২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ভিটামিনের অভাবে শিশুর অসুখ

-

আমাদের দেশসহ অনুন্নত দেশের মায়েরা গর্ভকালীন দারিদ্র, কুসংস্কার এবং অশিক্ষার কারণে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারছে না। ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। মনে রাখা দরকার, অতিরিক্ত ভিটামিন-এ সদ্যজাত শিশুদের এমনকি বয়স্কদের যকৃতে দীর্ঘ দিন সঞ্চিত থাকে। অপুষ্ট মায়েরা যখন সন্তান প্রসব করে তখন এই সন্তানদের যকৃতে ভিটামিন-এ সঞ্চিত থাকে না। শিশুরা বুকের দুধ খেয়ে বড় হতে থাকে। কিন্তু মায়ের বুকের দুধে আহামরি কোনো ভিটামিন-এ না থাকায় তখন থেকেই এই ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দিতে থাকে। এ সময় যকৃত সঞ্চিত ভিটামিন-এ শিশুর প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটায়। যদি এসব শিশু মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় মায়ের পুষ্টিহীনতার কারণে বেশি পরিমাণ ভিটামিন-এ যকৃতে সঞ্চিত করে নিয়ে আসতে না পারে, তবেই ঘটে বিপত্তি। পাঁচ মাস বয়সে যখন বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার গ্রহণ শুরু করে, তখন থেকেই ভিটামিন-এ এর অভাব তীব্র মাত্রায় দেখা দেয়।
এ ছাড়া শিশুদের এ সময় প্রায়ই পেটের পীড়া কিংবা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে দেখা যায়। ফলে খাদ্য গ্রহণও অনেক কমে যায়। আর ডায়রিয়ার কারণে যতটুকু ভিটামিন খাদ্যের সাথে গ্রহণ করে, তাও শরীরে টিকে না। এর পাশাপাশি কৃমির আক্রমণ তো আছেই। সামান্য কিছু ভিটামিন-এ পেটে পড়লেও এই ব্যাঙের আধুলিতে আবার ভাগ বসায় পরান্নভোজী কৃমি। ফলে রক্তের ভেতরে ভিটামিন-এ পৌঁছাতেই পারে না। আবার এসব শিশু প্রায়ই আমিষজাতীয় খাদ্য ঘাটতিতে ভুগতে থাকে। রক্তে ভিটামিন-এ বহন করে নিয়ে যায় এক বিশেষ ধরনের আমিষ। যেহেতু আমিষ নেই, সেজন্য ভিটামিন-এ রক্তে বাহিত হতে পারে না। উপরন্তু আমিষের ঘাটতি যকৃত থেকে ভিটামিন-এ সংশ্লেষণে বাধা দেয়। এমন এক দুষ্টচক্রে পড়ে এসব ফুটফুটে শিশু মারাত্মক ভিটামিন-এ এর ঘাটতির শিকার হয়। ভিটামিন-এ এর ঘাটতিজনিত রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় এক থেকে পাঁচ বছর বয়সের শিশুরা। প্রাথমিকপর্যায়ে তাদের চোখের ভেতরে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। চোখের কনজাংটিভ নামক পর্দায় শুরু হয় পরিবর্তন। এটি হয়ে ওঠে শুকনো, খসখসে। পাশাপাশি কনজাংটিভার পুরুত্বও বাড়তে থাকে এবং এটি বাদামি বর্ণ ধারণ করে। এক বিশেষ ধরনের দাগ পড়ে যায় এই পর্দার ওপর। অনেকটা ত্রিকোণাকার এই স্পটকে বলা হয় বিটটস স্পট। কনজাংটিভার পাশাপাশি কর্নিয়ায় ঘটে পরিবর্তন। কর্নিয়া আলোর প্রতিসরণশীল এক পর্দা। ভিটামিন-এ এর অভাবে কর্নিয়ার প্রতিসরণশীলতা নষ্ট হয়ে যায়। কর্নিয়ায় ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং এক সময় চোখকে চিরদিনের জন্য দৃষ্টিরহিত করে দেয়।
চোখের সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তর রেটিনায় এক ধরনের কোষ থাকে, যার নাম রড কোষ। এই রড কোষ তৈরি করে রডপসিন নামক এক রাসায়নিক পদার্থ, যা টিমটিমে আলোতে দেখতে সাহায্য করে। রডপসিন তৈরির জন্য প্রয়োজন ভিটামিন-এ। ভিটামিন-এ এর অভাবে রডপসিন তৈরি হয় না। ফলে শিশুরা টিমটিমে আলো বা রাতের বেলায় দেখতে পায় না। এ অবস্থার নাম রাতকানা। এ অবস্থায় চিকিৎসা না পেলে এরা হয়ে যায় পুরোপুরি অন্ধ।
ভিটামিন-এ এর অভাবে পরিপাকনালী ও শ্বাসনালীর অভ্যন্তরীণ আবরণিক কলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে জীবাণু সহজেই আক্রমণ করে বসে। সে জন্য ভিটামিন-এ এর অভাবে শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ বেড়ে যায়, পাশাপাশি ডায়রিয়ার প্রকোপও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। হাম আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে ভিটামিন-এ এর অভাব মারাত্মক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে এবং এই শিশুদের মৃত্যুর হার স্বাভাবিক (ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ) শিশুদের তুলনায় বেশি।
প্রতিদিন একটি শিশুর ৪০০ ইউনিট ভিটামিন-এ প্রয়োজন। অথচ এক জরিপে দেখা গেছে, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে দিনে মাত্র ১০০-১৫০ ইউনিট ভিটামিন-এ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের হাল হকিকত এমনটিই হবে। শিশুদের এক বছর বয়স থেকে শুরু করে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি ছয় মাস অন্তর দুই লাখ শক্তির ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সরবরাহ করতে হবে। যেসব খাদ্যে ভিটামিন-এ বিদ্যমান, সেগুলো যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্যের মধ্যে সরবরাহ করতে হবে। ভিটামিন-এ এর দুই ধরনের উৎস বিদ্যমান। একটি প্রাণিজ উৎস, যেমনÑ যকৃত, ডিম, দুধ, ঘি, মাখন, মাছের তেল ইত্যাদি।
আরেক ধরনের উৎস হচ্ছে উদ্ভিদ উৎস, যেমনÑ টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল। মিষ্টিকুমড়া, গাজর, পেঁপে, আম, কাঁঠাল, কচু ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-এ বিদ্যমান। গর্ভাবস্থায় মায়েদের শাকসবজিসহ ভিটামিন এ-সমৃদ্ধ খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণ সরবরাহ করা দরকার। আর শিশুদের মুখে তুলে দেয়া দরকার ভিটামিন-সমৃদ্ধ খাবার।

 


আরো সংবাদ