১০ ডিসেম্বর ২০১৯

দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস চলাচল বন্ধ : যাত্রী ভোগান্তি চরমে

-

দেশের ১০ জেলার সাথে চুয়াডাঙ্গায়ও যাত্রীবাহী বাস ধর্মঘট চলছে। এছাড়া নওগাঁ, ধামইরহাট, জয়পুরহাট রুটে, সরাইল-যশোর, নড়াইল-খুলনা রুটে এবং খুলনা থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর ফলে সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তি হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন করার প্রতিবাদে ১০ জেলার সাথে চুয়াডাঙ্গায়ও যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন শ্রমিকরা। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গতকাল সকাল থেকে এ ধর্মঘট পালন করছেন তারা। হঠাৎ এ ধর্মঘটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ও দূরপাল্লার যাত্রীরা। সকাল ১০টার পর থেকে ঢাকা-চুয়াডাঙ্গা রুটের বাস চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে বলে স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন। ফলে সকাল থেকে অনেকেই টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ড, কাউন্টারগুলোতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে বাস না পেয়ে ফিরে গেছেন।
জানা যায়, নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নের প্রতিবাদে যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার পরিবহন শ্রমিকরা সকাল থেকে স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি পালন করছেন।
এ প্রসঙ্গে খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের প্রতিবাদে শ্রমিকরা বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। নতুন পরিবহন আইনে কোনো কারণে দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে চালকদের মৃত্যুদণ্ড এবং আহত হলে পঁঅচ লাখ টাকা দিতে হবে। এত টাকা দেয়ার সামর্থ্য শ্রমিকদের নেই। তাই শ্রমিকদের পক্ষ থেকে তিনি নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের পর তা কার্যকর করার দাবি জানান।
চুয়াডাঙ্গা জেলা বাস-ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এম. জেনারেল ইসলাম বলেন, শ্রমিকরা কাউকে ইচ্ছা করে হত্যা করে না। অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার জন্য নতুন সড়ক আইনে তাদের ঘাতক বলা হচ্ছে। নতুন আইনের অনেক ধারার ব্যাপারে শ্রমিকদের আপত্তি রয়েছে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে সংশোধন করতে হবে। তিনি জানান, সরকার সমাধানের কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। ধর্মঘট চলতে পারে অনির্দিষ্টকালের জন্য।
চুয়াডাঙ্গা-যশোর, চুয়াডাঙ্গা-কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর-ঝিনাইদহসহ অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে কোনো যাত্রীবাহী বাস চলাচল না করলেও স্বাভাবিক রয়েছে ট্রেন চলাচল। এ কারণে চুয়াডাঙ্গা, দর্শনা, আলমডাঙ্গাসহ অন্য স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়েছে।
এ ছাড়া প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, ইজিবাইক, নসিমন-করিমন ছাড়াও ছোট যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। সড়কে কমেছে মোটরসাইকেলের সংখ্যাও।
রোজনুজ্জামান রোকন নামের এক যাত্রী বলেন, কুষ্টিয়া থেকে পরিবার নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় এসেছিলাম রাতে। সকালে ফেরার পথে শুনি বাস বন্ধ। এ ধর্মঘটের ব্যাপারে আগে থেকে জানলে আজ আর বাসা থেকে বের হতাম না।
খুলনা ব্যুরো জানায়, নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করার প্রতিবাদে শ্রমিকরা খুলনা থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। গতকাল সকাল থেকে এ ধর্মঘট শুরু হয়। ফলে দূর-দূরান্তের যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
