২৩ আগস্ট ২০১৯

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম : চিনবেন কীভাবে?

নারীদের পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম - ছবি : সংগ্রহ

নারীদের বন্ধ্যাত্বসহ একাধিক শারীরিক সমস্যার পিছনে দায়ী পিসিওএস। উপেক্ষা না করে অসুখের উপসর্গগুলো সম্পর্কে জেনে নেয়া দরকার। কারণ সময়ে চিকিৎসা ও জীবনযাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে এড়ানো যায় অসুখটি।

ঘন ঘন মুড সুইং হচ্ছে? কিছুই ভালো লাগছে না। কারণে অকারণে আসছে অবসাদ?
মেয়েদের এই সমস্যাগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। অথচ এই সমস্যাগুলো সবই কিন্তু পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিজিজ বা পিসিওডি-এর লক্ষণ। সাধারণত বাড়তি ওজন, অনিয়মিত মেনস্ট্রুয়েশন, উপরি পাওনা তলপেটে যন্ত্রণা নিয়ে অনেকেই গাইনিকোলজিস্টের কাছে যান। আবার এমন অনেকে আছেন যারা দীর্ঘদিন সন্তানহীন অথচ জানেন না তার ইনফার্টিলিটির জন্য দায়ী পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিজিজ! আজকাল নারীদের প্রায়ই এই ধরনের সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করতে শোনা যায়।

পরিসংখ্যানে প্রমাণিত যে জননক্ষম নারীর ২০ শতাংশই এই সমস্যায় আক্রান্ত। প্রতি ১০০ জন পলিসিস্টিক ওভারিতে আক্রান্ত মহিলার মধ্যে বড়জোর ৬-৭ জনের পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম ধরা পড়ে। কিন্তু যাদের এই সমস্যা হয় তাদেরই জীবনে বন্ধ্যাত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম একজন নারীর জীবনে নানা বিপর্যয় ডেকে আনে। এর থেকে মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল এলোমেলো হয়ে যায়। হর্মোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। আর হর্মোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া মানেই নারীর জীবনে নানা সংকটের ঘনঘটা। সবার উপরে নারীর লাবণ্য ও রূপে বিরাট ঘাটতি দেখা দেয় যা একজন নারীর মানসিক সমস্যার কারণও হয়ে ওঠে।

 টের পাবেন কেমন করে?
পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমের বেশ কিছু চেনা লক্ষণ রয়েছে। প্রথমেই বলতে হয় মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল অনিয়মিত বা একেবারে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, অনেক চেষ্টার পরও প্রেগনেন্সিতে সাফল্য অধরা থেকে যায়, সারা গায়ে মুখে অস্বাভাবিক চুল বা রোম বৃদ্ধি পায়, মাথার চুল পাতলা হতে থাকে, বহু চেষ্টা করেও দেহের ওজন বৃদ্ধি আটকানো যায় না। তাছাড়া আধুনিক সময়ের অন্যতম সমস্যা হঠাৎ মুড সুইং, মানসিক অবসাদ তো রয়েছেই। এর ফলে অবসন্নভাব, ঝিমুনি লাগা, এমনকী দিনের বেলাও চোখ লেগে গিয়ে নাক ডাকতে পারে। থাকে ব্রণ-হওয়ার সমস্যাও। অনেকের হয়তো এইসব লক্ষণ একসঙ্গে ধরা পড়ে না, কিন্তু এর মধ্যে থেকে কিছু লক্ষণ যদি মিলে যায় বা কিছু শারীরিক উপসর্গ যদি কমন হয়, তাহলে সাবধান।

গভীরে যাও!
অস্বাভাবিক হর্মোন লেভেলের জন্যই সাধারণত পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম দেখা দেয়। এমনিতে এই সমস্যার কোনও সঠিক কারণ বের করা যায় না। তবে দেখা গেছে পরিবারে আগে যদি কেউ এই সমস্যায় ভুগে থাকেন তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। তাই দাদি, মা, নানি বা কোনো নিকট আত্মীয়ের যদি এই রকম সমস্যা হয়ে থাকে সাবধান হন। দেখা গেছে যারা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমে ভোগেন তাদের ওভারি থেকে কিছুটা বেশি টেস্টোস্টেরন ক্ষরণ হয়। এই বাড়তি টেস্টোস্টেরনের জন্যই পিসিওডি উপসর্গ প্রকটভাবে দেখা দেয়।

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিজিজ হলে শরীরে ইনসুলিন রেজিসটেন্স দেখা দেয়। ফলে ইনসুলিন ক্ষরণ হলেও শরীর তেমনভাবে সাড়া দেয় না। তাই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ে। যার পরিচিত ফল ব্লাড সুগার। বেড়ে যাওয়া গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক রাখতে দেহে আরও বাড়তি ইনসুলিন ক্ষরণ হয়। ফলে বাড়তে থাকে ওজন। মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল অনিয়মিত হয়, লিউটিনাইজিং হর্মোন বেড়ে যাওয়ার জন্য।

