০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

সুন্দরবনে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরে এলো রামপালের ২১ যুবক

-

গত রোববার থেকে দুবলার চরে রাসমেলা হওয়ার কথা ছিল। মেলায় যোগ দেয়ার আগে সুন্দরবনে ঘুরে তার পর তারা অংশ নিতে গিয়েছিল। কিন্তু কে জানত এ আনন্দযাত্রা তাদের জীবন সংশয়ের কারণ হবে? তবে ভাগ্য ভালো বলতে হবে। ডাকাত ও বাঘের মুখে পড়ে, তিন দিন ক্ষুৎপিপাসার কষ্ট সহ্য করে এবং ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের বাতাস ও বৃষ্টির মধ্যে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় গাছের মাথায় কাটিয়ে তারা মহান আল্লাহর দয়ায় শেষমেশ বেঁচে বাড়ি ফিরতে পেরেছে।
তারা ছিল ২১ জন। সবার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলাধীন গৌরম্ভা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে। দলের সাতজন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বাকিরা বেকার যুবক এবং পেশাজীবী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী সাগরে রাসমেলা দেখার উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে সুন্দরবনে ঢুকে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হিরণ পয়েন্ট সংলগ্ন এলাকার অভয়ারণ্যের একটি খালে অবস্থান নেয়। ভাবনা ছিল দুই দিন পালিয়ে পালিয়ে থেকে পরে মেলা দেখবে। কিন্তু রাত ১০টার দিকে একদল অস্ত্রধারী দস্যু ট্রলার আক্রমণ করে তাদের বেদম মারধর এবং ফাঁকা গুলি বর্ষণ শুরু করে। ঘটনার আকস্মিকতায় এবং ভয় আতঙ্কে তারা ট্রলার ও মালপত্র ফেলে দৌড়ে বনের গভীরে ঢুকে পড়ে। সেখানে তারা গাছের ডালে চড়ে বসে। চলছিল বিরতিহীন বৃষ্টি। রাত গভীর। এমন সময় তারা দেখতে পেল গাছের নিচে বাঘ। একজন বাঘ দেখে ভয়ে অচেতন হয়ে গাছ থেকে পড়ে যায়। ভয়ে বাকিরা শব্দ করতে পারছে না। পড়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখেও বাঘ পাশ কেটে চলে গেল। তারা সবাই ব্যাগ ও মোবাইল ট্রলারে ফেলে এসেছে। একজন পকেট হাতিয়ে একটা মোবাইল পেল এবং ভাগ্যক্রমে সেই সেটে টেলিটকের সিম ছিল। বনের ওই এলাকায় টেলিটকের টাওয়ায় আছে, তবে গাছের মাথায় উঠলে নেটওয়ার্ক মেলে। শুক্রবার সকালে তারা সেটা দিয়ে পরিবারকে পরিস্থিতির কথা জানিয়ে উদ্ধারের আকুতি জানায়।
অভিভাবকরা গৌরম্ভা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে জানায়। তাদের উদ্ধারে বন বিভাগ বা র্যাব ও কোস্টগার্ডের সাহায্য চাওয়ার উপায় ছিল না। কারণ তারা অনুমতি ছাড়াই বনে ঢুকেছিল। অগত্যা চেয়ারম্যান দাকোপের একজন বিশিষ্ট মানুষের সাহায্য চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ তাকে চালনা লঞ্চঘাটে ডেকে নিয়ে গভীর সুন্দরবনে ট্রলার মাঝিসহ ২১ জন যুবককে উদ্ধারে যাওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ করা হয়।
ওই উদ্ধারকারীর সাথে আলাপ হলে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, তখন ঘূর্ণিঝড়ের ৭ নম্বর সিগন্যাল। তিনি বলেন, এ অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করে রাজি হয়ে গেলাম। বিরামহীন বৃষ্টি চলছে। প্রথমে দাকোপ থানার ওসির অনুমতি নিলাম। এরপর বনবিভাগের এসিএফের সহায়তা চাইলাম। তিনি প্রথমে রাজি না হলেও পরে বললেন এই পরিস্থিতিতে রাতে আপনি নলিয়ানে আমার অফিস পর্যন্ত আসেন। রাত ১১টায় চালনা বাজার লঞ্চঘাট থেকে ট্রলার ছাড়লাম। রাত দেড়টায় নলিয়ান পৌঁছে এসিএফকে আর ডাকলাম না। তখন আটকে পড়া ব্যক্তিরা আর্তনাদ করছে আমরা দুই দিন অভুক্ত ও বিনিদ্র অবস্থায় গাছের মাথায়। সময় নষ্ট করলে হয়তো বাঁচব না। এসিএফকে মোবাইলে একটা ম্যাসেজ লিখে চললাম সুন্দরবন মুখে। রাত ২টার পর বনের গভীরে যাওয়ায় সকলেই মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হলাম। নদীতে প্রচণ্ড তুফান, বৃষ্টি আর ঘোর অন্ধকার। ট্রলার দুলছে। আল্লাহকে স্মরণ করলাম। এভাবে টানা সাড়ে ১১ ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে হিরণ পয়েন্ট এলাকায় পরদিন পৌঁছে সকাল সাড়ে ১০টায় ওদের দেখা পেলাম। ওরা এতটাই ক্লান্ত শ্রান্ত যে, কান্নার শক্তিটুকুও নেই। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে টানা ৩৬ ঘণ্টা থাকার পর তাদের ট্রলারে উঠিয়ে বাড়ির অভিমুখে রওয়ানা হলাম।
ট্রলারে তারা জানায়, দুই রাত কাটিয়েছে গাছে। দিনে বৃষ্টির মধ্যে চাপাচাপি বসে গরম থাকার চেষ্টা করেছে। গায়ের গেঞ্জি দিয়ে বৃষ্টির পানি ধরে সবাই ভাগ করে খেয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। এ সময় আট থেকে ১০টা বাঘ তাদের পাশ দিয়ে চলে যায়। উদ্ধারকারী দল আসছে তা জানার পর বনের গভীর থেকে নদীর কিনারা খুঁজে পেতে তারা বাঘ ও হরিণের পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করেছে। তারা ভেবেছিল হয়তো আর জীবিত ফিরতে পারবে না। এখন নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার অনুভূতি তাদের। সাড়ে ৯ ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে শনিবার রাত ৮টায় তারা মংলায় পৌঁছায়।
ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার একান্ত অনুরোধে তাদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে হলো। নাম ও পরিচয় প্রকাশ পেলে বন বিভাগের আইনি ব্যবস্থা নেয়া অপরিহার্য হয়ে পড়বে। তবে সুন্দরবনের বিপদসঙ্কুল পরিবেশে এ রকম অ্যাডভেঞ্চারে বনবিভাগ ও অন্যান্য বাহিনীকে না জানিয়ে যাওয়ার পর বিপদে পড়লে সাহায্য পাওয়ারও যে উপায় থাকে না এ ঘটনা সবাইকে অনুধাবনের সুযোগ করে দেবে আশা করি।


আরো সংবাদ