২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বাংলাদেশ এবারো হাইব্রিড গণতন্ত্রের তালিকায়

-

গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ এবারো হাইব্রিড গণতন্ত্রের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারেনি। ১৬৭টি দেশের ওপর চালানো বার্ষিক জরিপে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আগেরবারের মতো ‘হাইব্রিড শাসন ব্যবস্থার’ বিভাগে। বাংলাদেশ ক্রমের ক্ষেত্রে ৮ নম্বর এগিয়ে ৮০ নম্বরে এসেছে। তবে স্তর ও প্রাপ্ত পয়েন্ট উভয় ক্ষেত্রে ২০০৭ সালের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। সূচক প্রকাশের ভিত্তি বছর ২০০৬ সালে ছিল চার দলীয় জোট সরকারের শাসন। সে বছর ৬.১১ পয়েন্ট অর্জন করে বাংলাদেশ ছিল দুর্বল গণতন্ত্র চর্চার দেশের তালিকায়। ২০০৭ সালে জরুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চার পরিস্থিতির অবনতি হয় এবং হাইব্রিড গণতন্ত্রের দেশের তালিকায় চলে যায়। এর পর প্রতি বছরই গণতন্ত্র চর্চার সূচক প্রকাশ হয়। কিন্তু হাইব্রিড গণতন্ত্রের ব্রাকেট থেকে আর উত্তরণ ঘটেনি। ২০১৯ সালে গণতন্ত্র চর্চার মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৭টি দেশের মধ্যে ৮০তম স্থানে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ছিল ৮৪তম অবস্থানে। পরের বছর বাংলাদেশের সূচক আট ধাপ নেমে যায়। ২০১৭ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়ায় ৯২তম স্থানে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়ায় ৮৮তম স্থানে।
লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) সর্বশেষ গণতন্ত্র সূচকে বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে সূচক প্রকাশের পর থেকে এবার সদস্য দেশগুলোর অবস্থা সবচেয়ে বাজে। গত বছর সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের আরো ক্ষয় হয়েছে। আরো একটি খারাপ বছর অতিবাহিত করেছে বৈশ্বিক গণতন্ত্র।
মোট পাঁচটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এগুলো হলো নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুত্ববাদ, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক স্বাধীনতা। এসব সূচকের ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে, গত বছর সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের ক্ষয় হয়েছে। ২০০৬ সালে এই সূচকের প্রচলন করা হয়। তার পর থেকে ১০ পয়েন্টের মধ্যে গত বছরে সর্বনিম্ন ছিল বৈশ্বিক স্কোর বা পয়েন্ট। তা হলো ৫.৪৪। ১৬৭টি দেশের মধ্যে মাত্র ২২টি দেশে পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র ছিল বলে মনে করা হয় সূচকে। এসব দেশে বসবাস করেন ৪৩ কোটি মানুষ। কিন্তু বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বেশি এখনো বসবাস করেন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে।
১৬৫টি দেশে এবং দুটি ভূখণ্ড নিয়ে তৈরি এই তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও শ্রীলঙ্কার পেছনে। আর পাকিস্তান ও নেপালের তুলনায় সামান্য এগিয়ে। তবে খানিকটা উত্থান পতনের পরও আগের বছরের মতো এবারো গণতন্ত্রেও সূচকে বাংলাদেশ ‘হাইব্রিড গণতন্ত্রের’ বিভাগে আছে। ‘হাইব্রিড’ বলতে এমন ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে প্রায়ই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়। বিরোধী দল এবং বিরোধী প্রার্থীদের ওপর সরকারের চাপ নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার এবং দুর্বল আইনের শাসন থাকে। নাগরিক সমাজ হয় দুর্বল ও ভঙ্গুর। বিচারব্যবস্থা স্বাধীন থাকে না। সাংবাদিকদের হয়রানি করা হয় এবং পক্ষপাতমূলক সংবাদের জন্য চাপ দেয়া হয়।
সূচক প্রকাশের প্রথম বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ‘দুর্বল গণতন্ত্রের’ বিভাগে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতন্ত্রের সূচকে বাংলাদেশের অবনতি হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। বর্তমানে দেশে সংসদ অকার্যকর। সরকারি দলের লোক নিয়ে যে দেশের সংসদ চলে, সে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সবার কাছেই দুর্বলভাবে দৃশ্যমান হয়।
সাধারণভাবে গণতান্ত্রিক বৈশ্বিক সূচকে শীর্ষস্থানে থাকে নরওয়ে। এর পরের অবস্থানে থাকে আইসল্যান্ড, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশ। আর একেবারে তলানিতে থাকে উত্তর কোরিয়া। যেখানে গণতন্ত্র চর্চার ছিটেফোঁটাও থাকে না। এর পরপর থাকে সিরিয়া, গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, চাদ প্রভৃতি দেশ। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার দ্রুত অবনমন হয়েছে চীনে। সেখানকার পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও ডিজিটাল নজরদারির মতো অন্যান্য নাগরিক স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ফলে চীনা স্কোর পতনে অবদান রেখেছে। চীনের অবস্থান তালিকায় ১৫৩ নম্বরে।
ভারতের অবস্থানের বড় ধরনের অবনতি ঘটে এবার ২০১৯ সালে নেমে এসেছে ৫১ নম্বরে। অগের বছর ক্রমের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ৪১ নম্বরে আর পয়েন্ট ছিল ৭.২৩ । এবার ক্রম ১০ ধাপ পেছনে আর পয়েন্ট নেমে এসেছে ৬.৯০ এ। ইকোনমিস্টের রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগস্টে জম্মু ও কাশ্মির অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আসামে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নাগরিকত্বের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এসব মানুষের বেশির ভাগই মুসলিম অধিবাসী। তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সূচকের অবনমনে এটি ভূমিকা রেখেছে।
এ ছাড়া এবারের গণতন্ত্রের সূচকে উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়ার অবস্থান ১৩৪ নম্বরে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ২৫তম স্থানে অপরিবর্তিত। এবারের সূচকে ২৩টি দেশের গণতান্ত্রিক স্কোর কমেছে। উন্নতি হয়েছে মাত্র ১১টি দেশে। এসব অবনমনের জন্য দায়ী করা যেতে পারে ওই অঞ্চলে অগণতান্ত্রিক নির্বাচনকে।


আরো সংবাদ