০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার দায়ে বিশ্ব আদালতে মামলা

-

রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চালানো গণহত্যার অভিযোগ এনে জাতিসঙ্ঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস বা আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। এ বিষয়ে অভিযোগ করে ৪৬ পৃষ্ঠার একটি আবেদনও আন্তর্জাতিক আদালতে জমা দিয়েছে দেশটি।
গতকাল সোমবার দায়ের করা ওই মামলায় গাম্বিয়া অভিযোগ করেছে যে, মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে গণহত্যা, রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করেছে। তারা রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়কে ধ্বংসে কাঠামোবদ্ধ গণহত্যা চালিয়েছে। গাম্বিয়া এই মামলা দেয়ায় প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে কোনো মামলা হলো। গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবুবকর তামবাদাউ তার দেশের পক্ষ থেকে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত ৪ অক্টোবর গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী মিয়ানমারকে আইনের আওতায় আনতে নেদারল্যান্ডসে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ইরাসমাস বিশ^বিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় আবুবকর তামবাদাউ বলেছিলেন, ‘আমরা মামলার সব রকম প্রস্তুতি নিয়েছি। আমি জানি, মিয়ানমারের নাগরিকরা কতটা অসহায় হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়েছে। কক্সবাজার পরিদর্শনকালে তাদের করুণ দশা শুনেছি। রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের জন্য মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক মহলের জবাবদিহি করতেই হবে।’
গাম্বিয়া ও মিয়ানমার দুই দেশেই ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ যেটি শুধু দেশগুলোতে গণহত্যা থেকে বিরত থাকা নয়, বরং এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধের জন্য বিচার করতে বাধ্য করে। জাতিসঙ্ঘ বলে আসছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনা অভিযানে গণহত্যার উপাদান ছিল। এ ছাড়া কানাডা, নাইজেরিয়া, তুরস্ক ও ফ্রান্সসহ আরো কয়েকটি দেশ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ করে আসছে।
বিশেষ করে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিয়ে একাধিকবার রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে কথা বলেছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম নেতা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। এ ছাড়া ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সদস্যভুক্ত ৫৭টি দেশকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করতে উৎসাহিত করেছিল।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক রিপোর্টে এ মামলার বিষয়টি জানিয়ে বলা হয়েছে, ৪৬ পৃষ্ঠা সম্বলিত মামলার আবেদন এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জমা দিয়েছে গাম্বিয়া। সংস্থাটির অ্যাসোসিয়েট ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস ডিরেক্টর পরম প্রীত সিংহ বলছেন, ‘গাম্বিয়ার আইনি পদক্ষেপ বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতে একটি আইনি প্রক্রিয়ার সূচনা করল যেটা প্রমাণ করতে পারে যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের নিষ্ঠুরতা জেনোসাইড কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে।’
মূলত জেনোসাইড কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলাটি হয়েছে বলে ১০টি বেসরকারি সংস্থার এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। যেসব বেসরকারি সংস্থা এ উদ্যোগকে সমর্থন করছে তাদের মধ্যে আছে নো পিচ উইদাউট জাস্টিস, ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস, দি ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস, গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টারে ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে প্রথম জেনোসাইড কনভেনশন মামলা হয়েছিল সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৯৩ সালে এবং তাতে প্রমাণ হয়েছিল যে সার্বিয়া, বসনিয়া, হার্জেগোভিনিয়ায় গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছিল।
আইসিজে জাতিসঙ্ঘের প্রধান বিচারিক অঙ্গ; ১৯৪৫ সালে গঠনের পরের বছর থেকে এই আদালত কার্যকর। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কিছু স্থাপনায় ‘বিদ্রোহীদের’ হামলার পর রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে শুরু হয় সেনাবাহিনীর অভিযান। সেই সাথে শুরু হয় বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে রোহিঙ্গাদের ঢল। গত দুই বছরে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন। তাদের কথায় উঠে আসে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ, যাকে জাতিগত নির্মূল অভিযান বলে জাতিসঙ্ঘ।
যদি আইসিজে মামলাটি বিচারের জন্য গ্রহণ করে, তবে এটিই হবে গণহত্যার নিজস্ব তদন্তে আইসিজের প্রথম উদ্যোগ। এর আগে তদন্তের ক্ষেত্রে তারা অন্য সংস্থার ওপর নির্ভর করত। আইসিজের বিধি অনুসারে, জাতিসঙ্ঘের সদস্যভুক্ত এক দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে আ্ন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগ তুলতে পারে। গণহত্যা প্রতিরোধ ও এর শাস্তি বিধানে ১৯৮৪ সালে স্বাক্ষরিত কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে। ১৯৫৬ সালে ওই ‘জেনোসাইড কনভেনশনে’ সই করে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য মিয়ানমারকে বিচারের আওতায় আনতে যে ১০টি সংগঠন গাম্বিয়াকে সহায়তা করছে, তাদের একটি হলো হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির পরিচালক পরম-প্রীত সিং এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গাম্বিয়ার এই আইনি পদক্ষেপের ফলে বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হল। এখন আদালত রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচাতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিতে পারে।’
১৯৯৩ সালে বসনিয়ায় গণহত্যার বিচারের শুরুতে আইসিজে সার্বিয়ার বিষয়ে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিয়েছিল। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে গাম্বিয়ার পদক্ষেপে সহায়তা দিতে অন্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ‘নো পিস উইদাউট জাস্টিস’র পরিচালক অ্যালিমস স্মিথ, যে সংগঠনটিও এ কাজে এইচআরডব্লিউর মতো সহায়তা দিচ্ছে।
জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার অভিযোগ অস্বীকার করে মিয়ানমার বলে আসছে, তাদের ওই লড়াই ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে, কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে নয়। তবে জাতিসঙ্ঘ গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বলেছে, রাখাইনে গণহত্যা ঠেকাতে, এতে জড়িতদের বিচার করতে মিয়ানমার সরকার কিছুই করেনি। সেখানে যেভাবে তা ঘটানো হয়েছে, মাত্রা, ধরন এবং বিস্তৃতির দিক দিয়ে সেটা ‘গণহত্যার অভিপ্রায়কে’ অন্য কিছু হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টার সমতুল্য। রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ-নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বলেছে, সাতটি ঘটনার মধ্যে এটাও একটা, যা প্রমাণ করে রোহিঙ্গা জাতিগতভাবে নির্মূল করাই ছিল মিয়ানমারের সেনা অভিযানের উদ্দেশ্য।

 


আরো সংবাদ