১১ ডিসেম্বর ২০১৯

চট্টগ্রামে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে নিহত ৭

চট্টগ্রাম নগরীর ব্রিকফিল্ড রোডে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে লণ্ডভণ্ড কুঞ্জমনি ভবন; ইনসেটে মর্গে নিহতদের লাশ : নয়া দিগন্ত -

চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটায় একটি পাঁচতলা ভবনে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণে সাতজন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছেন। গতকাল রোববার সকাল ৯টার দিকে কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের ধনা বড়–য়ার পাঁচতলা কুঞ্জমনি ভবনে এ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে পাঁচতলা ভবনের নিচতলা এবং ভবনের একাংশের দেয়াল ধসে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। হতাহতদের বেশির ভাগই পথচারী। আহতদের মধ্যে ১২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। তবে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহম্মদ মজুমদার গ্যাস লাইনে কোনো বিস্ফোরণ ঘটেনি বলে দাবি করেছেন। এ দিকে এ বিস্ফোরণের ঘটনায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেনÑ কক্সবাজারের উখিয়ার নুরুল ইসলাম (৩১), পটিয়ার মেহের আটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়ুয়া (৪০), রাঙ্গুনিয়ার কাজল নাথের মেয়ে কৃষ্ণকুমারী স্কুলের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী অর্পিতা নাথ (১৬), নতুন ব্রিজ এলাকার শ্রমিক নুরুল ইসলাম (৩০), ভ্যানচালক মোহাম্মদ সেলিম (৪০), পাথরঘাটার জুলেখা খানম ফরজানা (৩০) ও তার ছেলে আতিকুর রহমান (৮)। নিহত অ্যানি বড়ুয়ার স্বামী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী পলাশ বড়ুয়া জানান, ভবনের নিচতলায় বিস্ফোরণের সময় ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন অ্যানি। বিস্ফোরণে ধসে পড়া দেয়ালের একটি অংশ তার শরীরে এসে পড়ে। আহতাবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক হাসান শাহারিয়ার কবির মেডিক্যাল কলেজ পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, আহত হয়ে মোট ১৭ জন হাসপাতালে এসেছিলেন। তার মধ্যে মারা গেছেন সাতজন। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন দুই নারী, চার পুরুষ ও এক শিশু। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১০ জন। ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে পাঁচজন, বার্ন ইউনিটে দু’জন, নিউরোলজিতে একজন, অর্থোপেডিক বিভাগে একজন ও কার্ডিওলজি বিভাগে একজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চমেক বার্ন ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা: নারায়ণ চন্দ্র ধর নয়া দিগন্তকে জানান, আহত অবস্থায় ১৭ জনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও ক্যাজুয়ালিটি ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অর্পিতা নাথের (১৫) অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। তার শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। শ্বাসনালীতেও সংক্রমণ হয়েছে। তার অবস্থা গুরুতর। তাকে বিকেলে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। একই বাড়ির সন্ধ্যা রানী নাথ (৪০) ভর্তি আছেন ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে। তার অবস্থাও সঙ্কটাপন্ন।
বিস্ফোরণের ঘটনার ঘরের গৃহিণী সন্ধ্যা নাথ (৪০) বলেন, সকালে পূজার ঘরে গিয়ে মোমবাতি ধরাতে ম্যাচের কাঠি জ্বালানোর সাথে সাথে বিস্ফোরণ হয়। কিভাবে কী হয়েছে বুঝতেও পারিনি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন পাথরঘাটা সেন্ট জোন্সেফ স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা ডরিন তৃষা গোমেজ (২৩)। তার অবস্থাও সঙ্কটাপন্ন। তিনি পেটে মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। তাকে ক্যাজুয়ালিটি ইউনিট থেকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ইউসুফ (৪০), ইসমাইল (৩০), আবদুল হামিদ (৪২), নজির আহমদ ও আরিফ (২৪) নামের রিকশা আরোহী আহত হয়েছেন। তাদের মাথায় আঘাত লেগেছে।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ মো: আবদুর রউফ বলেন, আহতদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে ওই বাসায় কোনোভাবে গ্যাস জমে ছিল। সে কারণেই বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গ্যাস লাইনের ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ঢাকায় সাংবাদিকদের জানালেও গতকাল রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) জিএম (মার্কেটিং) আ ন ম সালেক সাংবাদিকদের বলেন, গ্যাস লাইনে ত্রুটি থাকার কোনো প্রমাণ তারা পাননি।