পরিবহন শ্রমিকনেতারা বলেন, সড়ক আইনের কয়েকটি ধারায় সংশোধন করার দাবি রয়েছে তাদের। আইন সংশোধনের পরই এটি কার্যকর করা হোক। না করা পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে। তারা বলেন, সরকারের বিভিন্ন দফতরে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও আইনটি সংশোধন ছাড়াই বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়া হয়। এতে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ কারণে খুলনায় সব রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আগামী ২১ ও ২২ নভেম্বর শ্রমিক ফেডারেশন বর্ধিত সভা ডেকেছে। ওই সভার এজেন্ডাগুলোর মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে সড়ক পরিবহন আইন সম্পর্কে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এ দিকে হঠাৎ করে খুলনা থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় হাজার হাজার যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েন।
খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম বেবী বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের প্রতিবাদে শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করছেন। তিনি বলেন, নতুন পরিবহন আইনে কোনো কারণে দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে চালকদের মৃত্যুদণ্ড এবং আহত হলে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। আমাদের এত টাকা দেয়ার সামর্থ্য নেই এবং বাস চালিয়ে আমরা জেলখানায় যেতে চাই না। বাংলাদেশে এমন কোনো চালক নেই যে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা দিতে পারবে। কারণ একজন চালকের বেতন ১৫-২০ হাজার টাকা। এই বাজারে যা দিয়ে সংসার চালানো, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালানোই দায়। সেখানে এত জরিমানা কী করে দেয়া যাবে। সড়কে অবৈধ নসিমন-করিমন চলার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে। এসব যানবাহন বন্ধ কিংবা চালকদের জরিমানা করা হয় না। সব জেল-জরিমানা হয় বাসচালকদের। খুলনা জেলা বাস-মিনিবাস ও কোচ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: আনোয়ার হোসেন সোনা বলেন, শ্রমিকরা ফাঁসি ও যাবজ্জীবন দণ্ডের ভয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন। আমাদের সাথে আলোচনা না করেই তারা এসব করছেন।
নড়াইল সংবাদদাতা জানান, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংশোধনের দাবিতে নড়াইল-যশোর, নড়াইল-খুলনা রুটসহ জেলার বিভিন্ন রুটে গতকাল সকাল থেকে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে যাত্রীসাধারণ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। যাত্রীরা জানান, পূর্বঘোষণা ছাড়াই জেলার বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন শ্রমিকরা। এ দিকে যাত্রীরা অটোভ্যান, ইজিবাইকসহ অন্যান্য যানবাহনে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করছেন। এ ক্ষেত্রে ৫০ টাকার ভাড়া গুনতে হচ্ছে ১০০ টাকা। এ ব্যাপারে নড়াইল জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহম্মেদ খান জানান, বাস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত শ্রমিক সংগঠনের নয়। চালক ও শ্রমিকরা নতুন পরিবহন আইনের ভয়ে বাস চালানো বন্ধ রেখেছেন।
ধামইরহাট (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইনের প্রতিবাদে বাস শ্রমিকরা নওগাঁর ধামইরহাটে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। পূর্বঘোষণা ছাড়াই পরিবহন ধর্মঘটের কারণে যাত্রীরা বেকায়দায় পড়েছেন। বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে পিইসি পরীক্ষার্থীদের। মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত ছাড়াই শ্রমিকরা নিজ উদ্যোগে এ কর্মবিরতি পালন করছেন।
জানা গেছে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ কার্যকর করতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। পূর্বঘোষণা ছাড়াই গতকাল সকাল থেকে নওগাঁ-নজিপুর-ধামইরহাট-জয়পুরহাট রুটে সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন শ্রমিকরা। হঠাৎ বাস চলাচল বন্ধ হওয়ায় যাত্রীদেরকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বাধ্য হয়ে তাদের অটোরিকশা, ভটভটি, নসিমন-করিমনে চড়ে গন্তব্যে যেতে হয়েছে। আকস্মিক বাস বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার্থীদেরকে। নিকটবর্তী স্থানে তিন চাকা যোগে যাত্রীরা যেতে পারলেও দূরের যাত্রীরা পড়েছেন বেকায়দায়। এ ব্যাপারে নওগাঁ জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো: জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সংগঠনের কাজে আমি জেলা শহর থেকে বাইরে আছি। তবে শুনেছি শ্রমিকরা নিজ উদ্যোগে বাস না চালিয়ে নতুন সড়ক পরিবহন আইনের কিছু ধারা সংশোধনের জন্য কর্মবিরতি পালন করছেন। কর্মবিরতি পালন সম্পর্কে জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তা ছাড়া মালিক সমিতিও এ কর্মবিরতি সম্পর্কে অবগত নয়।