২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ই-পাসপোর্ট দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে : প্রধানমন্ত্রী

ই-পাসপোর্টের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : বাসস -

বহুল প্রতীক্ষিত ইলেকট্রনিকস পাসপোর্ট বা ই-পাসপোর্ট পরীষেবা গতকাল বুধবার থেকে চালু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল এই পাসপোর্ট সেবা উদ্বোধন করে বাংলাদেশকে ডিজিটাল সেবার নতুন দিগন্ত পৌঁছে দিলেন। এই পাসপোর্ট সেবা উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী দীপ্ত কণ্ঠে বলেন, ই-পাসপোর্ট বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা আরো উজ্জ্বল করবে, ই-পাসপোর্ট জাতির জন্য মুজিববর্ষের উপহার। তিনি বলেন, ‘জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের বিশেষ বছরে আমরা মানুষের হাতে ই-পাসপোর্ট সরবরাহ করতে পারছি। আমি বিশ্বাস করি, এটি নিঃসন্দেহে ডিজিটাল বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা আরো একবার আলোকিত করবে।’
ইউএনবি জানায়, গতকাল বুধবার রাজধানীর শের-ই-বাংলা নগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ই-পাসপোর্ট পরীষেবা ও স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার উদ্বোধন করেন। প্রযুক্তিভিত্তিক এ পাসপোর্ট চালুর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ই-পাসপোর্টের জগতে নাম লেখাল বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তার ই-পাসপোর্ট তুলে দেয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল নতুন এ পাসপোর্টটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ই-পাসপোর্ট চালুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল। ১১৮টি দেশ ইতিমধ্যে এটি প্রবর্তন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বপ্রথম বাংলাদেশই ই-পাসপোর্ট চালু করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ১১৯তম দেশ হিসেবে এটি চালু করল।
শেখ হাসিনা জানান, উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন সেবাকে সময়োপযোগী করেই তার সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেন, শোনা যায় প্রবাসীরা দেশে ফিরলে তাদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানি করা হয়। ‘এ ব্যবস্থায় দেশে ফিরে এবং বিদেশে যাওয়ার সময় লোকেরা ভবিষ্যতে হয়রানির শিকার হবে না।’ দেশের জনগণ দেশের অর্থনীতির অগ্রগতির সাথে আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখন বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে চলে যাচ্ছে এবং প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণ করে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
‘আমাদের সব ধরনের কার্যক্রমে তাদের (প্রবাসী) সহায়তা আমরা পাই। কাজেই তারা যাতে কোনোরকম হয়রানির শিকার না হন, সেটিও যেন আমরা লক্ষ্য রাখি,’ যোগ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৫ সালে ২৪ নভেম্বর আমরা বাংলাদেশের জনগণের জন্য মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট দিতে শুরু করি। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে আগামী ১০ বছরের জন্য আমরা এখন ই-পাসপোর্ট প্রদানের পদক্ষেপ নিয়েছি। তিনি বলেন, ‘সরকার ৬৪টি জেলার ৬৯টি পাসপোর্ট অফিস, ৩৩টি বহির্গমন চেকপোস্ট এবং বিদেশে বাংলাদেশের ৭৫টি মিশনের ভিসা উইংয়ের মাধ্যমে পাসপোর্ট, ভিসা এবং অভিবাসন পরীষেবা পৌঁছে দিয়েছে মানুষের দোরগোড়ায়’।।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা ও সেবা বিভাগের সচিব মো: শহিদুজ্জামান ও বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ।
শুরুতে ডিআইপি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ স্বাগত বক্তব্য দেন এবং ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান ই-পাসপোর্ট সেবার ওপর একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা করেন। এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ই-পাসপোর্ট উদ্বোধন উপলক্ষে ইমিগ্রেশন এবং পাসপোর্ট অধিদফতরের (ডিআইপি) কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর ছবি তুলে নিয়ে যান।
