১২ ডিসেম্বর ২০১৯

বুলবুলে উপকূলের ৮ জেলা লণ্ডভণ্ড

২৪ জনের প্রাণহানি : সম্পদের বিস্তর ক্ষতি
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে পায়রা নদীর বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে লোকালয়ে (বাঁয়ে); পিরোজপুরে বিধ্বস্ত পত্তাশী জনকল্যাণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি টিনশেড ভবন : নয়া দিগন্ত -

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে দেশের উপক‚লীয় এলাকা বিশেষ করে বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ল²ীপুর, ভোলা, খুলনা, গোপালগঞ্জ লন্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে। এসব জেলায় জানমাল ও সম্পদের বিস্তর ক্ষতি হয়েছে। যতখানি আশঙ্কা করা হয়েছিল মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে ক্ষতির মাত্রা ততখানি না হলেও যতটুকু হয়েছে তার পরিমাণ নেহাত কম নয়। বুলবুলের আঘাতে অবকাঠামো লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ায় উপক‚লবর্তী অনেক জনপদ এখন বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারে রয়েছে। ফলে সেখানকার জনজীবনে নেমে এসেছে সীমাহীন দুর্ভোগ। বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে দেখা দিয়েছে বন্যা। সেখানকার মানুষ হয়ে পড়ে পানিবন্দী। এছাড়া শত শত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ায় মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। অজস্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৪ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
বরিশাল ব্যুরো জানায়, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে বরিশালের প্রতিটি উপজেলার কাঁচা ঘরবাড়ি, গাছপালা, আমন ক্ষেত, বিদ্যুত লাইন ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উজিরপুর উপজেলার দক্ষিণ মাদার্শী গ্রামে আশালতা মজুমদার (৬৫) নামের এক বৃদ্ধা নিজ বসতঘরের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছেন। এছাড়া বিভাগের চার জেলায় আরো পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পল্লী বিদ্যুতের।
এ ছাড়াও বরিশালের বেশির ভাগ উপজেলার প্রায় দুই শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক সহস্রাধিক গাছপালা উপড়ে পড়েছে। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাকা ও আধাপাকা আমন ক্ষেত এবং পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুতের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, রোববারের ঘূর্ণিঝড়ে তাদের বেশির ভাগ এলাকার লাইনের তারের ওপর গাছ উপড়ে পড়ে তার ছিঁড়ে গেছে। এতে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রোববার সকাল থেকে পল্লী বিদ্যুতের পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া অধিক বৃষ্টির কারণে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বেশির ভাগ এলাকার মাছের ঘের ও পুকুর ডুবে মাছ বের হয়ে গেছে। অপর দিকে আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রায় চার শ’ বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু গবাদি পশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
উজিরপুর (বরিশাল) সংবাদদাতা জানায়, উজিরপুর উপজেলার হারতা, জল্লা, শোলক, সাতলা, বড়াকোঠা,ওটরা ও গুঠিয়া ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকার কমপক্ষে ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি তছনছ হয়েছে। ভেসে গেছে শত শত হেক্টর জমির ফসল ও মাছের ঘের। রাস্তায় গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি-তার পড়ে উপজেলার সর্বত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গাছপালার সাথে পাল্লা দিয়ে গোটা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে উপড়ে পড়েছে পল্লী বিদ্যুতের প্রায় দেড় শতাধিক খুঁটি।
কালিরবাজার-উপজেলা চলাচলের একমাত্র রাস্তা, পৌর সদরের ৬নং ওয়ার্ডের সিকদার পাড়া, ৭নং ওয়ার্ডের হানুয়া বারপাইকা গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া পৌর সদরের সবগুলো রাস্তায় গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে রয়েছে। কয়েক হাজার পানের বরজ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে হারতা ইউনিয়নে। কারণ এটি কৃষিপ্রধান এলাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এলাকার প্রান্তিক কৃষকরা। চলতি মওসুমে আবাদকৃত বিভিন্ন শীতকালীন সবজিসহ শত শত পানের বরজ বুলবুলের আঘাতে নষ্ট হয়ে গেছে। এই ইউনিয়নের পূর্ব হারতা, নাথারকান্দি, দক্ষিণ নাথারকান্দি, কালবিলা, মধ্য হারতা, দক্ষিণ হারতা, কুচিয়ারপাড়সহ প্রায় সব গ্রামের কমপক্ষে দেড় শতাধিক টিনের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। রাস্তায় গাছপালা ও অর্ধশত বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে গ্রায় ৩০টি পোলট্রি মুরগির খামার। ভেসে গেছে এসব এলাকার শতাধিক মাছের ঘের।
