১৯ আগস্ট ২০১৯

মানুষের আত্ম-আঘাত

-

যখন কোনো মানুষ আবেগগতভাবে বিচলিত ও আবেগতাড়িত থাকে তখন সে সেলফ-হারম বা আত্ম-আঘাত করতে পারে। আত্ম-আঘাত একটি মানসিক সমস্যা। আত্ম-আঘাত তখনই ঘটে যখন আপনি উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে নিজেই নিজেকে আঘাত করেন বা ইনজুরি করেন। এ সময় আপনি হয়তো বেশি মাত্রায় ওষুধ খেয়ে ফেলেন, নিজেকে ব্যথা দেন, শরীর কাটেন, শরীর জ্বালিয়ে দেন, নিজের মাথার চুল টেনে ধরেন, নিজের শরীরের চামড়ায় চিমটি কাটতে থাকেন, নিজের গলা টিপে ধরে নিজেকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করেন অথবা এক সাথে প্রচুর পরিমাণে নেশাদ্রব্য খেয়ে নেয়াÑ এসব কর্মকাণ্ড কোনো মারাত্মক সমস্যা হয়েছে তার চিহ্ন বহন করে। আর এসবই হলো আত্ম-আঘাত।
কারণ এটা এমন এক উপায় যা দ্বারা ব্যক্তি তার কঠিন অনুভূতিগুলোর সাথে এক প্রকার যুদ্ধ করে বেড়ায়। আপনি হয়তো কোনো সমস্যা নিয়ে হতবিহ্বল হতে পারেন এবং বুঝতে পারেন না যে কোথায় বা কিভাবে এর সাহায্য নেয়া যাবে। আপনি এ সময় নিজেকে এক রকম বন্দি বা অসহায় মনে করতে পারেন। তাই এ সময় হয়তো আপনি আত্ম-আঘাত করে নিজের অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেন। আপনার রাগ-ক্ষোভ বা দুশ্চিন্তার অনুভূতি হয়তো আপনার ভেতর জমে আছে, তাই যতক্ষণ না আপনি তীব্র আবেগে ফেটে পড়বেন। ততক্ষণ পর্যন্ত হয়তো আপনার ভালো লাগতে থাকবে না। আর এ সময় আত্ম-আঘাত হয়তো আপনার ভেতরকার দুশ্চিন্তার প্রশমন ঘটায়। কোনো প্রকার অপরাধবোধ বা লজ্জা আপনার জন্য বহন করা কঠিন বা অসহনীয় হতে পারে। তাই এ সময় আত্ম-আঘাত নিজেকে শাস্তি দেয়ার একটি উপায় হতে পারে। আপনার হয়তো মনে হতে পারে, আপনি এ পৃথিবী বা আপনার শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছেন, আর এটি কষ্টময় অভিজ্ঞতা থেকে বাঁচার জন্য একটি উপায় হতে পারে যেমন ট্রমা অথবা অ্যাবিউজের কষ্ট আপনি স্মৃতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চান, তাই এ সময় আপনি আবেগগতভাবে মৃত বা অনুভূতিশূন্য হতে পারেন। আর এ সময় আত্ম-আঘাত হয়তো আপনার মধ্যে অনুভূতির সৃষ্টি করতে পারে।
লক্ষণ-উপসর্গ : আপনি যদি আপনার নিজেকে নিজে আঘাত দিচ্ছেন তা হলে এটা থেকে বাঁচার জন্য আপনাকে এক প্রকার লড়াই করতে হয়। তাই আপনি প্রায়ই আপনার আত্ম-আঘাতের কথা গোপন রাখেন, এমনকি তা আপনার মা-বাবা, ভাই-বোন বা বন্ধু-বান্ধবরা পর্যন্ত জানেন না। আপনি আপনার এ সমস্যার কথা তাদের কারো সাথে আলোচনা করতে পারেন না। তাই তো আপনার মধ্যে অনুভূত হয় লজ্জা, অপরাধবোধ অথবা খারাপ অনুভূতি। এর কারণে আপনি এ সময় এক সাথে অনেকগুলো ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেন, নিজের শরীরের কোনো অংশে কাটাকাটি করেন, শরীরের কোনো অংশ পুড়িয়ে দেন, কোনো কিছুর সাথে মাথায় আঘাত করেন।