 রোগ নির্ণয়
পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম হয়েছে কি না বোঝার জন্য রক্ত পরীক্ষাই যথেষ্ট। রক্ত পরীক্ষা করলে দেহে বাড়তি মাত্রায় টেস্টোস্টেরন ও লিউটিনাইজিং হর্মোন ধরা পড়ে। প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া আল্ট্রা সোনোগ্রাফি করালে অবশ্যই পলিসিস্টিক ওভারি বোঝা যায়।

ঘোর বিপদ
পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম শরীরকে কাবু করে দেয়। ইনসুলিন রেজিসটেন্সের জন্য বেশি বয়সে ডায়াবিটিস ঘাঁটি গাড়ে। বাড়তি ওজন বা ওবেসিটি ডেকে আনে উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা। এর সঙ্গে যোগ হতে পারে হার্টের অসুখও। ঝুঁকি রয়েছে আরো নানা, যেমন বছরে তিন বারের কম মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল হলে এন্ডোমেট্রিয়াম পুরু হয়ে যেতে পারে। যা অনেকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্লিডিং করায় এবং পরে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সারের আশঙ্কা বাড়ায়।

 মুক্তির উপায়
পলিসিস্টিক ওভারির সমস্যা পুরোপুরি নিরাময় হয় না। বিভিন্ন সাইকেলে কন্ট্রাসেপটিভ পিল প্রয়োগ করে এই সমস্যার মোকাবিলা করা হচ্ছে। তার সঙ্গে কনসিভ করার সহায়তার জন্য ডিম্বাণু যাতে নির্গত হয় তার কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। তাছাড়া আধুনিক ডি চিরো ইনোসিটোল বা মায়ো ইনোসিটোল গোত্রের ওষুধ দিয়েও চিকিৎসা করা হয়।

 শুধু ওষুধ নয়
হ্যাঁ ঠিক তাই। শুধু ওষুধ দিয়ে এই সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। একমাত্র সমাধান হল আদর্শ জীবনশৈলী মেনে চলা। এভাবে আপনিও এই রোগের হাত থেকে রেহাই পেতে পারেন। প্রথমত সুষম আহার গ্রহণ করুন। সঠিক সময়ে খান। ব্রেকফাস্ট বা সকালের খাবার একেবারে বাদ দেওয়া যাবে না। সকালের দিকে আমাদের মেটাবলিজম লেভেল হাই থাকে। ওই সময়েই পেট ভরে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করুন। আসলে আমাদের দেশে, বিশেষত বাঙালিদের মধ্যে ভারী ব্রেকফাস্ট করার রেওয়াজ নেই। অথচ এই অভ্যেসটাই দরকার এবং এই অভ্যেসই অনেক রোগকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। আমাদের সমস্যা হলো, সকালে সামান্য কিছু খেয়ে বা সম্পূর্ণ না খেয়ে একবারে দুপুরে খাই। এই অভ্যসই বিপদ ডেকে আনছে। দুপুরে সামান্য খাবার খাওয়াই ভালো। আর যা খাবেন তার মধ্যেও শাকসব্জি থাকতেই হবে। রাতের খাবার ৯টার মধ্যে সেরে ফেলুন। রাতে ভারী কিছু খাবেন না। ডায়েটে রাখুন প্রচুর শাক-সব্জি। শর্করা গ্রহণের মাত্রা কমান। মূলত শাকসব্জি দিয়েই পেট ভরানোর চেষ্টা করুন। শাকসব্জিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে যা আপনার পেট ভরা রাখে। ফলে শাকসব্জি খেলে দ্রুত খিদে পায় না। আবার বাওয়েল মুভমেন্ট ঠিক রাখে। মেটাবলিজম ভালো রাখে। অতিরিক্ত ফ্যাট শরীর থেকে বের করতেও সাহায্য করে। ক্যান্সার দূরে রাখতে সাহায্য করে। শরীরে ভিটামিনের জোগান বজায় রাখে। আর অতিঅবশ্যই নিয়মিত ফল খান। খুব দামি ফল খেতে হবে না। একটা পেয়ারাও যথেষ্ট। ফলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে। কার্বোহাইড্রেট অর্থাৎ ভাত, রুটি, আলুর তৈরি নানা খাদ্য কম খাওয়ার কথা আগেই বলা হচ্ছে। তবে শুধু ভাত-রুটি নয়, বন্ধ করতে হবে চিনির ব্যবহার। লবণ খাওয়া কমিয়ে ফেলুন। ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে থাকার পাশাপাশি ওজন বাড়ার সমস্যাও দূরে থাকবে। কফি এবং অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বাদ দিতে পারলে ভালো হয়।

 এক্সারসাইজ মাস্ট
সপ্তাহে অন্তত তিন দিন নিয়ম করে কমপক্ষে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে। পলিসিস্টিক ওভারির সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মোক্ষম উপায় হল শরীরচর্চা। দৈহিক উচ্চতা অনুপাতে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ধরে নিতে হবে পিসিওডি-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আপনি প্রায় জয়ী হয়েই গিয়েছেন। এভাবেই স্বাভাবিক পদ্ধতিতে কনসিভ করা সম্ভব। এরপরও সমস্যা জটিল হলে তখন ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন প্রযুক্তি প্রয়োগে মাতৃত্ব লাভ করা যায়। হতাশ হবেন না। আগে চেষ্টা শুরু করুন। চেষ্টা করলেই উপায় হয়।


আরো সংবাদ