পটুয়াখালী সংবাদদাতা জানান, পটুয়াখালী জেলায় তিনজনের মৃত্যু ও ২,৮১০টি ঘরবাড়ি, ২ লাখ ১ হাজার ৩০০টি গাছ বিধ্বস্ত এবং বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে ২৮.৫০ হেক্টর জমির রোপা আমন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। মৃতদের মধ্যে কলাপাড়ায় দুজন এবং মির্জাগঞ্জে একজন । কলাপাড়ায় আশ্রয় কেন্দ্রে মারা যান সুফিয়া নামের এক বৃদ্ধ নারী এবং মাছ ধরা ট্রলার থেকে সমুদ্রে পড়ে মারা যান বেল্লাল হোসেন নামের এক জেলে এবং গত শনিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে মির্জাগঞ্জ উপজেলার উত্তর রামপুর গ্রামে মো: হামেদ ফকির (৬৫) ঘর চাপা পড়ে মারা গেছেন।
এদিকে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় এক জেলে ও এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার রাতে পূর্বধানখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয় কেন্দ্রে মোসা: সুফিয়া বেগম (৬৫) নামের এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়। এছাড়া গত শুক্রবার সকাল ৭টায় গভীর সমুদ্র থেকে ট্রলার নিয়ে ফেরার পথে ঢেউয়ের তোরে পরে গিয়ে বেলাল (৪০) নামের এক জেলের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে দুই থেকে তিন ফুট উচ্চতার জোয়ারে উপজেলার ১০টি গ্রাম ও চরাঞ্চল প্লাাবিত হয়েছে। এছাড়া পূর্বের বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করে ১৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। উপজেলায় ৫ হাজার ১২০ হেক্টর জমির আমন ও সবজির ক্ষতি হয়েছে। পৌরশহরসহ উপজেলায় চারটি বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে শনিবার রাত ১১টার দিকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের ভাঙা বেড়িবাঁধ থেকে জোয়ারের পানি ঢুকে পাঁচটি গ্রামের অন্তত শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়েছে।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত ও ঘরের উপরে গাছের চাপা পড়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। গত রোববার সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলে একটানা বৃষ্টি আর দমকা ঝড়ো হাওয়া। এতে উপজেলার ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও একটি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়সহ চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে উপজেলার ৫ সহস্্রাধিক ছোট বড় গাছ উপড়ে পড়েছে। এ ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রয়েছে। জানা যায়, উপজেলার উত্তর রামপুর গ্রামে গত শনিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে মোহাম্মদ হামেদ ফকির ৬৫ নামে এক বৃদ্ধের ঘরের উপর একটি রেন্ট্রি গাছ চাপা পড়ে তিনি মারা গেছেন।
দুমকি (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, পটুয়াখালীর দুমকিতে অন্তত অর্ধশতাধিক কাঁচা ঘর-বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত, অসংখ্য গাছপালা, আমন ও রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
উপজেলা শহরের পীরতলা বাজারসংলগ্ন মৃধা বাড়িতে বিশাল কড়াই গাছ উপড়ে পড়ে ঘরচাপায় গৃহকর্ত্রী রেহেনা বেগম, কন্যা পারুল বেগম ও নাতনি মিতাসহ অন্তত তিনজন গুরুতর আহত হয়। একই সময় উপজেলার চরগরবদিদ গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবারের বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। পাংগাশিয়া এ বি এন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির আধাপাকা ভবন বিধ্বস্ত হয়েছে। উপজেলার শ্রীরামপুর, লেবুখালী, পাংগাশিয়া, মুরাদিয়া, আংগারিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গাছপালা ও পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে, হেলে পড়ায় অন্তত ৩৭টি স্পটে তার ছিঁড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া চলতি মওসুমের আমন ও রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বরগুনা সংবাদদাতা জানান, বরগুনায় গত শনিবার সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত প্রবল ঝড়ো হাওয়ায় বরগুনা, বামনা, বেতাগী, পাথরঘাটা, আমতলী ও তালতলীতে আট শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে, হাজার হাজার গাছপালা উপরে গেছে, বেড়িবাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, অগণিত বিদ্যুদের খুঁটি ভেঙে পড়ে বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারে পুরো জেলা। মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ৩৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। বরগুনার একটি আশ্রয়ন কেন্দ্রে হালিমা খাতুন নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার রাতে তার মৃত্যু হয়। হালিমা খাতুন সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের ডি এল কলেজ আশ্রয়ন কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