ডিআইপি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ সে সময় ইউএনবিকে জানান, প্রাথমিকভাবে উত্তরা, যাত্রাবাড়ী এবং আগারগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে ই-পাসপোর্ট সেবা শুরু হবে।
পর্যায়ক্রমে ৭২টি আঞ্চলিক ও বিভাগীয় অফিস এবং ৮০টি বিদেশী মিশনে চালু করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, জার্মান সংস্থা ভেরিডোস জিএমবিএইচ দেশে ই-পাসপোর্ট এবং ই-গেট নিয়ে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইসিএও) মতে, বর্তমানে ই-পাসপোর্ট ইস্যুকারী ১০০টিরও বেশি দেশ এবং বেসরকারি সংস্থা রয়েছে এবং বিশ্বে ৪৯০ মিলিয়ন ই-পাসপোর্টধারী লোক রয়েছে। প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, ‘বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট এবং স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার’ প্রকল্পটি চার হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ডিআইপি পুরো প্রকল্পটি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছে। ১০ বছরে মোট ৩০ মিলিয়ন পাসপোর্ট বিতরণ করা হবে। ই-পাসপোর্ট সেবার সাথে সাথে অনলাইনের মাধ্যমে অভিবাসনের আনুষ্ঠানিকতারও পুরো প্রক্রিয়া শেষ হবে।
জার্মানিতে দুই মিলিয়ন ই-পাসপোর্ট তৈরি করা হবে। যারা প্রথমে আবেদন করবেন তাদের পাসপোর্ট জার্মানি থেকে তৈরি করা হবে। ই-পাসপোর্টের মেয়াদ পাঁচ এবং ১০ বছরের জন্য হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই ডিআইপি এবং জার্মানি ভেরিডোস জিএমবিএইচ সংস্থা ইলেকট্রনিক পাসপোর্টের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
বাসস জানায়, বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট কর্মসূচি এবং স্বয়ংকৃত বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, এটা (ই-পাসপোর্ট) জাতির জন্য ‘মুজিব বর্ষে’ একটি উপহার।
‘আমরা মুজিব বর্ষে দেশের জনগণের হাতে ই-পাসপোর্ট তুলে দিচ্ছি। এটি একটি বিশেষ বছর এবং ঘটনাক্রমে জাতি এ বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করছে।’
তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে যেকোনো দেশে প্রবেশ এবং বহির্গমনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশী নাগরিকের ঝামেলামুক্ত চলাচল নিশ্চিত হবে এবং ই-গেটের সর্বাধিক সুবিধা গ্রহণ করা যাবে।’
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিকভাবে ডিআইপি তাদের আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী এবং উত্তরা কার্যালয় থেকে এই পাসপোর্ট ইস্যু করবে। পর্যায়ক্রমে এ বছর থেকেই দেশের সবখান থেকে এই পাসপোর্ট ইস্যু করা সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বপ্রথম এই পাসপোর্ট লাভ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রয়োজনে ২৫ হাজার পাসপোর্ট ইস্যু করা সম্ভব হবে।
সংবাদ সম্মেলনে দেয়া তথ্য মতে, ৪৮ পৃষ্ঠার পাঁচ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের সাধারণ ফি ৩,৫০০ টাকা, জরুরি ফি ৫,৫০০ টাকা ও অতীব জরুরি ফি ৭,৫০০ টাকা এবং ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের সাধারণ ফি ৫,০০০ টাকা, জরুরি ফি ৭,০০০ টাকা ও অতীব জরুরি ফি ৯,০০০ টাকা।
নতুন পাসপোর্টের ক্ষেত্রে অতীব জরুরিতে তিন দিনে, জরুরিতে সাত দিনে ও সাধারণ পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রে ২১ দিনে পাসপোর্ট পাওয়া যাবে। তবে পুরনো অথবা মেয়দোত্তীর্ণ পাসপোর্ট রি-ইস্যু করার ক্ষেত্রে অতীব জরুরি পাসপোর্ট দুই দিনে, জরুরি পাসপোর্ট তিন দিনে ও সাধারণ পাসপোর্ট সাত দিনের মধ্যে দেয়া হবে।
আলাদা আলাদা ই-পাসপোর্ট ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য ৪৮ পৃষ্ঠার পাঁচ বছর মেয়াদি সাধারণ ফি ১০০ মার্কিন ডলার ও জরুরি ফি ১৫০ মার্কিন ডলার। ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের সাধারণ ফি ১২৫ মার্কিন ডলার ও জরুরি ফি ১৭৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
ই-পাসপোর্টের আবেদনপত্র জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্মনিবন্ধন সনদ (বিআরসি) অনুযায়ী পূরণ করতে হবে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক (১৮ বছরের কম) আবেদনকারী, যার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই, তার বাবা-মার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর অবশ্যই সংশ্লিষ্ট তথ্য হিসেবে উল্লেখ করতে হবে।


আরো সংবাদ