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের ঘোষণার পর হঠাৎ করেই রাজশাহী থেকে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই গতকাল সকাল থেকে রাজশাহীর সাথে বিভিন্ন রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন শ্রমিকরা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন মানুষ। মোটর শ্রমিকরা রাজশাহী নগরীর শিরোইল ও নওদাপাড়া বাসটার্মিনাল এবং ভদ্রা মোড়ে অবস্থান নিয়ে নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রত্যাহারের দাবি জানান।
এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের জানান, এটা ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ডাকা ধর্মঘট নয়। সকাল থেকে শ্রমিকরা নিজেরাই বাস বন্ধ রেখেছেন। রাজশাহীর মালিকদের বাস দু-একটি করে নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে ছেড়ে যাচ্ছে। তবে বাইরের জেলার মালিকদের বাসগুলো রাজশাহী আসার পর পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বাস চলছে না রাজশাহী-নওগাঁ রুটে। এ ছাড়া রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলাপর্যায়েও শহর থেকে কোনো বাস ছেড়ে যাচ্ছে না।
জানা গেছে, গত ১ নভেম্বর থেকে আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকর করা হয়। তবে এই আইন নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কিছু দিন আইনের প্রয়োগ শিথিল করা হয়। গত রোববার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, এই আইন কার্যকর শুরু হয়েছে। তার পরদিনই বাস বন্ধ করে দিয়েছেন রাজশাহীর শ্রমিকরা।
যশোর অফিস জানায়, সড়ক আইন ২০১৮ সংশোধনসহ ১০ দফা দাবিতে পরিবহন শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি শুরু করেছেন, যার কারণে যশোরের ১৮ রুটে কোনো পরিবহন চলছে না। এতে যাত্রীসাধারণ পড়েছেন ভোগান্তির মধ্যে।
পরিবহন শ্রমিকরা জানান, রোববার সকাল থেকে যশোরের ১৮টি রুটে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। বাইরে থেকে যশোরে কোনো যাত্রীবাহী বাস আসেনি। দূরপাল্লার যাত্রীবাহী পরিবহন চলাচলও বন্ধ রয়েছে। যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক হারুন অর রশিদ জানান, গত ১৪ নভেম্বর যশোরে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে সড়ক আইন-২০১৮ সংশোধনসহ ১০ দফা দাবি করা হয়। এর পর রোববার সকাল থেকে যশোরের ১৮ রুটের শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি শুরু করেন।
যশোর কেন্দ্রীয় পুরাতন বাসটার্মিনালে নয়ন নামে এক যাত্রী বলেন, ‘ঢাকা যাওয়ার জন্য বাঘারপাড়ার ছাতিয়ানতলা থেকে যশোরে এসে শুনি বাস চলছে না। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য যেতে চাইলেও এখন আর যেতে পারছিনে।’
এ দিকে আকাশপথে যেসব যাত্রী যশোরে আসেন তারা পড়েন আরো বিপাকে। অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে তারা গন্তব্যে পৌঁছেন। আমিনুর রহমান নামে এক বিমানযাত্রী জানান, ‘আকাশপথে যশোরে নামি নিজ শহর গোপালগঞ্জে দ্রুত যাবো বলে; কিন্তু পরিবার নিয়ে এখন চরম বিপাকে পড়েছি। দুই হাজার টাকার পথ যেতে এখন গুনতে হয়েছে চার হাজার টাকা।’
যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মামুনুর রশীদ বাচ্চু জানান, ফাঁসির দড়ি নিয়ে শ্রমিকরা পরিবহনে কাজ করতে রাজি না হয়ে তারা স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি শুরু করেছেন। এটা কোনো ইউনিয়ন বা ফেডারশনের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি নয়।

 


আরো সংবাদ

সকল