পিরোজপুর সংবাদদাতা জানান, পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় সহস্রাধিক গাছপালা পড়ে পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। রোপা আমন এবং রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জাওয়াদ আব্দুল্লাহ (৪ বছর) নামের এক শিশু বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। সে গৌরিপুর ইউনিয়নের পৈকখালী গ্রামের শিক্ষক মশিউর রহমানের ছেলে। এদিকে ঘরের মধ্যে চাপা পড়ে কমপক্ষে ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
ইন্দুরকানীতে বুলবুলের আঘাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ৮ শতাধিক বাড়িঘর বিধ্বস্ত গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি এবং শিশুসহ ১০ জন আহত হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ লাইনের উপর গাছ পড়ে তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্নসহ সড়কে গাছ পড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে ৮ শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, হাজার হাজার গাছপালা ভেঙে গেছে, এছাড়া বিদ্যুৎ লাইনের উপর গাছ পড়ে তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ঝড়ে উপজেলার দীঘিরপাড়র জামেয়া ইসলামিয়া আলিম মাদরাসার একটি টিনসেড ভবন বিধ্বস্ত হয়েছে। গাছ পড়ে পত্তাশী জনকল্যাণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ভবানীপুর বিজিএস দাখিল মহিলা মাদরাসা বিধ্বস্ত হয়ে যায় এবং উত্তর-পশ্চিম কলারণ আজাহার আলী দাখিল মাদরাসা, পত্তামী এস দাখিল মাদরাসা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবজি, ধান ও কলাক্ষেত এবং মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ভোলা সংবাদদাতা জানান, ভোলায় মেঘনা নদীতে ২৪ জেলে নিয়ে একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে মোরশেদ নামের এক জেলে নিহত হয়েছে। গত রোববার বিকেলের দিকে ভোলা-বরিশাল মেঘনা নদীর সীমান্তবর্তী এলাকার রোকনদীতে ট্রলার ডুবির এ ঘটনা ঘটে। পরে কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের সদস্য মোরশেদের লাশ উদ্ধার করে এবং আরো ১৩ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১০ জেলে।
খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনায় দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। কয়েক হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত এবং ৭৪০টি ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গাছপালা উপড়ে পড়ে ও বিভিন্ন স্থানে খুঁটি ভেঙে পড়ায় অনেক এলাকা বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে।
দাকোপ উপজেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য মতে, গত রোববার সকাল ৯টার দক্ষিণ দাকোপ গ্রামের সুভাষ মণ্ডলের স্ত্রী প্রমিলা মণ্ডল (৫২) রান্নাঘরে গাছ চাপা পড়ে মারা যান। অন্য দিকে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামে রোববার সকালে গাছ চাপা পড়ে আলমগীর হোসেন (৩৫) নিহত হন বলে দিঘলিয়া থানার ওসি জানান।
গোপালগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, গোপালগঞ্জে শিশুসহ তিনজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া জেলার পাঁচটি উপজেলাতেই বোরোধানসহ রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভেঙেছে অসংখ্য গাছপালা, কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি, উপড়ে গেছে বৈদ্যুতিক খুঁটি। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কসহ জেলার অভ্যন্তরীণ প্রায় সব রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চরম ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ।
গত রোববার গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার খাটিয়াগড় গ্রামের মৃত বাবন কাজীর বাড়িতে তার স্ত্রী মাজু বেগম (৮৫) রান্নারের উপর গাছ ভেঙে পড়ে। গাছের নিচে চাপা পড়ে মারা যান তিনি। কোটালীপাড়া উপজেলার বান্ধাবাড়ি গ্রামে রাস্তার গাছ পড়ে সেকেল হাওলাদার (৭৫) নামের এক বৃদ্ধ নিহত হন। এ ছাড়াও সোমবার সকালে ঝড়ে ভেঙে যাওয়া গাছের ডাল পড়ে একই উপজেলার কান্দি গ্রামের সুখরঞ্জন বৈদ্যের মেয়ে সাথী বৈদ্যের (৬) মৃত্যু হয়।