চিকিৎসা : আপনি যদি আপনার সমস্যার কথা কোনো বিশ্বস্ত আপনজনের কাছে বলেন তাহলে আপনার মধ্যে একাকিত্ববোধ কিছুটা কমবে। আপনার সমস্যা আরো পরিষ্কারভাবে দেখতে নিচের চিকিৎসাগুলো আপনাকে সাহায্য করবেÑ
* সেলফ হেল্প গ্রুপ : এতে করে একই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সাথে কথা বলে, একজন আরেকজনের সাপোর্ট নিয়ে, একজন আরেকজনকে উপদেশ দিয়ে এবং শেয়ার করে সাহায্য পাওয়া যায়।
* গ্রুপ থেরাপি : সমস্যা কাটিয়ে উঠে অন্যের সাথে সম্পর্ক গড়তে সাহায্য করে।
* টকিং থেরাপি।
* প্রবলেম সলভিং থেরাপি
* কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি অথবা
* সাইকোডাইমানিক সাইকোথেরাপি : রোগীকে সাহায্য করে থাকে যথেষ্ট মাত্রায়।
কোনো কোনো মনোবিশেষজ্ঞ বলেন, প্রবলেম সলভিং থেরাপি রোগীর জন্য অনেক উপকার বয়ে নিয়ে আসতে পারে। যারা আত্ম-আঘাত করে তাদের তিনজনের মধ্যে একজন এক বছরের মধ্যে আবার আত্ম-আঘাত করে যদি না ভালোভাবে সাহায্য বা চিকিৎসা পায়। যারা ৫০ বার আত্ম-আঘাত করেছে তারা আত্মহত্যা করতে পারে। এ সমস্যাটি বয়সের সাথে সাথে বাড়ে এবং এটি পুরুষদের মধ্যে বেশি কমন। আত্ম-আঘাতে শরীরে কাটার কারণে ব্যক্তি অনুভূতিশূন্য হতে পারে অথবা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হতে পারে এবং শরীরে ঘা হতে পারে।
সাপোর্ট : আপনি যখন নিজেকে আঘাত করতে চান তখন আপনি আত্ম-আঘাত না করে যদি ভাবেন, কেন আমি এটি করতে চাচ্ছি, না করলে কি চলে না? তখন এ ধরনের আত্ম-আঘাত করার অনুভূতি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চলে যায়। এ সময় আপনি কারো সাথে কথাবার্তা বলতে পারেন, বাইরে বেড়াতে গিয়ে আপনার এই আত্ম-আঘাতের ভাবনাকে অন্য খাতে নিতে পারেন। এ সময় গান গেয়ে নিজের মনে ফুর্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে, অথবা এ সময় এমন কিছু করা যেতে পারে যা কি না ক্ষতিমুক্ত। এ সময় আপনি ভালো কিছুতে মন দিতে চেষ্টা করতে পারেন। আপনার আত্ম-আঘাত করতে মন চাইলে আপনার অনুভূতি অন্য উপায়ে আপনি প্রকাশ করতে পারেন যেমন বরফকে চেপে ধরতে পারেন কিছু সময়ের জন্য, ঝাল-মরিচ খেতে পারেন অথবা ঠাণ্ডা পানিতে কিছুক্ষণ গোসল করতে পারেন বা টক-ঝাল কিছু খেতে পারেন। এ সময় নিজের প্রতি দয়া করুন। একটি মেসেজ লিখুন। তবে এ লেখাগুলো অন্য কাউকে দেখানোর প্রয়োজন নেই। পরে কোনো এক সময় এ লেখাগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিন। এত কিছুর পরও যদি আপনার আত্ম-আঘাত করতে মন চাইতেই থাকে তাহলে দেরি না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।


আরো সংবাদ