১০ ডিসেম্বর ২০১৯

আবরারকে টর্চার সেলে নেয়ার আগে পরপর দুই দিন বৈঠক করা হয় আবরার হত্যা

-

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষের টর্চার সেলে ডেকে নেয়ার আগে পরপর দুই দিন বৈঠক করা হয়। প্রথম দিনের বৈঠকে আবরার কী করে, কোথায় যায়, তার কাছে কেউ আসে কি নাÑ এসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে বলা হয়। পরের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আবরারকে ধরতে হবে, তাকে চেক করে শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে মেরে হল থেকে বের করে দিতে হবে। গত বুধবার আদালতে দাখিল করা আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। অবশ্য ওই দিন (বুধবার) এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছিলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডে একক কোনো কারণ খুঁজে পায়নি পুলিশ। আসামিদের ভাষ্যমতে আবরার ফাহাদ দেখা হলে বড়দের সালাম দিত না। বিভিন্ন তির্যক মন্তব্য করত। আগে থেকেই তারা নানা কারণে আবরার ফাহাদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। অনেকগুলো বিষয়ের সমষ্টিতেই আবরার ফাহাদকে পেটানো হয়। এ ছাড়াও একজনকে মেরে অন্যজনকে শিক্ষা দিতে কিংবা জুনিয়রদের মধ্যে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে তারা দীর্ঘ দিন ধরে র্যাগিংয়ের নামে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। যার আচরণ অপছন্দ হতো তাকেই ডেকে এনে নানা নির্যাতন করা হতো।
আবরার হত্যা মামলায় দেয়া অভিযোগপত্র সূত্রে জানা গেছে, আবরারকে হত্যার আগে গত ৪ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় শেরেবাংলা হলের ক্যান্টিনে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরের দিন ৫ অক্টোবর শনিবার রাত ১০টায় হলের গেস্ট রুমে আরেকটি বৈঠক হয়। দুই বৈঠকে ছাত্রলীগের ১৭ জন নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করে। বুয়েট ছাত্রলীগ শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিনের নেতৃত্বে প্রথম বৈঠকটি হয়। দু’টি বৈঠকেই অংশ নিয়েছিলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-দফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ ও উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহা। অভিযোগপত্রে বৈঠকের বিষয়ে বলা হয়েছে, ৪ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ক্যান্টিনে একটি বৈঠক হয়। এই বৈঠকের নেতৃত্ব দেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন। আবরার ফাহাদের ওপর নজর রাখতে বলা হয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। সে কী করে, কোথায় যায়, তার কাছে কেউ আসে কি নাÑ এসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে বলা হয়। প্রথম বৈঠকে আটজন অংশগ্রহণ করেছিলেন। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেনÑ বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহা, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না এবং উপ-দফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সদস্য খন্দকার তাবাক্কারুল ইসলাম ওরফে তানভীর ও আকাশ হোসেন। আবরার হত্যার পর ছাত্রলীগ থেকে সবাইকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া পরের দিন শেরেবাংলা হলের গেস্ট রুমে আরো একটি বৈঠক করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। রাত ১০টার দিকের এই বৈঠকে ১২ জন অংশ নেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈঠকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নেনÑ আবরার ফাহাদকে ধরতে হবে, তাকে চেক করে শিবিরের রাজনীতির সাথে সস্পৃক্ততা পাওয়া গেলে মেরে হল থেকে বের করে দিতে হবে। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনিরের নেতৃত্বে ওই বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেনÑ উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-দফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহা, সদস্য আকাশ হোসেন, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, সামছুল আরেফিন রাফাত, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মুহাম্মদ মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল ওরফে জিসান, মুনতাসির আল জেমি, মো: মোর্শেদ ওরফে মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম ও মো: সাদাত ওরফে এ এস এম নাজমুস সাদাত।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, চার্জশিট আদালতে পাঠানো হয়েছে। তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, এ হত্যাকাণ্ডে এজাহারভুক্ত ১৯ জনের বাইরে ঘটনার তথ্যপ্রমাণে আরো ছয়জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এজাহারভুক্ত ১৯ জনের মধ্যে ১৬ জন এবং এজাহারবহির্ভূত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আবরার ফাহাদকে মারধরের সাথে সরাসরি ১১ জন জড়িত ছিলেন। অন্যরা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ঘটনার পরিকল্পনা এবং নির্দেশনার সাথে কোনো-না-কোনোভাবে সম্পৃক্ত।
উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হল থেকে ১৭তম ব্যাচের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরারকে সে দিন সন্ধ্যার পর ওই হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে নির্যাতনের পর দোতলা ও নিচতলার সিঁড়ির মাঝামাঝি জায়গায় তাকে অচেতন অবস্থায় ফেলে যায় কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী। ভোরে চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন নিহতের বাবা মো: বরকত উল্লাহ বাদি হয়ে ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তদন্তে নেমে পুলিশ এজাহারের ১৬ জনসহ মোট ২১ জনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। তারা সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর তাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার পর আন্দোলনে নেমে ১০ দফা দাবি তোলেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবির সাথে বুয়েট শিক্ষক সমিতি ও সাবেক শিক্ষার্থীরাও সমর্থন প্রকাশ করেন। তাদের দাবির মুখে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ, আবরার হত্যার আসামিদের সাময়িক বহিষ্কার এবং হলগুলোতে নির্যাতন বন্ধে নানা পদক্ষেপ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আন্দোলন শিথিল করে ১৪ অক্টোবর ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার সুযোগ দিয়ে মাঠের আন্দোলনে ইতি টানলেও হত্যাকারীদের স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। গত ১৯ অক্টোবর থেকে বুয়েটের টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও আন্দোলনের কারণে তা এখনো হয়নি। পরীক্ষা শুরুর জন্য বুয়েট কর্তৃপক্ষ নিজেদের তদন্ত এবং পুলিশের অভিযোগপত্রের জন্য অপেক্ষার কথা জানিয়েছিল।

 


আরো সংবাদ