২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

গর্ভধারণ ও অ্যাজমা

অ্যাজমার ওপর গর্ভধারণ কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে? - ছবি : সংগ্রহ

গর্ভধারণকালে মেয়েরা ওষুধ খেতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে থাকে। যদি কোনো অ্যাজমা রোগী গর্ভধারণ করে, তাহলে শুধু তার নিজের প্রয়োজনেই সুচিকিৎসা জরুরি নয় বরং তার অনাগত সন্তানের জন্যও সুচিকিৎসা প্রয়োজন। লিখেছেন অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে যেমন গর্ভধারণে প্রচণ্ড কষ্ট হয়, তেমনি গর্ভস্থ সন্তানের বেড়ে ওঠা, এমনকি জীবিত থাকারও অসুবিধা হয়। অন্য সবার মতো গর্ভবতীদেরও অ্যাজমা চিকিৎসার মূল লক্ষ্য একই। হাসপাতালে যাতে তাকে ভর্তি না হতে হয়,
ইমার্জেন্সিতে যেতে না হয়, তার কর্মক্ষমতা যেন ব্যাহত না হয়। যেসব জিনিস অ্যাজমার প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়, যেমন ধুলা, ধোঁয়া, পতঙ্গ, ছত্রাক ও ধূমপান এসব থেকে গর্ভবতীকে দূরে থাকতে হবে। আপনি গর্ভধারণ করার সাথে সাথে চিকিৎসকের সাথে পরার্মশ করুন, যাতে এ সময় আপনার অ্যাজমা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
নিচে কিছু প্রশ্ন এবং উত্তর দেয়া হলো। অ্যাজমা রোগীরা যারা গর্ভধারণে ইচ্ছুক, তারা এ প্রশ্নোত্তর থেকে লাভবান হতে পারবেন।

অ্যাজমা আক্রান্ত নারী কি নিরাপদ মাতৃত্ব লাভ করতে পারবেন?
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঠিকভাবে অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে গর্ভবতী মা বা গর্ভস্থ সন্তানের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে থাকলে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবান শিশুর জন্ম দেয়া সম্ভব। যদি গর্ভাবস্থায় অ্যাজমা ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে জন্মের সময় শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়ে থাকে। সুতরাং গর্ভাবস্থায় আপনাকে অবশ্যই অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ না করলে সন্তানের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় কেন?
অ্যাজমা মায়ের রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। যেহেতু গর্ভস্থ শিশু অক্সিজেন পায় মায়ের রক্তের অক্সিজেন থেকেই। কাজেই শিশুর রক্তেও অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। অথচ শিশুর বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন থাকতেই হবে। ফলে অক্সিজেন স্বল্পতা গর্ভস্থ শিশুর বেড়ে ওঠা, এমনকি বেঁচে থাকারও নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে না। অ্যাজমার ওষুধ গর্ভস্থ শিশুর ওপর কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে শত শত সমীক্ষা ও গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় অ্যাজমার ওষুধ হিসেবে ইনহেলার ব্যবহারই যথোপযুক্ত। চেষ্টা রাখতে হবে মুখে খাওয়ার ওষুধ না দেয়ার।

অ্যাজমার ওপর গর্ভধারণ কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে?
গর্ভধারণের ফলে অ্যাজমা রোগীদের উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, গর্ভধারণের পরে ৩৫ শতাংশ মহিলার অ্যাজমা বেড়ে গেছে, ২৮ শতাংশের উন্নতি হয়েছে এবং ৩৩ শতাংশের অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। দেখা গেছে, যারা গর্ভাবস্থায় সব সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছে এবং অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি।
গর্ভাবস্থার কোন পর্যায়ে অ্যাজমার উপসর্গ বৃদ্ধি পায়?
দ্বিতীয় পর্যায়ের শেষের দিকে এবং তৃতীয় পর্যায়ের শুরুর দিকে অ্যাজমার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যায়। সন্তান প্রসবকালে অ্যাজমার উপসর্গ বৃদ্ধির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গর্ভধারণের ফলে কোনো কোনো নারীর অ্যাজমার উন্নতি হয় কেন?
সঠিক কারণটি জানা যায়নি। তবে গর্ভাবস্থায় মেয়েদের রক্তের কার্টিসোল নামক হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ কার্টিসোল অ্যাজমার তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে।
গর্ভধারণের ফলে কোনো কোনো মহিলার অ্যাজমা বেড়ে যায় কেন?
এ ক্ষেত্রেও সঠিক কারণ অজানা। যেহেতু গর্ভবতীদের পাকস্থলীতে চাপ পড়ে সে কারণে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স বেড়ে যায়। ফলে শুরু হয় বুক জ্বলা এবং আরো কিছু উপসর্গ। এ রিফ্লাক্সের কারণে অ্যাজমার তীব্রতা বেড়ে যায়। এ ছাড়া আরো কিছু কারণ যেমন সাইনাস ইনফেকশন, ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও অতিরিক্ত চাপের জন্যও অ্যাজমার তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে পারে।

গর্ভাবস্থায় কি অ্যালার্জি ভ্যাকসিন নেয়া যায়?
গর্ভধারণের ওপর অ্যালার্জি ভ্যাকসিন কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। কাজেই অ্যালার্জি ভ্যাকসিন চালিয়ে যাওয়া যায়। তবে ডাক্তার হয়তো ডোজ কমিয়ে দিতে পারেন।
মনে রাখতে হবে, আগে যদি রোগী কোনো দিন অ্যালার্জি ভ্যাকসিন না নিয়ে থাকে তাহলে গর্ভাবস্থায় সে তা শুরু করতে পারবে না।

অ্যাজমা রোগিনী কি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন?
মায়ের বুকের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কাজেই বুকের দুধ খাওয়ানোকে উৎসাহিত করতে হবে। তবে যদি কোনো ওষুধ বুকের দুধের মাধ্যমে পরিত্যক্ত হয়, তা নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব হয়নি। এজন্য কোনো ওষুধকেই শিশুর জন্য বুকের দুধের মাধ্যমে ক্ষতিকর বলে ঘোষণা করা হয়নি। অবশ্য থিওফাইলিন বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে যে কিছুটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তা জানা গেছে। তবে স্তনদানকালে কোনো অ্যালার্জি থাকলে অবশ্যই তার উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ইমুনোলজি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা।
ফোন : ০১৯১৫৬১৪৬৮৯ (উজ্জ্বল)


আরো সংবাদ