২৯ জানুয়ারি ২০২০

ছেলেদের ক্রিকেটেও স্বর্ণ জয়

১৯ স্বর্ণ পদকের রেকর্ড
এসএ গেমসে স্বর্ণজয়ী বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের উল্লাস : বিসিবি -

পুরুষ ফুটবল দলের ব্যর্থতার পর দুশ্চিন্তা ভর করেছিল ক্রিকেটের ওপর। শ্রীলঙ্কার সাথে লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে বিপর্যস্ত হওয়া বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ পারবে তো স্বর্ণ জিততে? পাশাপাশি মেয়েরা আগের দিন স্বর্ণ জেতায় কিছুটা প্রেস্টিজ ইস্যুও হয়ে দাঁড়ায় বিষয়টা। অবশ্য সৌম্য, শান্তরা মুখ রেখেছেন। শ্রীলঙ্কাকে ফাইনালে হারিয়ে জিতেছেন তারা স্বর্ণ। এ নিয়ে গেমসের টানা দ্বিতীয় ক্রিকেট আসরেও স্বর্ণ জিতল বাংলাদেশ। ৯ বছর আগে ২০১০ সালে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে স্বর্ণ জিতেছিল। সেটা অক্ষুণœ রাখল তারা কাঠমান্ডুর কীর্তিপুরে। আরচারির ১০ ক্যাটাগরির স্বর্ণ জয়ের পর ক্রিকেটের দুই বিভাগে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে বাংলাদেশের মর্যাদাও উন্নত হয়েছে এ আসরে। কাল ক্রিকেট এবং আরচারিতে স্বর্ণ জয়ের পর মোট ১৯ স্বর্ণ জয়ের রেকর্ড গড়ল বাংলাদেশ। এর আগে ২০১০ সালে ঢাকা এসএ গেমসে লালসবুজরা জিতেছিল ১৮টি স্বর্ণ। এই কাঠমান্ডুতে ১৯৮৪ সালের প্রথম সাফ গেমসে দু’টি এবং ১৯৯৯ সালে দু’টি স্বর্ণ জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার নেপালের মাঠে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ জয়েরও রেকর্ড।
কাল পুরুষদের ক্রিকেটে কাঠমান্ডুর কীর্তিপুরে প্রথম ব্যাটিং করে শ্রীলঙ্কা অনূর্ধ্ব-২৩। কিন্তু বাংলাদেশের বোলারদের নিখুঁত বোলিংয়ের সামনে বেশি দূর এগোতে পারেনি তারা। ১২২ রানে গুটিয়ে যায় শ্রীলঙ্কান দল। তখনই জয় উঁকি দিচ্ছিল। ব্যাট হাতে বিমুখ করেনি সৌম্যরা। তিন উইকেট হারিয়েই লক্ষ্যে পৌঁছায় তারা। উৎসব করে স্বর্ণ জয়ের। লঙ্কান ব্যাটসম্যানরা স্বাভাবিক ব্যাটিংয়ে ব্যর্থ ছিলেন। প্রথম উইকেটের পতন হয় ৩৬ রানে। এরপর এ ধারা নিয়মিত চলে অলআউট হয় ১২২-এ। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে হাসান মাহমুদ তিনটি এবং তানভীর নেন দুই উইকেট।
এরপর ১২৩ রানের লক্ষ্যে খেলতে নামা বাংলাদেশ দলের আত্মবিশ্বাসটা বেড়ে গিয়েছিল দুই ওপেনার সাইফ হাসান ও সৌম্য সরকার মিলে ৪৪ রানের পার্টনারশিপ খেলার পর। ২৮ বলে ২৭ করে আউট হন সৌম্য। এরপর সাইফ ও শান্ত মিলে জয়ের অবস্থানেই নিয়ে যায় দলকে। তারা দলীয় স্কোর নিয়ে যান ৮৩ তে। এ সময় সাইফ আউট হয়েছেন ৩০ বলে ৩৩ করে। পরে শান্ত শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে প্রথম ইয়াসির আলী, এরপর আফিফকে নিয়ে পৌঁছান জয়ের লক্ষ্যে। ১৮.