সাতক্ষীরা সংবাদদাতা জানান, সাতক্ষীরার ৪৭ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে ৫ হাজার ১৭টি মৎস্য ঘের। আংশিক ও সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৫ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ও দুই হাজার হেক্টর জমির সবজি, পান, সরিষা ও কুলসহ অন্যান্য ফসল। ভেঙে পড়েছে অসংখ্যা গাছপালা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২ কিলোমিটার উপক‚লীয় বেড়িবাঁধ। তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে উপক‚লীয় শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও দেবহাটা উপজেলা। ১৭ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩০ হাজার ঘরবাড়ি। এ ছাড়াও ৫ হাজার ১৭টি মৎস্য ঘের এবং ১৫ হাজার হেক্টর জমির আমন সম্পূর্ণ ও ১০ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ধান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই হাজার হেক্টর জমির সবজি, পান, সরিষা ও কুলসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে উপড়ে ও ভেঙে পড়েছে অসংখ্যা গাছগাছালি। রাস্তায় গাছ পড়ে অনেক স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের পর সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজের পাশাপাশি দ্রæত সড়কের গাছ সরিয়ে সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু করে।
তালা (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এলাকার প্রায় ৫ হাজার বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে, উপড়ে পড়েছে হাজার হাজার গাছ। শত শত হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তলিয়ে গেছে কয়েক শত মৎস্য ঘের। রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ খুঁটি উপড়ে পড়ায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গোটা এলাকা। দিশেহারা হয়ে পড়েছে এলাকার মানুষ। প্রায় ২১ হাজার লোক এ তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শরীয়তপুর সংবাদদাতা জানান, শরীয়তপুর জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের আঘাতে ঘরের উপর গাছ পড়ে ঘরের নিচে চাপা পড়ে নড়িয়া ও ডামুড্যায় দু’জন নিহত হয়েছে। ওই সময় ঝড়ে ৫ শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ও শত শত গাছপালা বিধবস্ত ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে ও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা কার্যালয় সূত্র ও নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, ঝড়ের আঘাতে ঘরের উপর গাছ পড়ে ঘরের নিচে চাপা পড়ে নড়িয়া উপজেলার ইউনিয়নের দেওজুড়ি গ্রামের আলী বক্স ছৈয়াল (৬৫) ও ডামুড্যা উপজেলার বড় সিধলকুড়া গ্রামের আজগর ঘরামির স্ত্রী আলেয়া বেগম (৩৮) ঘরের উপর গাছ পড়ে ঘরের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। এ সময় তারই স্বামী আজগর ঘরামি, আতাউর রহমান, মিজানুর রহমান গুরুতর আহত হয়েছেন।
ল²ীপুর সংবাদদাতা জানান, ল²ীপুরের কমলনগর ও রামগতিতে শতাধিক বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এ সময় গাছ ও ঘরের নিচে চাপা পড়ে আহত হয়েছেন নারীসহ অন্তত ১২ জন। গত রোববার সকালে আঘাত হানা এ ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে উঠতি আমন ধানসহ শীতকালীন শাকসবজির। এ ছাড়াও ঘরচাপা পড়ে এবং ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে মেঘনার জোয়ারের পানিতে ডুবে ৩৭৬টি গবাদিপশু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কমলনগর ও রামগতি উপজেলার মেঘনা তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় আঘাত হানে। শতাধিক বসতঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। চর আবদুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়সহ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুই শতাধিক কাঁচাঘর। উপড়ে পড়ে অসংখ্য গাছপালা। এ সময় গাছ ও ঘরের নিচে চাপা পড়ে রামগতি উপজেলার চেয়ারম্যান বাজার এলাকার মো: জসিম, মো: আলাউদ্দিন, রহিমা বেগম ও দুলাল মোল্লাসহ অন্তত ১২ জন আহত হন।
সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায় নৌকা ডুবিতে সুন্দরপুর হাওরের বাবুল মিয়া (৩৬) নামে এক প্রহরী নিহত হয়েছেন। সোমবার ভোর রাতে উপজেলার সুন্দরপুর হাওরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত বাবুল মিয়া উপজেলার উত্তর কাংলাবাজার গ্রামের বাসিন্দা।


আরো সংবাদ