠন হিসেবে দেখানো হয়। এর সাথে সঙ্গতি রেখে নেতৃত্ব নির্বাচন করাসহ স্বাধীনভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানোর ব্যাপারে সহযোগী সংগঠনগুলোর গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী আওয়ামী লীগ কাগজে-কলমে ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ এবং পেশাজীবী সংগঠনকে দেখিয়ে থাকে। এর বাইরে যুবলীগ, কৃষক লীগসহ সাতটি সহযোগী সংগঠনকে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগসহ দলগুলো যখন এসব শর্ত মেনে নিবন্ধন করেছিল, তখন অন্যতম একজন নির্বাচন কমিশনার ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন। তিনি মনে করেন, বিষয়গুলো এখন শুধু কাগজে-কলমেই রয়েছে। ‘এখন বিষয়টা এমন পর্যায়ে এসেছে যে, আরপিওতে সংগঠনের স্বাধীনতার কথা বলা আছে। কিন্তু ক্রমেই তা শিথিল হচ্ছে। বাস্তবে মূল দল সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে।’ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রেও বলা রয়েছে, সহযোগী সংগঠনগুলো তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
সহযোগী সংগঠনগুলোরও আলাদা আলাদা গঠনতন্ত্র আছে। কিন্তু সহযোগী সংগঠনগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কি না, এসব সংগঠনেই সেই প্রশ্ন রয়েছে।
কৃষক লীগের কাউন্সিলে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিনিধি যারা এসেছিলেন, তাদের কয়েকজন বলছিলেন সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচন থেকে সবকিছুর ব্যাপারে যখন আওয়ামী লীগ থেকে সিদ্ধান্ত আসছে, তখন দলীয় রাজনীতি নিয়ে কর্মসূচি পালনের মধ্যে তাদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ‘আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোতে আমাদের কোনো স্বাধীনতা নেই। তাদের কথামতো আমাদের চলতে হয়। এটা সমস্যা।’

লেজুড়বৃত্তির অভিযোগ
সহযোগী সংগঠনগুলো নেতৃত্ব নির্বাচন থেকে শুরু করে কোনো কর্মকাণ্ডই যখন স্বাধীনভাবে করতে পারছে না, তখন লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির অভিযোগও বার বার আসছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেক সময় ছাত্র বা শিক্ষকসহ পেশাজীবীদের রাজনীতি বন্ধের অভিযোগ জোরালোভাবে তোলা হচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, আদর্শ বাস্তবায়নে মূলদল এবং সহযোগী সংগঠনগুলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবেই কাজ করবে বলে তারা মনে করেন।
‘এখানে আসলে লেজুড়বৃত্তি বলে কিছু নেই। মূল দলকে সহায়তা করাই হচ্ছে সহযোগী সংগঠনের কাজ। কারণ আমরা সবাই একটা আদর্শের অনুসারী। কাজেই একই আদর্শের অনুসারী হলে তখন মূল দল এবং সহযোগী সংগঠন একে অপরের পরিপূরক।’
পরিস্থিতি বদলানো বেশ কঠিন
সহযোগী বা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো যে সবকিছুতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে থাকে, সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা বেশ কঠিন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সহযোগী সংগঠন সম্পর্কিত শর্তগুলো মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগও নিবন্ধিত হয়েছে। এর পর থেকে দলটিই ক্ষমতায় আছে। কিন্তু তারা সেগুলো বাস্তবায়ন না করলে পরিস্থিতি বদলাবে না বলে তিনি মনে করেন।

 


আরো সংবাদ