১ ওভারেই লক্ষ্যে পৌঁছান তারা। শান্ত ২৮ বলে অপরাজিত থাকেন ৩৫ রান করে। এ ছাড়া ইয়াসির আলী করেছিলেন ১৯ রান। শান্তর সাথে অপরাজিত থাকা আফিফের রান ৫। লঙ্কান ক্যাপ্টেন সাত বোলার ব্যবহার করেও সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেননি। হাসান মাহমুদ ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার লাভ করেন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর : শ্রীলঙ্কা অনূর্ধ্ব-২৩ দল : ১২২ (২০ ওভার) সুমন ১/১৬, তানভির ২/২৮, হাসান মাহমুদ ৩/২০, মেহেদী ১/১৮, সৌম্য ০/৩২।
বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দল : ১২৫/৩ (১৮.১ ওভার), সাইফ ৩৩, সৌম্য ২৭, শান্ত অপ: ৩৫, ইয়াসির ১৯, আফিফ ৫ অপ:। ফলাফল : বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দল ৭ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ : হাসান মাহমুদ।
১৯ স্বর্ণপদকের রেকর্ড
পোখারায় রোমান সানার রিকার্ভ পুরুষ ব্যক্তিগত বিভাগে স্বর্ণ জয়ের সাথে সাথে ২০১০ সালের ১৮টি স্বর্ণের রেকর্ড স্পর্শ করে বাংলাদেশ। ঘণ্টা দুই পর সুখবর আসে কাঠমান্ডু থেকেও। কীর্তিপুরে জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কাকে ৭ উইকেটে হারিয়ে স্বর্ণ জেতে। এই স্বর্ণ জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এসএ গেমসে ১৯টি স্বর্ণ জয়ের মাইলফলক স্পর্শ করে। ক্রিকেট দল স্বর্ণ জয়ের পর বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রিকেট দলকে শুভেচ্ছা জানান।
বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজার প্রতিক্রিয়া, আমার লক্ষ্যই ছিল ১৮ স্বর্ণপদক অতিক্রম করা। সেটি অতিক্রম করতে পারায় আমি সন্তুষ্ট। এক আরচারিই ১০টি স্বর্ণ দিয়েছে। এরপর সর্বোচ্চ পদক এসেছে কারাতে ডিসিপ্লিন থেকে তিনটি, ভারোত্তোলন থেকে দু’টি, ক্রিকেট থেকে দু’টি (পুরুষ ও মহিলা), ফেন্সিং ও তায়কোয়ান্দো থেকে একটি।
২০১০ সালে ঢাকা এসএ গেমসে ১৮টি স্বর্ণ, ২৩টি রুপা ও ৫৬টি ব্রোঞ্জপদক জিতেছিল বাংলাদেশ। পদক তালিকায় স্থান হয়েছিল তৃতীয়। এবার স্বর্ণসংখ্যা ঢাকাকে ছাড়ালেও পদক তালিকায় অবস্থান এখন পর্যন্ত পঞ্চমই।
গেমসের তৃতীয় দিন পর্যন্ত চার স্বর্ণ এলেও চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ দিন সোনার খরা ছিল। সপ্তম দিন থেকে পোখারায় ভারোত্তোলনে মাবিয়া-জিয়ারুলের স্বর্ণের পর আবার স্বর্ণের ধারাবাহিকতায় ফেরে বাংলাদেশ। এরপর আরচারি একাই টেনে নিয়ে গেছে বাংলাদেশের পদক তালিকা। বাংলাদেশের এবারের শেফ দ্য মিশন আসাদুজ্জামান কোহিনুরও খানিকটা তৃপ্ত, গত গেমসে আমরা মাত্র চারটি স্বর্ণ জিতেছিলাম। এবার সর্বোচ্চ রেকর্ড অতিক্রম করতে পারায় আমরা সবাই খুশি। তবে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে হলে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।