ধন বড়ুয়া ভবনের পাশের বাড়ির বাসিন্দা জেসমিন আক্তার মলি জানান, ‘সকাল পৌনে ৯টা থেকে ৯টার মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটে। আমরা বিকট শব্দ শুনতে পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। নিচে এসে দেখি বড়ুয়া ভবনের নিচতলা বিধ্বস্ত হয়েছে। আশপাশে ভাঙা আসবাবপত্র ও কাচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। সেখানে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আমার ভাই আ: হানিফকে দেখতে পাই।
৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইসমাইল বালি নয়া দিগন্তকে বলেন, বড়ুয়া বিল্ডিংয়ে যখন বিস্ফোরণ ঘটে, তখন ১৬ ফুট চওড়া ওই রাস্তায় অনেক মানুষ আর রিকশা ছিল। বিস্ফোরণের পর ভবনের সীমানা প্রাচীর ভেঙে রাস্তায় মানুষের ওপর পড়ে। আমরা পিকআপ ভ্যানে করে বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে পাঠিয়েছি, তাদের মধ্যে পথচারীও ছিল।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক জসীম উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, খবর পেয়ে নন্দনকানন, চন্দনপুরা ও আগ্রাবাদ তিন স্টেশনের ১০ গাড়ি উদ্ধারকাজ শুরু করে। গ্যাস লাইন পুরনো ছিল। পুরো বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। বিস্ফোরণে দু’টি আবাসিক ভবনের প্রাচীর ও সড়কের সীমানা প্রাচীর ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের দোতলা পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছি।
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহম্মদ মজুমদার নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, কোম্পানির জিএমের (প্রকৌশল) নেত্বত্বে আমাদের একটি তদন্ত টিম সরেজমিন পাইপ লাইন পরিদর্শন শেষে নিশ্চিত হয়েছে, দুর্ঘটনাস্থলে গ্যাসের পাইপ লাইনে কোনো বিস্ফোরণ দূরের কথা, আঁচড়ও পড়েনি। তিনি জানান, ভবনের নিচে একটি স্যুয়ারেজ ট্যাংক রয়েছে। সেখানে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে, তবে ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
দুই তদন্ত কমিটি : গ্যাসলাইনের বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে সাতজন নিহত হওয়ার ঘটনায় গঠন করা হয়েছে দু’টি তদন্ত কমিটি। এর একটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং অন্যটি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এজেড এম শরীফ হোসেনকে প্রধান করে জেলা প্রশাসনের গঠিত কমিটির অন্য চার সদস্য হলেন ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রতিনিধি এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর। সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে এ কমিটিকে।
অন্য দিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের কমিটি। নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) মেহেদি হাসানকে প্রধান করে গঠিত কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মঞ্জুর মোর্শেদ ও কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা।
এ দিকে বিস্ফোরণের খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে ছুটে যান চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে প্রদানের এবং লাশ পরিবহনের ব্যয়নির্বাহের আশ্বাস দেন। এ ছাড়া আহতদের চিকিৎসা দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ভবনটি বিধি অনুযায়ী হয়নি : সিডিএ
বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি সিডিএ’র নিয়ম ও বিধি মোতাবেক নির্মাণ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন সিডিএ’র প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলাম খান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রথম দর্শনেই বলা যায় ভবনটি বিধি অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। অবৈধভাবে সড়কের জায়গা দখল করে ভবনের সামনের অংশ বাড়ানো হয়েছে। তা ছাড়া বিপজ্জনকভাবে সড়কের পাশে সেপটিক ট্যাংক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, যথার্থ ডিজাইন না হলে সেপটিক ট্যাংকে গ্যাস জমে। সেপটিক ট্যাংকের পাশে কিচেন, গ্যাসের রাইজার। ভবন নির্মাণের সময় সিডিএ নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। কিন্তু ভবন মালিকরা নকশা না মানায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে তিনি জানান।
নিহতদের পরিবারকে ডা: শাহাদাতের অনুদান : চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ডা: শাহাদাৎ হোসেন পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। তিনি নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে তাৎক্ষণিক ১০ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করেন। আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন ও আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেন।
এ সময় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ইয়াছিন চৌধুরী লিটনসহ দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।


আরো সংবাদ