১৯৮৪ সালে কাঠামান্ডুতে অনুষ্ঠিত গেমসের প্রথম আসরে মাত্র দু’টি স্বর্ণ, আটটি রুপা ও ১৩টি ব্রোঞ্জপদক জিতেছিলেন লালসবুজের ক্রীড়াবিদরা। সাত দেশের মধ্যে পঞ্চম স্থান জোটে বাংলাদেশের। ১৯৯৯ সালে দুই স্বর্ণ, ১০ রুপা ও ৩৫টি ব্রোঞ্জ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। নেপালের আবহাওয়া নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এবারো একটি ভয় কাজ করছিল সবার মনে। বৈরী আবহাওয়ায় লালসবুজের ক্রীড়াবিদরা ভালো খেলতে পারেন কি না। এবার এখানে এসেও বৈরী আবহাওয়ায় হাসপাতালে যেতে হয়েছিল বেশ ক’জন ক্রীড়াবিদকে। কিন্তু হিমালয় কন্যা এবার দু’হাত ভরে দিয়েছে বাংলাদেশকে।
এবারের গেমসে আরচারিসহ যেসব ডিসিপ্লিনে বাংলাদেশ স্বর্ণ জিতেছে এর কোনোটিতেই ভারত অংশগ্রহণ করেনি। ভারত অংশগ্রহণ করলে বাংলাদেশ কঠিন প্রতিদ্ব›িদ্বতায় পড়ত। আরচারি ১০টি স্বর্ণ পাওয়ায় এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে বেশি। আরচারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও বিওএর কোষাধ্যক্ষ কাজী রাজিব উদ্দিন আহমেদ চপল অবশ্য বলেন, ভারত থাকলেও কয়েকটি ইভেন্টে আমাদের পদক দিতেই হতো। আমরা রিকার্ভে অনেক উন্নতি করেছি। রোমান ইতোমধ্যে টোকিও অলিম্পিকে কোয়ালিফাই করে সেই প্রমাণ দিয়েছেন।
গেমসের দ্বিতীয় দিন সাতদোবাদোর তায়কোয়ান্দো জিমন্যাশিয়াম থেকে সোনা জয়ের প্রথম খুশির খবরটি দেন দীপু চাকমা। পরদিন কারাতে থেকে আসে আরো তিনটি স্বর্ণপদক। গেমসে প্রথমবার অন্তর্ভুক্ত হওয়া ফেন্সিংয়ে খেলতে এসেই সোনা জিতে রেকর্ড গড়েন ফাতেমা মুজিব। ভারোত্তোলনে টানা দুই গেমসে স্বর্ণ জিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। একই দিনে আরেক ভারোত্তোলক জিয়ারুল ইসলাম আরো একটি সোনার মুখ দেখান দেশকে। এরপর রোববার তীরন্দাজদের সোনা ফলানো শুরু হয়। ১০টি ইভেন্টের ১০টিতেই সোনা জিতে গেমসের রেকর্ডে স্থান পায়। তবে হতাশ করেছে শুটিং ও সাঁতার। গেল আসরে গৌহাটি থেকে পিস্তল ইভেন্টে শাকিল আহমেদ একটি স্বর্ণপদক জিতলেও এবার তারা ব্যর্থ। দু-তিনটি রুপা জিতলেও সোনার মুখ দেখা হয়নি তাদের। গৌহাটিতে দুই স্বর্ণপদক জিতে উজ্জ্বল্য ছড়িয়েছিলেন সাঁতারু মাহফুজা খাতুন শিলা, কিন্তু এবার তিনি দলে ছিলেন না। তবে ব্যর্থ হয়েছেন বাকিরা। প্রত্যাশার বারুদ ছড়িয়ে শেষ পর্যন্ত দেশকে স্বর্ণ দিতে পারেননি লন্ডন প্রবাসী জুনায়না আহমেদ।


আরো সংবাদ